স্মরণ

বশির আহমেদ :জীবনের শেষ গান

‘তুমি ছিলে এই জীবনে শেষ আশ্রয়—তোমার কাছেই মানতে হলো করুণ পরাজয়’—ঠিক ঠিকই পরাজয় মানলেন বিশিষ্ট শিল্পী ও সুরকার বশির আহমেদ। চলে গেলেন—না ফেরার দেশে। গত ১৯ এপ্রিল রাত সাড়ে দশটায় তাঁর জীবনাবসান হয়। উল্লেখিত গানের কথাগুলোতে তিনি বিভিন্ন রাগের আশ্রয়ে বেশ কয়েক রকম সুর করেছিলেন এই খ্যাতিমান শিল্পী ও সুরকার গত একবছরে। কিন্তু কোন সুরই তার ভালো লাগছিল না। তৃপ্ত হতে পারছিলেন না তিনি। যেহেতু নিজের সুরে নিজেই কণ্ঠ দেবেন গানটিতে তাই সর্বশ্রেষ্ঠ সুরটি করার প্রাণান্ত চেষ্টার শেষ ছিলো না তাঁর। কিন্তু ভালো হূদয়গ্রাহী সুর যে কখন সৃষ্টি হবে তাতো কেউ বলতে পারবে না। হঠাত্ কখনো হয়তো চমত্কার কোন সুর চলে আসে সুরকারের হারমোনিয়ামের রিডে। মৃত্যুর প্রায় দু’মাস আগে শিল্পী বশির আহমেদ গানটি নিয়ে আবার বসেন। আমাকে ডাকলেন—বসলাম দু’জনে—যদি কোন সুন্দর সুর সৃষ্টি হয়। হঠাত্ তাঁর একটা সুর পছন্দ হলো। তাঁর একমাত্র ছেলে শিল্পী ও সুরকার রাজা বশির আহমেদের নিজের গড়া স্টুডিওতে গানটা রেকর্ড করার জন্যে তাঁর খসড়া ভোকাল দিলেন—গাইলেন বশির আহমেদ— রেকর্ড হলো ট্রাকে। কিন্তু পরবর্তীতে ফাইনাল। ভোকাল বা চূড়ান্ত কণ্ঠ আর দেয়া হলো না গানটিতে। অসুস্থ হয়ে পড়লেন। যে কণ্ঠে ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’—‘যারে যাবি যদি বা পিঞ্জর খুলে দিয়েছি”—‘ডেকোনা আমারে তুমি’—‘এই তো শুধু আমার জন্যে কারাগার’—‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’ ইত্যাদি দরদভরা জনপ্রিয় গান গেয়েছেন সেই কণ্ঠ যেনো স্তিমিত হয়ে আসছিল—শব্দ বের হচ্ছিল না তাঁর সেই সুললিত কণ্ঠে। অভিমান করে বশির আহমেদ দীর্ঘ দু’বছর রেডিওতে প্রোগ্রাম করেননি। বিটিভিতেও অনেকদিন তিনি প্রোগ্রাম করেননি একই কারণে। প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র বা বাদক না থাকাতে তিনি অনেকবার রেডিওতে লাইফ বা রেকর্ডিং প্রোগ্রাম না করে ফিরে এসেছেন। গানে সঠিক ও প্রয়োজনীয় বাজনার ব্যবহার তিনি জানতেন—তাই তিনি আপোষ করেননি এই ব্যাপারে—গানের সঙ্গে সুরের সঙ্গে। একদিন তাঁর সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছি। হঠাত্ দেখলাম কিছু লোক একটা লাশ বয়ে নিয়ে আসছে। তিনি লাশ আসছে দেখে রিকশাওয়ালাকে থামতে বললেন। রিকশাওয়ালা যেতে চাইলে ধমক দিলেন তাকে। যতক্ষণ না লাশ তাঁকে অতিক্রম করে না গেলো—ততক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন শিল্পী বশির আহমেদ। বললেন—একজন চলে যাচ্ছে চিরবিদায় নিয়ে কবরের দিকে—আর আমি দর্পভরে রিকশা হাঁকিয়ে তাকে অসম্মান করে এগিয়ে যাবো? ঠিক তাঁকেই গত ১৯ এপ্রিল দুপুর আড়াইটায় কাঁধে নিয়ে হেঁটে হেঁটে গেলাম কবর দেয়ার জন্যে ঠিক সেই রাস্তাটা দিয়ে। অনেক গাড়ি, রিকশা দাঁড়িয়ে গেলো তাঁর লাশ আসছে দেখে। এই তো নিয়তি—এইতো বিধাতার খেলা! আমি অনেক সাংবাদিককে দেখেছি তার সাক্ষাত্কার নিতে এসে ফিরে গেছেন। উনি সাক্ষাত্কার দেননি। কারণ হিসেবে তাকে জিজ্ঞেস করতাম, কেন সাক্ষাত্কার দেন না? জবাবে তিনি বলতেন—দেখ রঙ্গু যারা আসে এরা অনেকেই জুনিয়র সাংবাদিক। এরা আমার ব্যাপারে কিছুই জানে না। কি জিজ্ঞেস করবে কি বলবো। যারা আমার সম্পর্কে জানে তারা এলে তো আমি ফিরিয়ে দিই না। সময় দেই, কথা বলি। একদিন এই গুণী শিল্পী বলেছিলেন, যখন তিনি ভারতে ওস্তাদের কাছে গান শিখতেন তখন একদিন ওস্তাদ বেশ অসুস্থ, কেশে কেশে কফ ফেলার পাত্র খুঁজছিলেন কিন্তু গানের ক্লাসে কফ ফেলার পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন এই শিল্পী বশির আহমেদ নাকি নিজের হাত দুটো ওস্তাদের সামনে পেতে দিয়েছিলেন কফ ফেলার জন্যে। এই সেই শিল্পী বশির আহমেদ—যিনি ওস্তাদের কদর বুঝেছিলেন—ওস্তাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন সঠিক তালিম ও দোয়া। যার জন্যে বশির আহমেদ হতে পেরেছিলেন কালজয়ী বিখ্যাত শিল্পী ও সুরকার বশির আহমেদ। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন- রঙ্গু, শ্রোতারা আমাকে অনেক ভালোবাসা দিলো—অনেক কিছু দিলো—আমি তো কিছুই দিতে পারলাম না শ্রোতাদেরকে—এই নিয়ে গান লিখে দিতে—আমি লিখলাম - “অজস্র ভালোবাসা দিলে তোমরা কি করে দেবো তার প্রতিদান-আমি এক সাধারণ শিল্পী-আছে কিছু সুর আর গান” — তিনি গাইলেন বিটিভিতে বেশ কয়েকবার গানটি। বাংলা আধুনিক গানের সম্রাট দরদী শিল্পী ও সুরকার বশির আহমেদ অমর হয়ে থাকবেন সবার হূদয়ে—স্মৃতিতে। গানের জগতে আরেক বশির আহমেদ কোনদিন সৃষ্টি হবে না আর—তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। লেখক:গীতিকার