স্মরণ
কবি আহসান হাবীব
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৪, ২১:১৪
আমি মেঘনাপাড়ের ছেলে/ আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।/ মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে/ তালের নৌকো বেয়ে/ আমি বেড়াই হেসে-খেলে—/ আমি মেঘনাপাড়ের ছেলে।
ছোটবেলায় এই পদ্যটি পাঠ্যপুস্তকে পড়ে কবি আহসান হাবীব নামটি আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। অবশ্য পাঠ্যপুস্তকে পড়া সকল কবি-লেখকই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আমার অন্তরে অধিক জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন যেখানে কবি আহসান হাবীব অন্যতম। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৮৪ সালের শেষদিকে। তখন আমি দু’-চারটি কবিতা লেখা শুরু করেছি। দৈনিক বাংলার ডাকসাইটে সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে গিয়ে সেগুলো দেখার দুঃসাহস দেখালাম। তাঁর ব্যবহার আমাকে এতোই মুগ্ধ করল যে আমার ভয়-ভীতি কখন-কোথায় উধাও হয়ে গেল টের পাইনি। তিনি মনযোগ দিয়ে কয়েকটি কবিতা পড়ে ছন্দের ত্রুটি, শব্দের ত্রুটি, বাক্যের ত্রুটি ধরিয়ে সেগুলোর নিচে দাগ টেনে দিলেন। ১৯৮৫ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকে ১০টি কবিতা নিয়ে আবার দেখা করলাম প্রিয় কবির সাথে। তিনি সযত্নে রেখে দিয়ে বললেন, দু’/তিন দিন পরে এসো, আমি দেখে রাখব। দু’দিন পর এসে যখন দৈনিক বাংলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে কবির কক্ষে প্রবেশ করলাম তিনি তখন বের হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সালাম দিয়ে দাঁড়াতেই আমার কবিতাগুলো হাতে নিয়ে বললেন, আমি একটু বেরোচ্ছি তুমি আমার সাথে এসো। বলে পাশের রুমে কবি নাসির আহমেদের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, এই ছেলেটির কবিতাগুলো আমি সংশোধন করে রেখেছি, তুমি একটু বুঝিয়ে দিও। তিনি যাবার পর কবি নাসির আহমেদ আমাকে বসিয়ে আমার কবিতার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ধরে ধরে বুঝালেন যেগুলোতে কবি আহসান হাবীব দাগ দিয়ে রেখেছেন। কিছুটা প্রস্তুতি নিয়েই আবার যাবই কবি আহসান হাবীবের কাছে। কিন্তু ১০ জুলাই ১৯৮৫ সালে রেডিওতে খবর শুনলাম কবি আহসান হাবীব আর নেই। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল শুভ্র কেশধারী আধুনিক মানুষটির ছবি, যেন কবিতার মত তাঁর মুখ।
আমি মনে করি, এখন আর কবি আহসান হাবীবের মত কোন সাহিত্য সম্পাদক নেই যিনি অজপাড়াগাঁ থেকে আসা কোন তরুণকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন, তাঁর লেখার ভুল-ত্রুটি শুধরিয়ে দিতে পারেন। আজ চল্লিশের দশকের শক্তিমান এই কবির মৃতুবার্ষিকী। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। কবি আহসান হাবীবের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুর জেলার শঙ্করপাশা গ্রামে। পিতা হামিজউদ্দিন হাওলাদার ও মাতা জমিলা খাতুন। কবি হওয়ার একান্ত বাসনা থাকায় ও তাঁর পিতার সাথে সামান্য মনোমানিল্য থাকায় তিনি ১৯৩৬ সালের শেষদিকে কলকাতা চলে যান। এসএসসি-র পর আর লেখাপড়া এগোয়ানি। শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। আকাশবাণী কলকাতায়ও কিছুদিন কাজ করেছেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯৬৪ সালে তত্কালীন দৈনিক পাকিস্তানে (পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা) যোগ দেন। এই পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি কিংবদন্তীতুল্য খ্যাতি অর্জন করেন। কবি আহসান হাবীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে কলকাতার কমরেড পাবলিশার্স থেকে যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। এছাড়াও প্রকাশিত কবিতার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ছায়াহরিণ, সারাদুপুর, আশায় বসতি, মেঘ বলে চৈত্রে যাব, দু’হাতে দুই আদিম পাথর, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ ইত্যাদি। আরো লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ। অনুবাদ করেছেন ছোট ও বড়দের জন্য। ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা লিখেছেন প্রচুর। বাংলা সাহিত্যে কবি আহসান হাবীবের অবদান চিরদিন অমর-অক্ষয় থাকবে প্রত্যাশা করি। তিনি স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। খ্যাতিমান এই কবির মৃত্যুদিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক