[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
ফিলিস্তিনীদের রক্তের কি মূল্য নেই
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৪, ২০:৪১
পৃথিবীর সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস কি? এ কথা যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি বলবো, ‘দ্য ব্লাড অব প্যালেস্টাইন’। ওদের রক্তের কোন মূল্য নেই। যদি কোন নতুন অস্ত্র আবিষ্কার হয় তাহলে তা পরীক্ষা করার জন্য গাজা উপত্যকার চেয়ে উপযুক্ত জায়গা বুঝি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। হতভাগ্য ফিলিস্তিনীদের পাশে কেউ নেই। ওদের প্রতি খানিকটা সহানুভূতিশীল মিসর আজ লণ্ডভণ্ড। পশ্চাত্যের কূটখেলায় মিসর আজ পরাস্ত। পশ্চিমারা হামিদ কারজাইয়ের মতো এক সিসিকে আবিষ্কার করেছে সেখানে। তারপর সমস্ত নিয়মনীতি, গণতন্ত্র আর আইনকে থোড়াই কেয়ার করে মসনদে বসিয়েছে মিসরের ঐ মীর জাফরকে। ইসরাইলী ট্যাংক আর বোমারু বিমানগুলোতে মরিচা ধরার আগে সেগুলো ঝালিয়ে নেয়া দরকার। শুরু হয়েছে অস্ত্র ঝালিয়ে নেয়া। খুশী হয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও। বিপন্ন মানবতা। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে আছে বিশ্বের শক্তিমানেরা। সেকথা মাহমুদ আব্বাস ভালো করেই জানেন। তাইতো তার যতো রাগ ঐ হামাসের উপরই। তিনি বলছেন, ‘কি দরকার ছিলো ইসরাইলে রকেট হামলা করার? সেগুলো হয়তো বনে জঙ্গলে গিয়ে পড়ছে। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে রোজাদার নারী আর ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুগুলোকে।’ মাহমুদ আব্বাস এটাও জানেন যে, তিনি এ কথাগুলো বলে আত্মতুষ্টি করছেন মাত্র। ইসরাইল হামলা চালাতোই। পিএলও-হামাস ঐক্য কখনই মেনে নেবে না ইসরাইল। মেনে নেবে না পশ্চিমারাও। কোথায় গেল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র? সে প্রশ্নের উত্তর ফিলিস্তিনীরা আর খোঁজে না। ২০০৫ সালের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়া হয়েছিলো অবৈধ ইসরাইলী রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, দুর্বল আর ভঙ্গুর করে দেয়া হলো পিএলও’কে। ফিলিস্তিনীরা হারালো তাদের সবচেয়ে বড় অভিভাবক ইয়াসির আরাফাতকে। বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হলো তাকে। ফিলিস্তিনীদের আজ আর কোন নেতা নেই। আহমেদ ইয়াসিন, নেই ফুয়াদ নাসের, কেউ নেই আজ। তারা সবাই ইসরাইলী বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার। মাহমুদ আব্বাস মধ্যপন্থি হওয়ায় কোন রকমে তাল মিলিয়ে চলছেন পশ্চিমাদের সাথে।
২০০৫ পেরিয়ে আজ ২০১৪। ফিলিস্তিনীরা স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা ভুলতে বসেছে। নিজভূমে পরবাসী হয়ে পশ্চিমতীর আর গাজা উপত্যকায় গৃহপালিত প্রাণীর মতো কোনরকমে ঠাসাঠাসি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা। সেখানেও চতুর্দিকে অবৈধ বসতি নির্মাণ করে ফিলিস্তিনীদের ঘিরে ফেলেছে ইসরাইল। তবুও একটু শান্তির অপেক্ষায়, প্রতিদিন একটা শান্ত সূর্যোদয় আর একটি নীরব সন্ধ্যার অপেক্ষায় দিন কাটে ওদের। কিন্তু সে উপায়ও নেই ওদের। ইসরাইলী ট্যাংক গর্জে উঠেছে আবার। জাতিসংঘের সমস্ত আইন লঙ্ঘন করে বেসামরিক এলাকাগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে ইসরাইলী বোমারু বিমানগুলো। ধ্বংসের অবৈধ উল্লাসে ফেটে পড়ছে নেতানিয়াহু। নিষ্পাপ শিশুর রক্তে প্যালেস্টাইনের পবিত্রভূমি আজ রঞ্জিত। ফিলিস্তিনী শিশুর কান্না কিং আবদু্ল্লাহর রাজপ্রাসাদে পৌঁছে না। কান্নাগুলো হারিয়ে যায় ট্যাংকের গর্জনে। আর কত শত শিশুর মৃত্যুর পর হাজার মাইল দূরের হোয়াইট হাউস ওদের কান্না শুনতে পাবে তা আমাদের জানা নেই। ফিলিস্তিনীরা এখন কি করবে? ওরা কি জাতিসংঘের দ্বারস্থ হবে? ছোট ছোট শিশুর লাশ ছড়িয়ে আছে, পাশে পড়ে আছে ইফতারীর বাটিগুলো আর ছড়ানো খেজুর। ওর মায়ের নিথর দেহটা পড়ে আছে রক্তমাখা মেঝেতে, হাতে ছোট্ট একটা চামচ। হয়তো একটু পরেই শিশুসন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতো মা। এমন হূদয় কাঁপানো ছবি দেখে ফিলিস্তিনীরা আর কাঁদে না। ওদের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনীরা কাঁদতে ভুলে গেছে। ছেষট্টি বছর কাঁদতে কাঁদতে ওদের অশ্রু শুকিয়ে গেছে।
