জেলা পরিষদের ভবিষ্যত্

জেলা পরিষদের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠিয়াছে। প্রশ্নটি যিনি তুলিয়াছেন তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীই শুধু নহেন, একইসাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও বটে। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি বিশেষ বিবেচনা বা গুরুত্বের দাবি রাখে। ইহাও তাত্পর্যপূর্ণ যে, প্রশ্নটি তিনি তুলিয়াছেন সদ্য সমাপ্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে। নির্বাচিত জেলা পরিষদ কিংবা জেলা পরিষদে সরকার নিয়োজিত প্রশাসকের উপস্থিতি যে ডিসিদের জন্য সুখকর হইবার কথা নহে তাহা সহজেই বোধগম্য। প্রসঙ্গত মন্ত্রী বলিয়াছেন যে, এতো বেশি স্থানীয় সরকার থাকাটা ভালো নহে। বরং অপ্রয়োজনীয় শাখা-প্রশাখা তৈরি না করাই ভালো বলিয়া তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তাহার মতে, প্রশাসনের কাঠামো যত বেশি হয়, বরাদ্দের প্রয়োজনও তত বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে জেলা পরিষদের প্রয়োজন আছে কিনা তাহা বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন। একইসাথে নূতন কাঠামো বা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির আগে খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়াছেন তিনি। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলির জাতীয় বাজেটের বৃহদংশই যে বেতন-ভাতার মতো অনুন্নয়নশীল খাতে ব্যয় হইয়া যায় তাহা কোনো নূতন কথা নহে। অতএব, শুধু খরচের দিক হইতে দেখিলেও মন্ত্রীর যুক্তি যে অগ্রাহ্য করা কঠিন তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে জেলা পরিষদ তথা স্থানীয় সরকারের বিষয়টি এতো সরল নহে। ঐতিহ্যগতভাবে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ধারণা নূতন নহে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় জেলা পরিষদের প্রয়োজন আছে কিনা, কিংবা এতো বেশি স্থানীয় সরকার থাকাটা যুক্তিযুক্ত কিনা—এমন প্রশ্ন আগেও উঠিয়াছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে প্রথম দফায় সরকার গঠনের পর পরই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠিত হইয়াছিল। সেই কমিশন সংবিধানে প্রদত্ত নির্দেশনার আলোকে সকল পর্যায়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যেই সুপারিশমালা প্রণয়ন করিয়াছিলেন বর্তমান জেলা পরিষদ তাহারই ফসল বলা চলে। বলাবাহুল্য, জাতীয় সংসদে এই লক্ষ্যে আইনও প্রণীত হইয়াছিল। আইন প্রণেতাদের মূল অভিপ্রায় ছিল ইউনিয়ন হইতে জেলা অবধি স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়া ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দৃশ্যত তাহা সম্ভব হইলেও জেলা পরিষদে অদ্যাবধি নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই সম্ভব হয় নাই। ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হইলেও গত আড়াই বত্সর যাবত্ সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরাই প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করিতেছেন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও যেইখানে স্থানীয় সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দুইটির কার্যকারিতা লইয়া প্রশ্নের শেষ নাই, সেইখানে অনির্বাচিত ও অপরীক্ষিত জেলা পরিষদের অবস্থা কতোটা নাজুক তাহা সহজেই অনুমেয়। শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিগত বত্সরগুলিতে বিস্তর কাঠখড় পোড়ানো হইয়াছে। এই বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও যে সদিচ্ছার কোনো অভাব নাই—তাহাও প্রমাণিত। কিন্তু কাজটি যে খুবই জটিল তাহা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব কোনো নূতন বিষয় নহে। তবে জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিকদের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্য বা দৃশ্যমান বলিয়া বিষয়টি যতটা আলোচিত-সমালোচিত, ক্ষমতার আসল দ্বন্দ্বটি অপ্রকাশ্য বলিয়া ঠিক ততোটাই পর্দার অন্তরালে রহিয়া গিয়াছে। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, উপজেলা ব্যবস্থা যখন প্রবর্তিত হয় তখন ইহার কর্তৃত্ব কাহার হাতে থাকিবে— উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নাকি নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান—সেই বিতর্ক সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছিল। বলা যায়, প্রশাসন ও রাজনীতির এই দ্বন্দ্ব আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলা পরিষদও ইহার ব্যতিক্রম নহে। তবে স্থানীয় সরকারের এই ধাপটির ভবিষ্যত্ কী হইবে—সেই বিষয়ে এখনই শেষ কথা বলা যাইবে না। কারণ আইনটি সংশোধন বা রহিত করিতে হইলে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন রহিয়াছে। সংসদের সম্মতিও হয়তো লাগিবে। বাস্তবতা যাহাই হউক, আখেরে জনপ্রতিনিধিগণ নিজের পায়ে কুড়াল মারিতে সম্মত হইবেন কিনা—তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।