পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি

বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা মূল্যায়ন পদ্ধতিকে একেবারে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে যে ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে তাতে শিক্ষার মান নিয়ে জনমনে এমনিতেই নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে। তার ওপর আবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সত্যিই পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সরকারও মোটামুটি নড়েচড়ে বসেছে বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ও গণিত দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর পরই। যদিও এর পূববর্তী পরীক্ষাগুলোয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সরকার স্বীকার করতে চায়নি। ৮ এপ্রিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর ৯ এপ্রিল ঢাকা বোর্ডের এইচএসসির ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরদিনই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সোহরাব হোসাইনকে প্রধান করে সাত সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট চারটি সুপারিশ করেছে তদন্ত কামিটি। এর মধ্যে দুটি হছে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর। এর একটি সুপারিশে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংশোধন ও প্রশ্ন নির্বাচনের কাজটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে করতে বলা হয়েছে। এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা তথ্যভান্ডারে রাখা হবে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করা হবে। পরের সুপারিশও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর। উল্লিখিত পদ্ধতিতে প্রশ্নের সেট করার পর একাধিক সেট সুরক্ষিত যন্ত্রের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কয়েক দিন আগেই পাঠানো হবে। প্রশ্নপত্রের জন্য ব্যবহূত ডিভাইস তিন স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, বায়োমেট্রিক্স, ইউজার অ্যাকসেস কার্ড প্রবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সময়সীমার মধ্যে প্রশ্নপত্র খোলা ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য ডিজিটাল রাইট ম্যানেজমেন্ট ও সময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ছাপানো প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কক্ষ অনুযায়ী প্যাকেটজাত করে সিকিউরিটি টেপ লাগিয়ে পরীক্ষা কক্ষে পৌঁছানোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি সুপারিশে সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়, অধ্যায় ও প্রশ্নের মান বন্টন অনুসারে সব বিষয়ের সম্ভাব্য সব ধরনের অন্তত ২০ সেট প্রশ্নপত্রের পান্ডুলিপি তৈরির কথা বলা হয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ মুদ্রণের উদ্দেশ্যে ২০ সেট থেকে লটারীর মাধ্যমে পাঁচসেট পান্ডুলিপি নির্ধারণ করবে। প্রশ্নপত্র মুদ্রণের পর আগের নিয়মে তা জেলা ও উপজেলা কেন্দ্রে প্রেরণ করা হবে, পরীক্ষার দিন পূর্ব নির্ধারিত সময়ে মুদ্রিত প্রশ্নপত্রের কোন সেটে পরীক্ষা হবে, তাও লটারীর মাধ্যমে নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। সুপারিশগুলো বেশিই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এবং কিছুটা জটিলও বটে। তারপরেও বিষয়গুলো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা আসলে সময়ের দাবি। সেই পরিবর্তন যতটা তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই মঙ্গল। তবে সরকার যে বিষয়টিতে বেশি জোর দিতে চাচ্ছে তা হচ্ছে পরীক্ষার মাঝে কোন বিরতি না দেয়া। আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার মাঝে বিরতি এ দুয়ের সাথে বাস্তবে কোন সম্পর্ক নেই। মন্ত্রণালয় হয়ত মনে করেছে যে, বিরতি না দিয়ে পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও শিক্ষার্থীরা তা ব্যবহার করতে পারবে না বা ব্যবহার করতে চাইবে না। এটি আসলে সুবিবেচনাসম্মত কোন ব্যবস্থা নয়। কারণ পরীক্ষা শুধু মুখস্থ করে, বা দেখে বা জানা বিষয় খাতায় লেখা নয়। এখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক চাপ পোহাতে হয়। ক্রিয়েটিভিটির কথা চিন্তা করলে বলা দরকার যে, শিক্ষার্থীর দেহ ও মন সুস্থ থাকা দরকার পরীক্ষার সময়। বিরতি না দিয়ে পরীক্ষা চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে যার ফলে অন্য কোন ধরনের মানসিক রোগের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ এ পরীক্ষায় বিরতি না দিলে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ পড়বে। তাই ন্যূনতম হলেও বিরতি থাকা উচিত। