নিন্দিত ও নন্দিত সাকিব আল হাসান
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৪, ২১:২৫
একে তো দরিদ্র দেশ, তদুপরি নানামুখি সমস্যার চাপে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত থাকিতে হয় সাধারণ মানুষকে। তাহাদের অন্যদিকে তাকানোর ফুরসতই-বা কোথায়? কিন্তু অকস্মাত্ সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে একটি প্রসঙ্গ। প্রসঙ্গ না বলিয়া একজন ব্যক্তি বলিলেই অধিক যুক্তিযুক্ত হয়। সেই ব্যক্তিটির নাম সাকিব আল হাসান। তাহার সহিত জনসাধারণের প্রত্যক্ষ স্বার্থ-সম্পর্ক দূরে থাক, প্রতিনিয়ত তাহারা যেইসব সমস্যায় নাস্তানাবুদ হইতেছেন তাহার সামান্যতম সম্পর্কও নাই। তবু আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আলোচনা ও উদ্বেগের মুখ্য বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছেন তিনি। ইহা হইতে সহজেই বোঝা যায় যে, এই তরুণটি তাহাদের কতোখানি প্রিয়। এই প্রিয়তা অকারণে নহে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পর্ণকুটিরে তাহার আবির্ভাব সম্রাটের মতোই। বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, ‘তিনি আসিলেন, দেখিলেন এবং জয় করিলেন।’ না, শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র ক্রিকেটবিশ্বই জয় করিয়াছেন বলা যায়। সেইটি যেমন রেকর্ডে-পরিসংখ্যানে, তেমনি পারফরম্যান্সে। মাত্র কিছুদিন আগে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ব্যয়বহুল ক্রিকেট আসর আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের শিরোপা জয়েরও অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। অতএব, সাকিব যে বাংলাদেশের গর্বের ধন তাহাতে বিন্দুমাত্র সংশয় নাই।
সেই সাকিব আল হাসানকে আগামী ছয়মাসের জন্য সবধরনের ক্রিকেট হইতে নিষিদ্ধ করিয়াছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। শুধু তাহাই নহে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আইপিএল-এর মতো কোনো আন্তর্জাতিক আসরেও খেলিতে পারিবেন না তিনি। সাকিবকেন্দ্রিক যাবতীয় আলোচনা-সমালোচনা ও উদ্বেগের মূলে রহিয়াছে বিসিবি-প্রদত্ত এই শাস্তি। স্পষ্টভাবে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে জনমত। শাস্তির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বিসিবি সভাপতি খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে, দীর্ঘদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাহাদিগকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করিয়াছে। তাহার মতে, সাকিব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করিতেন না। ইহাতে শুধু যে দলীয় পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তাহাই নহে, অন্য কয়েকজন ক্রিকেটারের আচরণেও তাহার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু এই যুক্তি অনেকেই গ্রহণ করিতে নারাজ। ক্রিকেটের সহিত সংশ্লিষ্ট অনেকে ইহাকে লঘুপাপে গুরুদণ্ড বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন। ইহার পিছনে পরশ্রীকাতরতা কিংবা অনুরূপ কোনো কূটরাজনীতির আশঙ্কাও ব্যক্ত করিয়াছেন কেহ কেহ। তাহারা এমনও বলিয়াছেন যে, সাকিবের আচরণে যদি কোনো বাড়াবাড়ি বা ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটিয়া থাকে—তাহার জন্য বিসিবিই দায়ী। আবার কেহ কেহ সদ্য নিয়োগকৃত উপমহাদেশীয় ক্রিকেট কোচের ভূমিকা লইয়াও প্রশ্ন তুলিয়াছেন।
সাকিব আল হাসান যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম তারকা—বিসিবি সভাপতিও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাহা স্বীকার করিয়াছেন। মেধাবী এই ক্রিকেটারের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও গোপন করেন নাই তিনি। সেই সাথে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্বার্থ ও শৃঙ্খলার উপর। বলিয়াছেন যে, অবস্থা এমন পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে যে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হইলে বিপর্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হইয়া পড়িবে। ইহা অনস্বীকার্য যে, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য নিয়ম-শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নাই এবং কেহই ইহার ঊর্ধ্বে নহে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তো বটেই—জাতীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য। সাকিব আল হাসান খ্যাতির শিখরে পৌঁছিয়াছেন। অতএব, তাহার ক্ষেত্রে নিয়ম-শৃঙ্খলার কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত নহে—এমন কথা যাহারা বলেন আমরা তাহাদের সহিত একমত নহি। বরং বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের রোল মডেল হিসাবে তাহার এমন কিছুই করা উচিত নহে—যাহা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত বা ভুল বার্তা প্রদান করিতে পারে।
আমরা শুধু এইটুকু বলিব যে, সাকিব অকপটে তাহার ভুল স্বীকার করিবেন এবং এই নিশ্চয়তা প্রদান করিবেন যে, ভবিষ্যতে ইহার পুনরাবৃত্তি ঘটিবে না। আর বিসিবিও তাহাদের কঠোর অবস্থান হইতে সরিয়া আসিয়া সম্ভাবনাময় এই ক্রিকেটারকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ করিয়া দিবেন। আমরা চাই অতি দ্রুত তিনি মাঠে ফিরিয়া আসুন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাহার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখুন। মনে রাখিতে হইবে যে, সাকিব ইতিমধ্যে শুধু যে অসীম সম্ভাবনাময় নূতন দিগন্তের সন্ধান পাইয়াছেন তাহাই নহে, সেই সম্ভাবনার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহারের সামর্থ্যও যে তাহার আছে—তাহাও প্রমাণ করিয়াছেন। অতএব, কোনো সংকীর্ণতার জালেই তাহাকে আবদ্ধ করিয়া রাখা যাইবে না।