গাজায় রক্ত সিডনির চোখে জল

আধিপত্যবাদ জুলুমবাজ একনায়কতন্ত্র বর্বরতা এগুলো বহুল ব্যবহারে এখন জীর্ণ প্রায়। দেখতে দেখতে বা শুনতে শুনতে ক্লান্ত মানুষের মনে তেমন কোন প্রভাব ফেলে বলেও মনে হয় না। আমরা সভ্যতার কথা বলি, আধুনিকতার নামে গর্ব করি; কিন্তু ভুলে যাই মানুষ যত আধুনিক আর সভ্যতার ছোঁয়ায় যন্ত্রপ্রবণ হয়ে উঠেছে, ততই তার মানবিকতা ও নৈতিকতা অদৃশ্য হতে শুরু করেছে। এমন অবস্থা এখন আর একটা দুইটা লাশ বা কয়েকটা লাশও শিহরণ জাগায় না। বুকের পাঁজর কাঁপিয়ে দেয় না প্যাসেঞ্জার ভর্তি উড়োজাহাজের উধাও হবার ঘটনা। দুইশ না আড়াইশ সেটা বড় ব্যাপার নয়, এক উড়োজাহাজ ভর্তি মানুষ এবং প্লেনটি কোথায় গেল কেউই আর খবর রাখে না। কয়েকদিন বড় জোর এক মাস তারপর আবার স্বাভাবিক সব কিছু, যাদের গেল তারা ছাড়া বাকীদের মাথাব্যথা নেই। ইদানীং আবার আরেক রোগ শুরু হয়েছে। সংক্রামক ও জটিল। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী কে অসুস্থ বা কে সুস্থ সেটা বড় কথা নয়, তার চেয়ে জরুরি ফেইসবুকে মানুষকে জানানো। একদিন দেখি একজন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন জরুরি ওষুধ ও অক্সিজেন আনতে যাচ্ছি—- অমুক প্রায় মৃত্যুশয্যায়, প্রে ফর মি। মনে মনে বলি ওরে অনু: স্বয়ং আল্লাহও তো তোর জন্য দোয়া করবেন না। তুই মুমূর্ষু রোগীর জন্য ওষুধ আনতে যাচ্ছিস না ফেইসবুকিং করছিস? কার যেন মা মারা যাবার পর শোকের বদলে ছবি পোস্ট করা দেখে চমকে উঠেছিলাম, পরিণত বয়সে বিগত মায়ের জন্য শোক না বায়বীয় বন্ধুদের দৃষ্টি আকর্ষণ? কোনটা জরুরি বুঝতে পারছিলাম না। এতো গেল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাপার, সামষ্টিকভাবে এই প্রবণতা জাতীয়ভাবে এই অপ-উদ্ভাসও এখন চোখে পড়ার মতো। বলছিলাম সে অপরাধ প্রবণতাও এখন প্রচার আর অতি আবেগ বন্দী। ইসরায়েল কেমন রাষ্ট্র বা কি তার অতীত সে কথা আমাদের অজানা নয়। কার মদদে কোন শক্তিতে তার আস্ফাালন তাও আমরা জানি; কিন্তু অতি আবেগের কারণে ভুলে যাই পৃথিবীতে অন্তত দুইটা জাতি মেধা ও শ্রম দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে তারপর যার যার পথ বেছে নিয়েছে। এদের একটি শ্রীংলকার কাছ থেকে স্বাধীনতার নামে পৃথক হবার চেষ্টা করেও পারেনি। ভারতের মদদ, মদদ প্রত্যাহার সমর্থন অসমর্থন গেরিলা ও কৌশলের ওঠা নামায় এখন পর্যুদস্ত ও বিধস্ত। তামিলদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব চাইবে না এটা বোঝা কঠিন। আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে এরা জাঁকিয়ে বসে আছে, প্রায় প্রত্যেকটি তামিলই কোন না কোনভাবে পরাজিত টাইগারের সাথে ছিলেন, কেউ অর্থ দিয়ে কেউ গায়ে খেটে কেউ লবিং খাটিয়ে সাহায্য করতেন, সিডনিতে নিহত দিরুপিল্লাই প্রভাকরণের পঞ্চাশতম জন্মদিন পালিত হয়েছিল সাড়ম্বরে। অস্ট্রেলিয়ান সরকার ও কর্তৃপক্ষ অনেক চেষ্টার