গাজায় ইসরাইলী বিমান হামলা

গাজায় ইসরাইলী বিমান হামলা অব্যাহত রহিয়াছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এই নির্বিচার হামলায় শিশুসহ ১২৩ জন নিহত হইবার সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলিয়াছেন, আন্তর্জাতিক কোনো চাপের কাছে তাহারা নতি স্বীকার করিবেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়াছেন। কিন্তু কোনো ফলোদয় হয় নাই। ২০১২ সালে যে শক্তি লইয়া তাহারা হামলা চালাইয়াছিল, এইবার তাহার দ্বিগুণ শক্তিতে হামলা চালান হইতেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, ইসরাইলী ভূখণ্ডে হামাস সমর্থকদের রকেট নিক্ষেপের প্রতিশোধ লইতে ইসরাইল গত মঙ্গলবার গাজায় বিমান হামলা শুরু করে। ২০১২ সালে অস্ত্র বিরতির দেড় বত্সর পর ফিলিস্তিনে ফাতাহ ও হামাসের ঐকমত্যের সরকার গঠিত হইবার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইলী নেতৃবৃন্দ যেইরূপ অসহিষ্ণু মন্তব্য করিয়া যাইতেছিলেন তাহাতে নূতন করিয়া সংঘাতের আশঙ্কা করিতেছিলেন অনেকেই। সেই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হইল। সাত বত্সর ধরিয়া চলিয়া আসা সহিংস সংঘাতের আপাত সমাপ্তি ঘটাইয়া গত মাসে ফিলিস্তিনে ঐকমত্যের সরকার গঠন করে ফাতাহ ও হামাস। হাজারো সন্দেহ ও অনৈক্যের বেড়াজাল অতিক্রম করিয়া গঠিত এই সরকার লইয়া ফিলিস্তিনীদের মধ্যে স্বভাবতই ব্যাপক উত্সাহের সঞ্চার হয়। সাধারণ ফিলিস্তিনীদের অনেকেই ভাবিতে শুরু করেন যে, দীর্ঘদিন ধরিয়া ধামাচাপা পড়িয়া থাকা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিষয়টি এইবার নূতন করিয়া গতি পাইবে। তবে তাহাদের সে আশার বাস্তব রূপায়ন মোটেও যে সহজ নয়, চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি সেই সাক্ষ্যই বহন করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও ফিলিস্তিনের প্রধান প্রতিপক্ষ ইসরাইল ফাতাহ-হামাসের ঐক্যকে কিভাবে গ্রহণ করে তাহার উপরেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হইবার বিষয়টি বহুলাংশে যে নির্ভর করে, সে কথা নূতন করিয়া বলিবার দরকার পড়ে না। সংকটের আলামত অবশ্য পাওয়া যাইতেছিল ঐকমত্যের সরকারের যাত্রা শুরুর পূর্বেই। ইসরাইল জানাইয়া দিয়াছিল যে, হামাস-অন্তর্ভুক্ত নূতন সরকারের সহিত তাহারা কোন ধরনের শান্তি-আলোচনায় বসিবে না। উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে ফাতাহ-হামাস ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দেয়ামাত্রই শান্তি আলোচনা হইতে সরিয়া যায় ইসরাইল। পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যেও এই নূতন রাজনৈতিক উন্নয়ন লইয়া সতর্ক মনোভাব লক্ষ্য করা যাইতেছিল। উল্লেখ্য, ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্ব হামাসকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করে। এমনকি এই সংগঠনটির সহিত যেকোন ধরনের সংস্রব তাহারা পরিহার করে। ইসরাইল আরও জানাইয়াছিল যে, এখন হইতে গাজা-কেন্দ্রিক যেকোন ইসরাইল-বিরোধী হামলা ও তত্পরতাকে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের কার্য হিসাবে ধরিয়া লইয়া ব্যবস্থা নেওয়া হইবে। বর্তমান হামলা সেই হুমকির বাস্তবরূপ। প্রেসিডেন্ট মাহামুদ আব্বাস গত মাসে ঘোষণা করিয়াছিলেন যে, নূতন সরকার ইতিমধ্যে অর্জিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার ধারাগুলি মান্য করিবে। ইহার অর্থ ফিলিস্তিন সরকার ইসরাইলের অস্তিত্ব স্বীকার করিবে এবং লক্ষ্য অর্জনে সহিংসতার পথ পরিহার করিবে। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে এইরকম একটি ঘোষণার সহিত হামাস নিজেকে মানাইয়া লইতে পারিয়াছে কিনা! উল্লেখ্য, হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং ফিলিস্তিনের লক্ষ্য অর্জনে বল-প্রয়োগের নীতির অনুসারী। হামাস যদি সরকারের যোগদানের পরেও আগের অবস্থানে অটল থাকে তাহা হইলে ফাতাহ মানাইয়া লইবে কি করিয়া? সে যাহাই হউক, ইসরাইল তাহার অস্তিত্বের প্রশ্নে আপোষহীন থাকিতে চাহিবে-ইহাই বাস্তবতা। পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নটির সমাধান হইতে হইবে। তবে আঘাত করিবার আগে নিজেদের সামর্থ্যের কথাটিও বিবেচনায় রাখা কর্তব্য। সংঘাত ও রক্তপাতের মধ্যদিয়া এই সমস্যার সমাধান যে সম্ভব নয়, বিগত ৬৬ বত্সরের ইতিহাসই তার বড় প্রমাণ। ইসরাইলী বিমান হামলায় গাজায় যে মানবিক বিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছে তাহা অবশ্যই নিন্দাই। বাংলাদেশসহ শান্তিকামী বিশ্ব এই হামলা বন্ধের আহ্বান জানাইয়াছে। গাজায় রক্তপাত বন্ধ হউক। সংঘাত নয়, শান্তি ও সমঝোতার পথেই সমাধান খুঁজিতে হইবে।