সড়কপথে জনদুর্ভোগ
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:০৬
যেকোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাহার যোগাযোগ ব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য। যোগাযোগ ব্যবস্থা যে দেশের যত উন্নত, বলা যাইতে পারে, সেই দেশের অগ্রযাত্রার পথও ততখানি মসৃণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া কোনো দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে পারিয়াছে, এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। পর্যটন, সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত ও আমদানি-রপ্তানির মালামাল পরিবহনের সহিত দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রহিয়াছে । কিন্তু উন্নয়নের অন্যতম প্রধান এই নিয়ামকের প্রতি কোনো দেশে যদি অবহেলা পরিলক্ষিত হয়, তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে দেশটি নিশ্চিতভাবেই পিছাইয়া পড়িবে। দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় যতই বর্ধিষ্ণু হউক তাহা কেবল মনের খোরাক যোগাইতে সক্ষম, প্রকৃত উন্নয়নের সহিত ইহার কোনো সম্পর্ক নাই। যোগাযোগ অবকাঠামো অনুন্নত রাখিয়া সেই প্রকৃত উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নহে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা উত্তরকালে বিশেষ করে আশির দশকের মধ্যভাগ হইতে শুরু করিয়া দুই দশকের ব্যবধানে সড়ক অবকাঠামোর প্রভূত উন্নতি সাধিত হইলেও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যা রহিয়া গিয়াছে। সড়ক-মহাসড়কের এখনকার অত্যন্ত করুণ অবস্থাই তাহার প্রমাণ। দেশের বেশিরভাগ মানুষ সড়কপথে যাতায়াত করিয়া থাকেন। কিন্তু এক্ষণে সড়ক-মহাসড়কগুলির অবস্থা বেহাল। খানাখন্দকে ভরা রাস্তার যানজট লাগিয়াই থাকে। ঈদ সামনে রাখিয়া এই সমস্যা আরও প্রকট হইয়াছে। তাহার উপর রহিয়াছে সড়কে নিত্য-নৈমিত্তিক দুর্ঘটনা। অন্যদিকে অসহ্য যানজট দেশের অর্থনীতিসহ জীবনযাত্রার সকল ক্ষেত্রকে একরকম স্থবির করিয়া দিয়াছে। রাস্তাঘাটের এহেন করুণ অবস্থাই বলিয়া দেয়—আমরা জনগণের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি পুরোদস্তুরই ভুলিয়া বসিয়াছি। সীমিত সামর্থ্যের এই দেশটির যোগাযোগ খাতে সাংবাত্সরিক বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হইলেও নানামাত্রিক সমস্যায় তাহার সদ্ব্যবহার করা সম্ভবপর হয় না। যাতায়াত অবকাঠামো—উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে নানা অনিয়ম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
দেশের আর্থিক বিবেচনায়—যোগাযোগ খাতে সহসাই আমূল পরিবর্তন হয়তো সম্ভব নহে। কিন্তু এই খাতে দুর্নীতির রাশ টানিয়া ধরা সম্ভব হইলে স্বল্প পরিসরে হইলেও এই খাতটির প্রকৃত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবে বলিয়া আমরা মনে করি। যোগাযোগ খাতের নানান স্তরে যে সঠিক জবাবদিহিতার অভাব রহিয়াছে, যোগাযোগমন্ত্রী তাহা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন—উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সকল তথ্য তাহার নিকট সঠিকভাবে প্রদান করা হয় না। ফলে উন্নয়ন ও সংস্কারকর্মে নানামাত্রিক জটিলতা, স্থবিরতা এবং অনিয়ম স্থায়ী আখড়া গাড়িয়া বসিয়াছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কার খাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অসংখ্যবার ‘বিশেষ বরাদ্দে’র ব্যবস্থা করিলেও তাহার সুফল জনগণের দ্বারে পৌঁছাইয়াছে খুব কম ক্ষেত্রেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির কোনটির হিসাবেই প্রতি বত্সর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দশ হাজারের নীচে নহে। দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে ঢাকা শহরে দৈনিক যে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয় তাহা একরকম অবাক করিবার মত। দেশের প্রধানতম অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরিপোশাক শিল্প মালামাল পরিবহনে তীব্র যানজটের কারণে বার্ষিক প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা হারাইতেছে বলিয়া জানাইয়াছেন এই শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এই সকল চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগের।
রাস্তা-সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। সময়-সময়ান্তরে সংস্কার-মেরামতের কাজ করা হইলে একই সময়ে এত জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না। সময়ের কাজ সময়ে করা কর্তব্য। কথায় বলে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ। সংস্কার ও মেরামতের কাজ কেন যথাসময়ে হয় না সেই বিষয়টি তলাইয়া দেখা প্রয়োজন। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।