রাজধানীর ভয়াবহ যানজট সমস্যা ও করণীয়
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:০৭
ঢাকা আয়তনের দিক থেকে ছোট হলেও এই শহরটিতে প্রায় দেড়-দুই কোটি মানুষের বসবাস। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকা বিশ্বের ৪র্থ মেগাসিটি। মূলত এদেশের সবকিছু ঢাকা কেন্দ্রীক হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্ব অত্যধিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপরীতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপের প্রতি লক্ষ্য রেখে পূর্বের কোন সরকারই শহরের সড়কগুলো সম্প্রসারণ, বর্ধিতকরণ ও সংস্কারমূলক কার্যক্রম গুরুত্ব সহকারে আমলে নেননি। যদিও বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন যা ইতিবাচক। কিন্তু এর সুফল পেতে নগরীর জনগণকে আরো বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। ফলে রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান যানবাহন ও জনসংখ্যার চাপে ঢাকার জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।
এই অবস্থা আর কিছুদিন চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকা মহানগরী কার্যত স্থবির হয়ে পড়বে। কেবল নগরী নয় এর আশেপাশের পাড়া-মহল্লা, অলি-গলি, রাস্তাঘাট অসহনীয় যানজট ও অধিক জনসংখ্যা নগরীকে এক প্রকার গ্রাস করছে। সামাজিক অপরাধ ও অপকর্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার নমুনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে শুরু করেছি। ভোর ৬টা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত অকল্পনীয় যানজট ও জনগণের চাপে নগরীর জনজীবন এক প্রকার অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যুগ যুগের সৃষ্ট অনিয়ম ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অভাবে আজ ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের শহরগুলো ভয়াবহ সঙ্কটে নিপতিত হচ্ছে। তথ্য মতে, শুধু ঢাকা শহরেই যানজটের কারণে যে পরিমাণ সময়ের অপচয় হচ্ছে তাতে প্রতিবছর প্রায় দেড় থেকে দুইশত কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি সুষ্ঠু নাগরিক ব্যবস্থা দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
নগরীতে অপরিকল্পিত যানজটের কারণে বসবাসরত প্রায় প্রতিটি মানুষ জরুরি চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে যানজটের কবলে পড়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে হচ্ছে। জরুরি সংকটে পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেট, এম্বুলেন্সসহ নাগরিক সুবিধা প্রদানকারী সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় ত্বরিত ব্যবস্থা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। অস্বাভাবিক যানজটের কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা, অফিস-আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, কারখানার শ্রমিকরা নির্ধারিত সময়ে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষাক্রমসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা বাধাগ্রস্ত এবং উত্পাদনশীল প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমঘন্টা বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে চাপ পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে।
সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ ও যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নগরীতে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন অধিক যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও গ্যাস সামগ্রিকভাবে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তুলছে। সুস্থ ও সুন্দর জীবন রক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। নগরীতে বসবাসরত মানুষগুলো নিজের অজান্তে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শব্দ দূষণের ফলে এখানকার মানুষগুলো মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের কর্মজীবন শেষে এক কথায় বিশ্রামের ব্যবস্থাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এইক্ষেত্রে প্রতীয়মান হচ্ছে যুগ যুগ ধরে নগরীর সড়কগুলোর তেমন কোনো উন্নয়ন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন না হওয়ায় নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা যানবাহন ও অধিক জনসংখ্যা দিন দিন নগরীকে ক্যান্সারের মতো গ্রাস করছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই যতদ্রুত সম্ভব উন্নয়নমূলক কাজে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঢাকা নগরীর সড়ক ও পথগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উক্ত সঙ্কট সমাধান এবং এর জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে নগরীতে প্রতিটি রাস্তায় প্রতিদিন ভয়াবহ যানজট ও রাস্তায় স্থায়ী জলবদ্ধতার দরুন আমাদের জীবন থেকে যে মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতি ও সুষ্ঠু নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে তা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্টদের উক্ত সঙ্কট নিরশনে উল্লেখিত বিষয়গুলোর দিক অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। প্রতিটি রাস্তা সংস্কার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও ফ্ল্যাইওভার নির্মাণের দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। অধিক যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফিটনেজ বিহীন অবৈধ অধিক যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। এ সংক্রান্ত আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন চালকদের ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সড়ক বা রাস্তার ডান, বাম ও মাঝের নির্ধারিত লেন পদ্ধতি মেনে বাস, ট্রাক, মিনিবাস, সিএনজি, মাইক্রোবাস, জিপ, ইত্যাদি যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: লাইব্রেরিয়ান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি