[ রা জ নী তি ]

যারে দেখতে নারি... বিদূষণের রাজনীতি ও বাংলাদেশ

যারে দেখতে নারি— তার বাঁকা চলন খোঁজার মধ্যে মানব মনের চিরায়ত ঈর্ষার একটা বিষয় হয়তো থাকে, কিন্তু তা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। আর যদি তার চলন সত্যিই বাঁকা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সেই বাঁকা চলনের নিন্দে করতে আমরা কখনোই কার্পণ্য করি না। আমাদের কার্পণ্য যতো সব অন্যের প্রশংসায়। মোটা দাগে বাঙালি প্রশংসা-বিমুখ জাতি। সহজ-স্বাভাবিক প্রশংসা না পেয়ে পেয়ে সম্ভবত আমাদের মধ্যে স্তুতিকাতরতা কিংবা তোষামদপ্রিয়তা বেড়েছে। রবীন্দ্রনাথ সারা পৃথিবীর প্রশংসা পেয়েছেন। কিন্তু তবু তাকে দেখা গেছে বাঙালির প্রশংসার কাঙাল হয়ে থাকতে। দেশবাসীর অবজ্ঞা তাঁকে বলতে বাধ্য করেছিলো : “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী/ রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।” ‘অলীক ও কুনাট্য রঙে’ মজে থাকা রাঢ় ও বঙ্গের লোকদের দেখে মহাকবি মধুসূদনেরও প্রাণে সইতো না। ‘পরশ্রীকাতরতা’ শব্দটি সম্ভবত বাংলাভাষার একান্ত নিজস্ব। এই ধরাধামের অন্যান্য অঞ্চলে এর প্রয়োগক্ষেত্র যে নেই তা হয়তো বলা যাবে না, তবে তারা যে বঙ্গভূমির মতো ঊর্বর পরশ্রীকাতরতা উত্পাদনকারী অঞ্চল নয়, তা বাজি ধরেই বলা যায়। বাঁকা চলন খোঁজার এই বিদূষণ প্রবণতা এই পরশ্রীকাতর মানুষের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। এই বিদূষণ ক্রীড়া আবার সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় আমাদের রাজনীতির মাঠে। আমাদের বর্তমান রাজনীতির প্রধান প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে প্রতিপক্ষের মুন্ডুপাত। এই মুন্ডুপাত প্রক্রিয়া আবার সত্যাসত্য, ভালোমন্দ, কিংবা ন্যায়-অন্যায় বোধ-বিবেচনা দ্বারা পরিচালিত নয়। এর পেছনে কাজ করে কেবলই বিরাগ। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুরাগ আর বিরাগের লীলাখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর মাত্রা আবার অনেক সময় কাণ্ডজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে। পক্ষ যদি বলে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়, প্রতিপক্ষ তা অপ্রমাণের জন্যে লবিষ্ট পর্যন্ত নিয়োগ করবে। এই বিদূষণ চর্চায় যারা যতো বেশি দক্ষ ও সক্রিয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাদের মূল্যায়নই ততো বেশি। পক্ষশক্তিকে স্তবাঘাতে আকাশে তোলা এবং প্রতিপক্ষকে নিন্দার কাঁটায় জর্জরিত করাই সম্ভবত বর্তমান রাজনৈতিক অনুশীলনে সাফল্যের মাপকাঠি। হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতে (PCA) সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। শক্তিধর প্রতিবেশীর সাথে তিন দশকের দীর্ঘ বিরোধের একটি আইনী রফা হওয়া এবং নির্ধারিত সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্জনকে অধুনা-বিলুপ্ত তালপট্টি হারানোর বেদনা দিয়ে ম্লান করার চেষ্টা প্রতিপক্ষ বিদূষণের রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়। ভারত বাংলাদেশের ভেতরে নিষ্পত্তিকৃত এই উইন-উইন সেটেলমেন্টের ভেতরে যারা পরাজয়ের নিশানা খুঁজছেন, তারা সালিশি আদালত এবং ফৌজদারি আদালতের ভেতরকার তফাত্ বোঝেন না। বাদী-বিবাদীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ মূলত দেশীয় ক্রিমিনাল কিংবা সিভিল কোর্টের কাজ। এতে একপক্ষ জেতে, অপরপক্ষ হারে। কিন্তু লিটোরাল (littoral) রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নিয়ে এরকম হারজিতের বিচারকার্য হলে, সে রায় বাস্তবায়ন কতোটুকু কার্যকর করা যেতো, তা অবশ্যই বিবেচ্য। