ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। তাঁকে ভারত সফরের দাওয়াত দিয়েছেন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি পত্র হস্তান্তর করেছেন। তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন এবং তাঁকে ভারত ভ্রমণের আহ্বান জানিয়েছেন। রওশন এরশাদ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তিস্তা নদীর পানির বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে ও সীমান্ত সমস্যা সম্পর্কে আলাপ করেছেন। এছাড়া তিনি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাত্ করেছেন, যদিও এই সাক্ষাত্কারটি প্রটোকলের মধ্যে পড়ে না। বিএনপি নেত্রী তার কাছে অভিযোগ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, বর্তমান সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এ ব্যাপারে ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- এটা একান্তই বাংলাদেশের জনগণের ব্যাপার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র বাংলাদেশের জনগণই প্রতিষ্ঠা করার এখতিয়ার রাখে, অন্য কেউ নয়। তিনি আরো বলেছেন- ভারত বাংলাদেশের কোন দলের সাথে বন্ধুত্ব চায় না, ভারত চায় বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্ব। বিএনপি নেত্রী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যে নালিশ করেছেন, এতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়কেই অবাক করেছে। একটু পিছনের দিকে তাকাই। ভারতে যখন বিজেপি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে, তখন বাংলাদেশে বিএনপি খুবই উল্লসিত হয়েছিল। তাদের ভাবটা এই রকমই ছিল যে- এবার ভারত বাংলাদেশে পট পরিবর্তন করে দেবে ও বিএনপি সে সুবাদে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসবে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ বলেছিল যে- ভারতে সরকার পরিবর্তনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রথম কথা হল: ভারত বাংলাদেশের পট পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করবে কেন? ভারত জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী একটি দেশ। ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনবরত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। ভারত তার পূর্বাঞ্চলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দমন নিয়েই ব্যস্ত। পক্ষান্তরে বিএনপি আমলে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ খুবই সোচ্চার ছিল। জঙ্গীরা বাংলাদেশের ৫০০ স্থানে একই দিনে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের শক্তির জানান দিয়েছিল। ২১ আগষ্টে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে ২২ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে। শত শত লোক পঙ্গু হয়েছে। এ সমস্ত কার্যকলাপ তত্কালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের মদদেই হয়েছিল, একথা শুধু বাংলাদেশ আর ভারত কেন, সমস্ত বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলা করে ড. কিবরিয়াকে এবং প্রকাশ্য জনসভায় ব্রাশফায়ার করে গাজীপুরে আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে হযরত শাহজালাল (দঃ)-এর মাজারে গ্রেনেড হামলা করে ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। ২০০১ হইতে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি সরকার বাংলাদেশে খুনের লীলায়, হত্যার লীলায় বিরোধী দলকে ধ্বংস করে দেবার উন্মাদনায় মেতেছিল। এ সমস্ত কার্যকলাপ কি ভারতের বিজয়ী দল বিজেপি ও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেনি? ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরা-নেতারা সংখ্যালঘু নির্যাতনে উন্মাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করেছিল। হিন্দুদের যে নির্যাতন করেছিল, তা ১৯৭১ সালে পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগকেও ম্লান করে দিয়েছিল। ঐ সময় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তা কি ভারতবাসী, বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেনি। ঐ সময় যদি খালেদা জিয়া ঘোষণা দিতেন যে সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ করো, নইলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাহলে অনেক মানুষ জীবনে বেঁচে যেতো, অনেক নারী তার ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকতে পারতো। কিন্তু না, বিএনপি নেত্রী তা করেননি। তিনি বরং উল্লসিত ছিলেন। এসব ঘটনা তো সমস্ত বিশ্ববাসী দুঃখের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছেন। ভারতের নরেন্দ্র মোদী কি বাংলাদেশের ২০০১ হতে ২০০৬ পর্যন্ত ঘটনাবলি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নন? এর আগে ১৯৯১ সাল হতে ১৯৯৫ পর্যন্ত বিএনপির আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে, এছাড়াও বিএনপি ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশে পাকিস্তানী ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করে জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগ-মহাজোট বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনা করে। তাই ভারত কেন, পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক দেশই বিএনপির সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গীবাদের পক্ষপাতিত্বকে সমর্থন করে না ও করবেও না। লেখক :ব্যাংকার ও সাবেক ছাত্রনেতা