দক্ষিণাঞ্চলে অস্বাভাবিক জোয়ারের ভয়াবহতা

প্রকৃতির প্রতিকূলতার সহিত আজন্ম লড়াই করিয়া বাংলাদেশের উপকূলবর্তী মানুষদের টিকিয়া থাকিতে হয়। প্রকৃতির শক্তির সহিত কাহারও তুলনা চলে না বটে। কিন্তু সেই শক্তির সহিত নিত্য বোঝাপড়ায় উপকূলের মানুষ সহাবস্থানের ন্যূনতম পরিবেশ তৈরি করিয়াই টিকিয়া রহিয়াছে যুগের পর যুগ। তবে সামপ্রতিক সময়ে জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী স্থলভাগ যেন যখন-তখন নিকটস্থ নদী বা সমুদ্রের অংশ হইয়া যাইতেছে। গত ১২ জুলাই দিবাগত রাত্রি ছিল চন্দ্রকলার পূর্ণরূপ। বত্সরের নির্দিষ্ট কিছু সময় পৃথিবীর ব্যবধানে চাঁদ তুলনামূলক নিকটবর্তী থাকে, যাহাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘সুপারমুন’। সেই সময় পৃথিবীতে চাঁদের আকর্ষণও অধিক তীব্র হয়। গত রবিবার ছিল এমনই একটি দিন। বিগত কয়েক দশক বিশ্বের পরিবর্তিত আবহাওয়া কতটা খামখেয়ালিপূর্ণ রূপ ধারণ করিতে পারে, তাহার চিত্র দেখা গেল এইবারের জোয়ারে। সব মিলাইয়া গত রবিবার স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় দুই হইতে তিন ফুট উচ্চতায় জোয়ার প্রবাহিত হয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে। দক্ষিণাঞ্চলের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তাহারা এইবারের জোয়ারের মতো অস্বাভাবিকতা নিকট অতীতে আর কখনও দেখেন নাই। জোয়ারের পানিতে বাগেরহাটের মংলা ও মোড়েলগঞ্জ পৌর এলাকা ছাড়াও শরণখোলা, পটুয়াখালী শহরের নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকা, কক্সবাজারের পেকুয়া এবং ঝালকাঠি পৌর এলাকা ও গ্রামাঞ্চল প্লাবিত হয়। ভরাবর্ষা নিম্নচাপের বলয়ের মধ্যে থাকিয়া সাগরের উত্তাল-উচ্ছ্বাস আরও বাড়াইয়া দেয়। ইহাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি কী পরিমাণ হইয়াছে এবং ভবিষ্যতে হইবে—তাহা নির্ণয়ের পূর্বে মানুষের টিকিয়া থাকিবার প্রশ্নটিই বড় হইয়া দেখা দিয়াছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌরশহরের সন্নিহিত এলাকা নিত্যদিন খালের জোয়ারে প্লাবিত হয়। এইবারের অস্বাভাবিক জোয়ার যেন নদীকেই গৃহপ্রাঙ্গণে আমন্ত্রণ জানায়। জোয়ারের পানি উপচাইয়া শত-সহস্র পরিবারে চরম দুর্ভোগ নামিয়া আসার পাশাপাশি অভূতপূর্ব সমস্যায় আকীর্ণ হইতেছে এতদাঞ্চল। এই অঞ্চলের অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ও অন্যান্য কারণে পূর্বেই সঙ্কুচিত হইয়াছিল এই এলাকার খাল। স্বাভাবিক জোয়ারের পানি অপসারণেও বাধাগ্রস্ত হইয়া প্রায়শই প্লাবনের সৃষ্টি হয় এই শহরে। অর্থাত্ সমস্যাটি যুগপত্ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট। প্রকৃতি যেখানে অধিক বিরূপ, সেখানে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলাফল ভালো হয় না কখনও। শুধু পিরোজপুরের কিছু অঞ্চল নহে, এই পরিণতির শিকার বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলবর্তী অঞ্চল। এইবারের পূর্ণিমার প্রভাবে মেঘনার অতি জোয়ারে ভোলা শহররক্ষা বাঁধ নাছির মাঝি পয়েন্ট দিয়া ভাঙিয়া গিয়াছে। বাঁধে ফাটল দেখা দিলেও ভাঙিবার পূর্বে তাহা মেরামতে ত্বরিত্ ব্যবস্থা লইবার ক্ষমতা সম্ভবত ওই এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নাই। অন্যদিকে বরগুনা শহররক্ষা বাঁধের স্লুইসগেট উপচাইয়া পানি ঢুকিয়া পড়িয়াছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর। সেখানকার রাস্তাঘাট হাঁটু পানির নীচে। ফি-বত্সর বার বার পানিতে ডুবিয়া যাওয়া যেন এসব অঞ্চলের সড়কসমূহের ভবিতব্য হইয়া উঠিয়াছে। আর রাস্তার বিটুমিন নষ্ট হইয়া গেলে তাহার নীচের মাটি গলিয়া বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করিতে বিলম্ব করে না। মুশকিলের কথা হইল, উপকূলবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের খালসমূহ ভরাট হইয়া গিয়াছে। কোথাও কোথাও স্থায়ী বাঁধ দেওয়ার ফলে আবাদযোগ্য মাঠসমূহে সৃষ্টি হইয়াছ স্থায়ী জলাবদ্ধতা। কোথাও কোথাও কৃষকদের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরি করিবার উদ্যোগ থাকিলেও এইবারের অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে সেই জমির আমনের বীজতলা ভাসিয়া গিয়াছে। পচনের আশঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে কচি ধানের চারায়। পূর্ণিমার চাঁদ কবির কল্পনায় অদ্ভূত সৌন্দর্য সৃষ্টি করিলেও ক্ষুধার রাজ্যে তাহা ঝলসানো রুটির রূপও পরিগ্রহ করে। এইবার এই বিরাটাকার পূর্ণিমার (সুপারমুন) দোসর হইয়াছে বিশ্বজুড়ে পরিবর্তিত বিরূপ জলবায়ু। অতঃপর অস্বাভাবিক জোয়ার ভাসাইয়া দিয়াছে জলভাগের নিকটবর্তী স্থলভাগ। প্রকৃতির এই চরম রূপ অতীতে তুলনামূলক অনেক কম দেখা গেলেও এখন হইতে তাহার রুদ্ররূপ বারংবার দেখা দিতে পারে। সুতরাং যথাযথ গবেষণাসাপেক্ষে সঠিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের সময় এখনই। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঝড়ঝঞ্ঝা ও ভয়াবহ বিরূপতার মধ্য দিয়াই বড় হইয়াছে। এই সাহসী মানুষের পাশে সঠিক পরিকল্পনায় সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দিলে তাহাদের জীবনকে অনেকখানি সহজ ও নিরাপদ করা সম্ভব।