পশ্চিমারা কখনই কথা রাখেনি আরবদের সাথে। যদি ফিরে যাই সেই ১৯১১ সালে। তখনও আরবের বিরাট এলাকা ছিলো তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ১৯১৪ তে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধ চললো টানা চার বছর। সেই যুদ্ধে জার্মানী পরাজিত হলো বৃটিশ ও তার মিত্রদের কাছে। কিন্তু বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভীষণ ক্ষতি হলো যার কারণ ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্য। অটোম্যানরা ছিলো জার্মানীর মিত্র। বৃটেনের প্রয়োজন ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে দেয়ার। আর আরবদের প্রয়োজন ছিলো স্বাধীনতা। ১৯১৫ থেকে ১৯১৬, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় এক বছর আলোচনা হলো তত্কালীন পবিত্র মক্কা নগরীর গভর্নর(শরীফ) হুসেইন বিন আলী এবং মিসরে নিযুক্ত বৃটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরী ম্যাকমোহনের সঙ্গে। স্বাধীনতার দাবিতে অটোম্যানদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তখন তুঙ্গে। এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে, বৃটেনের পরিস্থিতি ভালো নয়। যুদ্ধে আরবদের পাশে চায় বৃটিশ অ্যালায়েন্স। হুসেইন বিন আলী এবং স্যার হেনরী ম্যাকমোহনের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হলো, আরবরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটেনদের পক্ষে থাকবে আর বিনিময়ে আরব স্বাধীনতা মেনে নেবে বৃটেন ও তার মিত্র পশ্চিমা শক্তি। ম্যাকমোহন-হোসেইন আলোচনায় আরব ম্যাপও প্রতিষ্ঠিত হলো, তৈরি হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা। ২৪ অক্টোবর, ১৯১৫ স্যার ম্যাকমোহন হুসেইনের কাছে চিঠিতে স্বাধীন আরব এবং প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেনঃ
“...Great Britain is free to act without detriment to interests of her ally France, I am empowered in the name of the Government of Great Britain to give the following assurance and make the following reply to your letter: Subject to the above modifications, Great Britain is prepared to recognize and support the independence of the Arabs within the territories in the limits and boundaries proposed by the Sherif of Mecca.”
সিরিয়ার দামেস্ক, আলেপ্পো, হোমস এর কিছু এলাকা ছাড়া পুরো আরব, প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা মেনে নিয়েছিলো ম্যাকমোহন।
স্বাধীনতার আনন্দে বিভোর আরবরা ম্যাকমোহনের কথামতো কাজ করলো। প্রায় ৭০,০০০ হাজার আরব যোদ্ধা বৃটেনের পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিলো । অনেকে যুদ্ধে নিহত হলো। আরব বিদ্রোহের কারণে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন হলো আর জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে গেল বৃটেন। কিন্তু পশ্চিমাদের কূটকৌশল বুঝতে পারলো না আরবরা। ম্যাকমোহন যখন আরব স্বাধীনতার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন হুসেইনের সঙ্গে ঠিক তখনই বৃটেন, ফ্রান্স আর রাশিয়া একটি গোপন চুক্তি করলো যা Sykes–Picot Agreement নামে কুখ্যাত। সেই গোপন চুক্তিতে তারা আরবকে ভাগ করে সেখানে ইহুদী বসতি স্থাপনের মহাপরিকল্পনা করেছিলো যেটা ছিলো আরবদের সাথে বড় রকমের বিশ্বাসঘাতকতা। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর সেই গোপন চুক্তির কথাটি ফাঁস হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে স্যার হেনরী ম্যাকমোহন পদত্যাগ করেন। কিন্তু বৃটিশরা আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের ইহুদীদের প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপনের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে। ২ নভেম্বর ১৯১৭ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর বৃটেনের ইহুদী নেতা ব্যারন রোডশীল্ডকে লেখেনঃ
“His Majesty’s government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country.”