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির ইতিমধ্যে বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের চিহ্নিত না করে এখন পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপ দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এটা কোনভাবেই ঠিক হবে না। সুনির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং প্রশ্নপত্র এমনভাবে হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগের দিন পুরো বই রিভাইস দিতে না হয়। অর্থাত্ নিজেদের ব্যাসিক জ্ঞান থেকে লিখতে পারে। বর্তমানে অবশ্য ক্রিয়েটিভ প্রশ্ন বলতে সেটিই বুঝানো হচ্ছিল, বাস্তবে সেটি হয়নি। তবে বর্তমান পদ্ধতিতে দেড় মাস ধরে পাবলিক পরীক্ষা নেয়ারও যৌক্তিকতা নেই। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন সরকারি ছুটি ছাড়া পরীক্ষার মাঝে কোন গ্যাপ বা বিরতি দেয়া হবে না। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত বলে আমি মনে করি। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামীতে স্বল্প সময়ের মধ্যে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হবে। সেটি আগামী তিন-চার মাস পরে অনুষ্ঠিত জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষার সময় থেকেই শুরু করা যাবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি তিনি। পরীক্ষা পদ্ধতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনা হবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং প্রশ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার তা করা হবে। প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে আরও কঠোর করা হবে। মন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সব ব্যবস্থাই নেয়া হবে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস অনেকটাই কমে যাবে, কিন্তু কিভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে সেটিই প্রশ্ন। তদন্ত কমিটি মূল চারটি সুপারিশের বাইরে আরও ১৪টি সাধারণ সুপারিশ করেছে যেমন পাবলিক পরীক্ষার বিষয় অনধিক পাঁচটিতে নামিয়ে আনা, বিজি প্রেস ছাড়াও অন্যকোথাও উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া গেলে প্রশ্ন ছাপানোর ব্যবস্থা করা , বিজি প্রেসের গোপনীয় কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রতি ছয়মাস অন্তর গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রতিবেদন সংগ্রহ করা, বোর্ডের মডারেশন কক্ষে পর্যাপ্তসংখ্যক সিসি ক্যামরা স্থাপন, প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী ও সংশোধনকারী মনোনয়ন আবর্তনমূলক পন্থা অবলম্বন করা, এমসিকিউ প্রশ্নের নম্বর কমানো এবং আইনে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো। এই সাধারণ সুপারিশগুলোও মন্ত্রণালয়কে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে যে পরির্বতনগুলো আনার জন্য সংসদে যেতে হবে না এবং রাজনৈতিক কোন চাপ আসবে না। যেমন এমসিকিউ প্রশ্নের নম্বর কমানো, এটি সহজেই করা যায়। তাহলে শিক্ষার্থীদের জানার পরিধি ও ক্রিয়েটিভিটি অনেকটাই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। বিজি প্রেসে প্রশ্ন না ছাপানো। এরপূর্বেও প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত যত ঘটনাই ঘটেছে তার সাথে বিজি প্রেসের লোক জড়িত ছিল, প্রমাণও মিলেছে। কাজেই এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষাদানের মূল পাঁচটি উপাদান হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন। শিক্ষক কিভাবে শিখিয়েছেন, কি উপকরণ ব্যবহার করে শিখিয়েছেন, কতটা ফলপ্রসূ শিক্ষাদান হয়েছে শ্রেণিকক্ষে তার পুরো মূল্যায়ন করা হয় এই পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে। এই পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হলে পুরো শিক্ষাদান ব্যাপারটিই ত্রুটিপূর্ণ বলে ধরা হয়। কাজেই বিষয়টিকে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। লেখক: প্রোগ্রাম ম্যানেজার:ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং প্রাক্তন ক্যাডেট কলেজ অধ্যাপক ইমেইল: masumbillah65@gmail.com