পর তামিলদের অস্ত্র প্রেরণ বন্ধ করেছিল। এটার মানে এই নয় যে, তারা খারাপ মানুষ। নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত তামিলরা যোগ্য ও শিক্ষিত। এবং সেটাই তাদের পুঁজি। আরেকটি জাতি হলো ইহুদি। হিটলারের নির্যাতন বা অতীতের শিক্ষা যে কারণেই হোক ইহুদিরাও সংঘবদ্ধ, তারা আমেরিকার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। ইহুদিদের আন্তর্জাতিক লবিং-এর পাশাপাশি উগ্র, মুসলিম বিরোধী খৃস্টানরাও ইহুদিদের সমর্থক, আমেরিকা থেকে প্রেরিত সাহায্য বা সমর্থনে তাদের অংশও ব্যাপক। একইভাবে আমি প্রচুর হিন্দুকেও দেখি যারা গাজার সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে হয় শীতল নয়তো পরোক্ষভাবে সমর্থক, এর কারণ হিসাবে নিজ দেশে নির্যাতন বা হয়রানির দোহাই দিলেও তা আসলে ধোপে টেকে না। গাজার বিষয়টি মর্মান্তিক। হামাস কেমন দল হামাসের কি ভূমিকা সেই পর্যালোচনা রাজনীতির দায়িত্ব। ইয়াসির আরাফাতের শান্তি প্রক্রিয়া বিনষ্ট করে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদের সৃষ্ট দলগুলোর কারণে নিরীহ ফিলিস্তিনীদের রক্তঝরানো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপরদিকে বরাবরের মতো রাজা-বাদশারা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েই খালাস, বলিহারী তালেবানীদেরও। আফগানিস্তানে আমেরিকার বিরুদ্ধে জেহাদকারীরা মার্কিনী টাকা, অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিরিয়ায় লড়াই করছে। তখন তাদের জেহাদী জোস থাকে না। রাজনীতির এই জটিল বা কুটিল দ্বন্দ্ব বুঝি না। আমরা চাই শান্তি, নিরীহ নিষ্পাপ শিশুর গলিত রক্তাক্ত লাশে আমাদের চোখে আগুন ঝরে পড়ে। আমরা অসহায় শিশুর মুখে বন্দুকের নল তাক করা দেখে ঘুমোতে পারি না। মুসলমান না অমুসলমান তার চেয়ে বড় কথা মানুষের জীবন। ধর্মের জন্য কোন একটি সম্প্রদায় বা জাতিকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার পরও জতিসংঘ বা অন্যান্য গোষ্ঠীর তত্পরতা নাই। অসহায়ের মতো কাগুজে বিবৃতি মিডিয়ায় মুখ দেখানো এর সমাধান নয়। সমাধান নয় বৈঠক বা আলোচনা। যারা পারেন তাদের দায়িত্ব এই হত্যাকাণ্ডের অবসান নিশ্চিত করা। না করলে একদিন তাদের বেলায়ও ঠিক একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সেটা অতীতের দিকে তাকালেই প্রমাণিত হয়ে পড়বে, তারপরও কেউ কথা শুনছে না, দেখেও দেখছে না। রোজা, রমাদানের এই মাসে নিরীহ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় আক্রোশ ও সন্ত্রাস দেখেও গণতন্ত্রের প্রভুরা কিছু বলেন না, অবিচলিত নাগরিকতার নামই তবে সভ্যতা? সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, নৈতিকতা ও মানবিকতার লাশের ওপর দাঁড়ানো এই আগ্রাসী মনোভাবের পুঁজিবাদ অথবা সস্ত্রাসকে থু থু দেই। পৃথিবী যদি সব মানুষের হয় তাহলে গাজাতেও শান্তি চাই। এটাই শেষ কথা। সিডনি থেকে