আলোকপাত
মুক্তিযোদ্ধা সমাচার
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৯
আজ দীর্ঘ ৪৩ বছরের পরেও যদি দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রায়ই কাগজে কলমে ধরা পড়ে, তা খুবই দুঃখজনক। আজকে একজন বলিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. আ, ক,ম, মোজাম্মেল হক সাহেব মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হওয়াতে আমি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে খুবই গর্ব এবং অহংকার বোধ করি। একটা দেশে যুগে-যুগে রাষ্ট্র প্রধান হবে, মন্ত্রী পরিষদ হবে সেটাই নিয়ম, কিন্তু তাই বলে সকল মন্ত্রীর আমলে সকল ধরনের সংস্কার এবং সকল কাজের গুরুত্ব বাস্তবায়ন হয় না। তাই বলছি এবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একজন খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি এবং সত্ বিচারক।
দুঃখ হয় তখনই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যখন রিক্সা চালায়, এমনকি কেউ ভিক্ষা বৃত্তিতে জীবন ধারণের চেষ্টারত আছে এ ধরনের ছবি এবং কাগজে লেখা প্রায়ই দেখি তখন নিজেকে খুবই অসহায় বলে মনে হয়। ২ ফেব্রায়ারি ২০১৪ দৈনিক ইত্তেফাকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক মাতব্বর ৬৫ বত্সর বয়সেও সে পথের ভিখারী, নাই তার কোন রাড়ী-ঘর, জায়গা-জমি। ৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে পরের জায়গায় একটা চালা তোলে জীবন কাটাচ্ছে। এদের জন্য সরকার অন্তত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অনেক কাহিনী প্রায়ই দেখা যায় যেমন ২০১৩ সালের প্রথম দিকে দৈনিক কাগজে দেখতে পাই ২৪ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যেহেতু তারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সারাদেশে ডাটাবেজ তৈয়ার করার জন্য সরকার পদক্ষেপ নেওয়ার পর সেখানে মাত্র ৮৪ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ধরা পরায় তাদের নাম বাতিল করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন বর্তমানে দেশে একটা যাচাই বাছাইয়ের জরিপ এবং উপজেলা পর্যায়ে একটি Interview ব্যবস্থা করলে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ধরা পরবে এবং Automatic বাতিল হয়ে যাবে। আর এ ধরনের জরিপ চালানোর পূর্বে দৈনিক খবরের কাগজে জানাতে হবে সরকার জরুরী ভিত্তিতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই করবে। ঐ সঠিকতা যাচাইয়ের Interview-এর সময় উপজেলা UNO পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় UP চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকবেন। তাদের উপস্থিতিতে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশ্ন করা হবে। যেমন নাম ঠিকানা ভারতের কোন ক্যাম্পে ট্রেনিং করেছে। টেনিং অফিসারের নাম কি? কতদিন টেনিং হয়েছে? কি কি অস্ত্রের ট্রেনিং হয়েছিল? দেশে কোন কোন অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে? সহযোদ্ধা কয়েক জনের নাম বল? এই টুকু যাচাই বাছাই করতে সারা দেশে ৩ হতে ৪ দিন সময় লাগবে। এই প্রক্রিয়াই দুই নম্বর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা ঝরে পড়বে এবং বর্তমান তালিকা ছোট হয়ে যাবে।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে জরুরী এবং প্রথম প্রদক্ষেপ গ্রহণ করলে সরকারের দেশজুড়ে সুনাম ও সম্মান বাড়বে। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হল আজ ৪৩ বছর পরও দেশে কেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় থাকবে? এমন অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাই দীর্ঘদিন যাবত্ সরকারের সুযোগ সুবিদা ভোগ করে চলছে অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা অনেকই কষ্ট পাচ্ছে।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা কোন এক সময় থানা কমান্ডারকে পাঁচশত-এক হাজার টাকা দিয়ে থানা পর্যায় ঐ টাউট- বাটপার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে থানায় নাম উঠিয়েছে। ঐ সমস্ত ভুয়ারা ভারত কোন দিকে অবস্থিত তাও জানতো না তাও চিনে নাই অথচ আজ বড় দাপটের মুক্তিযোদ্ধা।
দুঃখ হয় দেশে আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার বলে দাবি করছে উঠতে বসতে অথচ দীর্ঘকাল পার হতে চলছে সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
গত ৫ র্মাচ ২০১৪ আমাদের সময় পত্রিকায় ৬ জন সচিব-যুগ্ম সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের জালিয়াতির নথিপত্র দুদুকে তলব করেছে। উক্ত সচিবদের যেখানে চাকরি হতে অবসরে যাওয়ার পালা, ঠিক সেই শেষ সময়ে সচিবদের মত জ্ঞানীরা এত বড় অজ্ঞানের কাজ যেন ভবিষ্যতে কেউ না করে তার দৃষ্টান্ত বিচার হওয়া দরকার।
গত ২৮ মে ২০১৪ একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় বলা হয়েছে তিন হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করা হবে। ঐ তিন হাজারের মধ্যেও সচিব থেকে শুরু করে প্রায় অনেক শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা রয়েছে এদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য মঙ্গল। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এবং প্রতিটি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড অফিসে একটি করে অভিযোগ বক্স স্থাপন করলে দ্রুত সময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য অভিযোগ বক্সে সহজে জমা হবে। ইহাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এবং সরকার লাভবান হবে।
দেশ ও জাতির খেদমতে আপনি যেন সুস্থ্য ও দীর্ঘায়ু জীবন কাটাতে পারেন সেই দোয়া কামনা করছি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা