সংযম বনাম অপচয়
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৪, ২০:৪০
পবিত্র রমজান মাসকে বলা হয় সংযমের মাস। খোদাভীতি অর্জনের মাস। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইহাকে নিরঙ্কুশ সংযমের মাস বলা যায় কিনা তাহাই বড় প্রশ্ন। এখানে বরং ইফতারের আয়োজন হইতে শুরু করিয়া ঈদের কেনাকাটা পর্যন্ত কোন কোন ক্ষেত্রে সংযম বা ত্যাগের অভাব আছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। অনেকে আজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে ভোগ-বিলাসিতার বস্তুতে পরিণত করিতেছেন এমন অভিযোগও নূতন নহে। অথচ রমজান মাসে হওয়ার কথা ছিল তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগী ও দান-খয়রাত করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ।
প্রতি বত্সর ঈদ আসে। আসে উত্সব। উত্সব উপলক্ষে ভাল ভাল পোশাক-আশাক কেনা হইবে, আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেওয়া হইবে, ইহাই তো স্বাভাবিক। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ উত্সব উপলক্ষে বেশি কেনাকাটা করিয়া থাকেন। পোশাকের পাশাপাশি তাহারা কেনেন তৈজসপত্র ও ঘরের আসবাবপত্র। কেননা এ সময় অনেকেরই হাতে বাড়তি টাকা আসে। যাহারা চাকুরী করেন, তাহারা বোনাস পাইয়া থাকেন। তাই সীমিত আয় ও সাধ্যের মধ্যে বাজার-হাট করেন তাহারা। ইহাতে দোষের কিছু নাই। ইহা জীবন-যাপনেরই সাধারণ অনুষঙ্গ। কিন্তু ইহার বাহিরে আমাদের সমাজে একশ্রেণির লোক তৈরি হইয়াছে, যাহারা ফ্যাশন ও বিলাসিতার নামে অতিরিক্ত খরচ করিতে আনন্দ পান। অনেক সময় ইহার মূল উদ্দেশ্যই হইয়া দাঁড়ায় অহমিকা ও টাকার গরম দেখানো। ঈদ উপলক্ষেও তাহারা লোকদেখানো এই পথ বাছিয়া নিতে কসুর করেন না। তাহারাই এই সময় বাছ-বিচার না করিয়া দামি কিছু পাইলেই হুমড়ি খাইয়া পড়েন। ঈদ উপলক্ষে এক হইতে দেড় লক্ষ কিংবা তাহারও বেশি টাকার শাড়ি বিক্রয় হয়। এরকম যে শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই হয়, তাহা নহে। আজকাল বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলিতেও নামি-দামি পণ্য বিক্রয় হয়। বিক্রয় যখন হয়, তখন ইহার ক্রেতাও যে আছে, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না। অনেকে মনে করেন, ইহার পশ্চাতে রেমিট্যান্সের সামান্য হইলেও একটা প্রভাব আছে। আবার কেহ কেহ মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মৌলিক চরিত্র পুঁজিবাদী বা মার্কসবাদী নহে, ইহার সঙ্গে লুম্পেন অর্থনীতির মিশ্রণ রহিয়াছে। ঘুষখোর, সুদখোর, ফড়িয়াবাজ, ধান্দাবাজ, শেয়ারবাজার লুণ্ঠনকারী, হায় হায় কোম্পানির কারবারী, দুর্নীতিবাজ প্রভৃতি লোকের সমন্বয়েই এই অর্থনীতির জন্ম। তাহারা তাহাদের অর্জিত অর্থ খরচের এক জায়গা খুঁজিয়া পায় এই ঈদের বাজারে। তাহারা সংখ্যালঘু হইলেও তাহাদের মনোভাব-মনোবৃত্তি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত একশ্রেণির লোককেও প্ররোচিত করিতেছে ও নাড়া দিতেছে। সামর্থ্যের বাহিরে গিয়াও তাহারা খরচ করিতে চাহেন। তখন দেখা দেয় বিপত্তি। দেখা দেয় পারিবারিক বাজেট ঘাটতি। ভাটা পড়ে আনন্দে।
বর্তমানে ঈদবাজারের ফ্যাশন জগত কাঁপাইতেছে দেশি নহে, বরং বিদেশি বা বিদেশি নামের পোশাক। চমত্কার এক ফাঁদই বটে। বলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র আর প্রতিবেশী দেশটির জনপ্রিয় সিরিয়ালগুলোর নামেই ফ্যাশনের নামকরণ করা হইয়াছে। আবার কয়েক বত্সর আগের ক্রেজ ফ্যাশনগুলিরও সরবরাহ আছে। ইহার বাহিরেও আছে এক্সক্লুসিভ ও গর্জিয়াস পোশাক। পোশাকের ব্যবহার কীজন্য তাহা এক্ষেত্রে অনেক সময় গৌণ হইয়া পড়ে। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলি সবসময় পরা যায় না। এভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা ও বাড়াবাড়ি কোনভাবেই কাম্য নহে। আজকাল এ ব্যাপারে একরকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হইয়াছে। এই অসুস্থতা সমাজকেও সংক্রমিত করিতেছে। ফলে বেশি সমস্যা ও অশান্তি সৃষ্টি হইতেছে মধ্যবিত্ত পরিবারে। সারা বত্সর ধরিয়াই ইহা চলে, তবে রমজান মাসে ইহা অধিক ভাবনায় ফেলিয়া দেয় বৈকি। অথচ আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআন শরীফে বলিয়াছেন যে, কোন অবস্থাতেই অপচয় করো না। কেননা ‘অপচায়কারীরা শয়তানের ভাই’ (১৭ঃ২৭)। আবার অন্যত্র বলা হইয়াছে, ‘খাও ও পান করো। তবে সীমা লঙ্ঘন করো না (৭ঃ৩১)।’
আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার, রোজার মাস আত্মশুদ্ধির মাস। সুতরাং এখানে কোন ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি প্রদর্শনের সুযোগ নাই। অপচয় না করিয়া বস্ত্রহীনকে বস্ত্র প্রদান এবং দিনমজুর ও নিঃস্ব-রিক্ত মানুষদের ইফতার করানোর মধ্যে সওয়াবের পাশাপাশি যে আত্মতৃপ্তি আছে তাহার মূল্য অপরিসীম। রমজান মাসে দীন-দুঃখী ও গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সম্পদের সদ্ব্যবহার ও সংযমের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে পারি আমরা। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।