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় আইনী চর্চা বিধায় এখানে মধ্যস্থতামূলক নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গুরুত্ব পেয়েছে, হারজিতের চ্যালেঞ্জ নয়। ধরা যাক, ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের দাবিকৃত তালপট্টিসহ পুরো এলাকাই বাংলাদেশ পেলো, সেই কাগুজে প্রাপ্তি দেখিয়ে তার পূর্ণ দখল নেয়া কি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হতো। তার চাইতে উভয় রাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে উভয়ের প্রস্তাবিত সমদূরত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ভাগাভাগি করা কি বেশি লাভজনক হয় নাই? এ ধরনের নিষ্পত্তিমূলক সমুদ্রসীমা বণ্টন সারা বিশ্বেই হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ আমেরিকায় পেরু ও চিলির মধ্যে একইভাবে স্থায়ী সালিশি আদালতের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। উভয় দেশই তা সানন্দে মেনে নিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেখানে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মায়ানমার এবং ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে আমাদের স্বপ্নের মহীসোপান অধরাই থেকে যেতো। এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন নিষ্ফলা বিরান জলাধারই থেকে যেতো, আর টেরিটোরিকল সমুদ্র হতো গলার কাঁটা। আজ UNCLOS-এর সৌজন্যে PCA-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত ও মায়ানমারের দাবিকৃত সাগর এলাকায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার টেরিটোরিকল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল বিস্তৃত মহীসোপানের একচ্ছত্র আইনী অধিকার পেয়েছে। এর চেয়ে বেশি কি পেলে আরো ভালো হতো সে বিতর্কে না জড়িয়ে দল-মত নির্বিশেষে এই সুবৃহত্ সমুদ্র-সম্পদ কি করে সর্বাত্মকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। তেল-গ্যাস উত্তোলন, গভীর সমুদ্রে মত্স্য শিকার, বিবিধ প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ জলসম্পদ আহরণ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয়ে সফল হওয়ার জন্যে দক্ষ জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নিমিত্ত সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সেদিকে পা না বাড়িয়ে ছিদ্রান্বেষণে সময় কাটানো— কোন রাজনীতি তা বোঝা কঠিন নয়। বিএনপি সাম্প্রতিক সমুদ্র ভাগে সন্তুষ্ট নয়। তালপট্টি তাদের চাইই। হাতের এক পাখির চাইতে ঝোপের দুই পাখিই তাদের কাছে অধিক প্রার্থনীয়। তারা সন্তুষ্ট নয় হাসিনা সরকারের এই নিষ্পত্তি আয়োজনে। শুধু সমুদ্রসীমানায়ই বা কেনো, এ সরকারের কিছুই তাদের পছন্দ নয়। এদের রাজনৈতিক যাত্রা নাস্তি করার জন্যে বিএনপি নিজের নাক পর্যন্ত কেটে ফেলেছে। জামায়াতী জিহাদী-জঙ্গিদের সাথে তাল মিলিয়ে সহিংসতার রাজনীতি বেছে নিয়ে বিএনপি অবশ্যই তাদের নাক কেটেছে। বিএনপি নেত্রী আবারো হাঁক দিচ্ছেন ঈদের পর নতুন উদ্যমে হাসিনা হঠাও আন্দোলন শুরু করবেন। কারণ হাসিনার ‘চলন বাঁকা’। হাসিনার সরকার যদি পুরো বঙ্গোপসাগর বিজয় করে এনে তাকে দেন, সম্ভবত তারপরও তিনি ভ্রুকুটি করে বলবেন: ‘এটা বাড়াবাড়ি!’ অতএব, আন্দোলনের বিকল্প নেই। খালেদার ঈদোত্তর আন্দোলন অভিলাষের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক বাস্তবতার কতোটুকু মিল আছে— সে প্রশ্ন তো থাকছেই। অনেকে কিংবদন্তির মিথ্যেবাদী রাখাল বালকের সাথে তার রাজনীতির মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন। বাঘ এসেছে, বাঘ এসেছে বলে বারবার লোক জড়ো করে তিনি অনেকখানি হার্স্যাষ্পদ হয়েছেন। তাই তার এবারের আহ্বানে কেমন সাড়া মেলে তা প্রমাণ সাপেক্ষ। তবে বিএনপির রাজনীতির মাঠচিত্র হতাশাজনক। পৌনপুনিক ব্যর্থতা, স্থির আদর্শ নির্ধারণে দোলাচল, মুক্তিযুদ্ধ পক্ষীয় নেতৃবৃন্দের অবমূল্যায়ন, সর্বোপরি তারেক জিয়ার হঠকারিতা বিএনপির অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এখন তাদের রাজনীতি প্রতিপক্ষ বিদূষণ ও বাকসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার যে উপায় নেই তা নয়। শুধু বিএনপিই বা কেনো সুষ্ঠু ধারার গঠনমূলক রাজনীতি, দেশাত্মবোধক রাজনৈতিক চর্চা, মানুষ সকল দলের কাছেই প্রত্যাশা করে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন দরকার। লেখক: অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ।