নীলক্ষেতের সার্টিফিকেট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকণ্ঠে এক ব্যস্ত ব্যবসা কেন্দ্র নীলক্ষেত। বহুদিন ধরিয়াই বিচিত্র ও রকমারি সেবা দিয়া ঢাকাকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রিরূপে কাজ করিয়া চলিয়াছে এই নীলক্ষেত। তাহার সেবার মানও দিন দিন উন্নত হইতেছে। যেকোনো বই প্রদান করিলে তাহারা প্রচ্ছদসমেত প্রায় অবিকল প্রতিলিপি তৈয়ার করিয়া দিতে পারে। পাসপোর্ট আকার হইতে যেকোনো আকারের চিত্র তাহারা ছাপিয়া দিতে পারে, অল্প অর্থে। আর্কিটেক্টের ডিজাইন, গবেষকের থিসিস, শিক্ষার্থীর নোট ইত্যাদির লিপি-প্রতিলিপি তৈয়ার করিতে নীলক্ষেতের জুড়ি নাই। সাম্প্রতিক নানান প্রযুক্তি দিন দিন সকলকিছুকে সহজ ও নান্দনিক করিয়া তুলিতেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক কেহই নীলক্ষেতকে এড়াইয়া শিক্ষা কার্যক্রম সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। নীলক্ষেত পাইরেট, কিন্তু তাহার পাইরেসির ধরনটি তৃতীয় বিশ্বের একজন সাধারণ বিত্তের শিক্ষার্থীর নিকট আশীর্বাদস্বরূপ। তবে নীলক্ষেত তাহার এখতিয়ারের সীমা ছাড়াইয়া যাইতে চাহিতেছে যেন। শিক্ষা কার্যক্রমকে সুলভ করিয়াছে নীলক্ষেত, কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছাড়াই শিক্ষার্থীকে সনদ প্রদানের দায়িত্বও নীলক্ষেত নিজ হাতে তুলিয়া লইয়াছে। জাল সনদের কারবার চলিতেছে এইখানে। সনদের বিনিময়মূল্যও তেমন অধিক নহে। পাওয়া নাকি যায় সব ধরনের সনদই, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিবিএ কিংবা মেডিক্যালের। পত্রিকায় ইহা লইয়া চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন ছাপা হইয়াছে। পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়, একটি চক্র গোপনে এই কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে এবং যদিও সনদ ক্রেতার সহিত তাহাদের যোগাযোগ ঘটিতেছে নগদে নগদে। একজন শিক্ষার্থী কত হাজার শিক্ষার্থীকে মেধার জোরে পিছনে ফেলিয়া সুযোগ পান ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কত বছর, কত মেধা ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়া তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও সনদ লাভ করেন। অথচ কয়েক হাজার টাকা খরচ করিয়াই যদি একটি সনদ ক্রয় করা যায়, তাহা হইলে পুরা জাতির জন্যই ইহা এক বিপর্যয়কর সংবাদ। মানুষের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের কোনো মূল্যই থাকে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিরও আর দরকার পড়ে না, শিক্ষা-দীক্ষার প্রয়োজনই আর অবশিষ্ট থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি চাকুরী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সন্দেহবশত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ যাচাই করিলে, জাল সনদের অস্তিত্ব ধরা পড়িয়াছে। পরীক্ষা করিয়া দেখা গিয়াছে যে উহা ভুয়া। এই চৌর্যবৃত্তি যদি এখনই দমন করা না যায়, তাহা হইলে ইহা দেশব্যাপী মহামারী আকারে ছড়াইয়া পড়িবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এই বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব সচেষ্ট হইয়া পদক্ষেপ লইতে হইবে। নীলক্ষেত এলাকাটি অত্যন্ত জনবহুল হইলেও ছোট এবং ওই চক্রটিকে ধরিয়া ফেলা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি চাকুরী প্রদানকারী সংস্থাগুলিকেও সতর্ক হইতে হইবে যে, জাল সনদের জোরে কেহ যেন চাকুরী না পাইয়া যায়। প্রয়োজনে সন্দেহজনক সনদকে প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার জন্য পাঠাইতে হইবে। আর সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষকেও ভাবিতে হইবে কিভাবে সনদ জালকে রোধ করা যায়। সনদের নিরাপত্তা সূচকগুলিকে অধিক নির্ভরযোগ্য করিয়া তুলিতে হইবে। জলছাপ হউক আর হলোগ্রাম হউক সর্বাধুনিক নিরাপত্তা সীলমোহর সনদের গায়ে সংযোজন করিতে হইবে, যাহাতে অনুলিপি আর মূল সনদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা যায়। এমনিতে সনদের জন্য আমাদের দেশে যে কাগজ ব্যবহার করা হয়, তাহা এমন বিশেষ কোনো কাগজ নহে। উন্নত দেশে শিক্ষা সনদের জন্য অত্যন্ত বিশেষায়িত কাগজ ব্যবহার করা হইয়া থাকে। আবার শিক্ষাবোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দুর্নীতির মাধ্যমে কেউ শূন্য-সনদ পাচার করিতেছে কিনা সেই দিকেও সতর্ক দৃষ্টি দিতে হইবে। যেভাবেই হউক, এই বিপর্যয় ঠেকাইতেই হইবে।