তার এই ঘোষণা ছিলো ম্যাকমোহন-হুসেইন আলোচনার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ঘোষণা থেকেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, ইসরাইল রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্ব কখনই ছিলো না আরব ভূমিতে। এটা ছিলো গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের উপর চাপিয়ে দেয়া পশ্চিমা বাফার স্টেট।
পরবর্তীতে ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে স্যার মার্ক সিকস (Sykes) হুসেইনের কাছে এক পত্রে লিখেছিলেনঃ
“Since the Jewish opinion of the world is in favour of a return of Jews to Palestine and in as much as this opinion must remain a constant factor, and further as His Majesty’s Government view with favour the realisation of this aspiration, His Majesty’s Government are determined that insofar as is compatible with the freedom of the existing population both economic and political, no obstacle should be put in the way of the realisation of this ideal.”
অর্থাত্ Sykes–Picot Agreement এর সেই গোপন চুক্তির ভিত্তিতেই তিনি আরবের বুকে অবৈধ ইহুদী বসতি স্থাপনের অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বৃটেনের শাসকরা নিজেরাও আরব ভূমিতে ইহুদী রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবসম্মত মনে করতেন না। যে কারণে পরবর্তীতে বৃটেনের মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরো প্রধান কমান্ডার ডেভিড হোগার্থ লিখেছিলেনঃ
“Hussein would not accept an independent Jewish State in Palestine, nor was I instructed to warn him that such a state was contemplated by Great Britain.”
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, আরবের বুকে ইহুদী রাষ্ট্রের উদ্ভব কোন বৈপ্লবিক বা নৈতিকতার মানদণ্ডে হয়নি। এটা ছিলো গোপন ষড়যন্ত্রের একটি ফসল।
ষড়যন্ত্রের ওখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ১৯৪৮ সালে অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো ইসরাইল রাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ড থেকে বাস্তুহারা ইহুদীদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিলো পশ্চিমারা। ইউরোপের প্রচুর অনাবাদী জমি থাকা সত্ত্বেও ইহুদীদের পুনর্বাসনের জন্য তারা বেছে নিলো মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনীদের আবাসস্থলকে। সাত লক্ষ ফিলিস্তিনীকে বাস্তুহারা করে পশ্চিমারা শক্তি প্রয়োগে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করলো। অথচ যাদের রাষ্ট্র, যাদের জমি সেই ফিলিস্তিনীরাই রাষ্ট্র পেলো না। ১৯১৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত পশ্চিমাদের প্রত্যেকটি রেজুলেশন, চুক্তি, ঘোষণাতে স্বাধীন দুটি রাষ্ট্রের পাশাপাশি অবস্থানের কথা উল্লেখ থাকলেও পশ্চিমারা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করলো। ফিলিস্তিনীরা হলো বাস্তুহারা, ভিটেহারা। যে আরবরা ঔদার্য্য দেখালো, ইহুদীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘরে আশ্রয় দিলো, সেই মেহমানবেশী অসহায় ইহুদীরা ওদের বিতাড়িত করলো ঘর থেকে। সেই ১৯৪৮ সাল থেকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইয়াসির আরাফাত। কখনও ওয়াশিংটন, লন্ডন, এশিয়া, ইউরোপ আর কখনও ল্যাটিন আমেরিকা। কখনও জঙ্গল, কখনও গুহায় আবার কখনও ট্যাংকের গোলার সামনে। কত হাজার, কত লক্ষ ফিলিস্তিনী শিশু, নারী আর যুবকের রক্তে জর্ডান নদী রঞ্জিত হলো। তবু প্রতিষ্ঠিত হয়নি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। তবু আসেনি স্বাধীনতা। সত্যিই কি আসেনি? তবে কি বৃথা যাবে এত রক্ত, এত প্রাণ? এগুলো কি বৃথা যায় কখনও? ঐ হিব্রুদেরও তো লেগেছিলো ৪০০ বছর। চারশ বছর অপেক্ষা করার পর তবেই মিলেছিলো মুক্তি।
ফিলিস্তিনীদের বি-৫২ নেই, ট্যাংক নেই, নেই কোন মারণাস্ত্র। কিন্তু মহাকালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আছে ওদের। আর তা হলো, মানবতা। জানিনা কত বছর পরে, কত যুগ পরে, হয়তো সেদিন থাকবো না আমরা। কিন্তু মানবতার পথ ধরে একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বুক চিরে সূর্য উদয় হবে। এ এক ধ্রুব সত্য। সেই সূর্যোদয়ের সাথে সাথে অ্যাংলো-মার্কিন সাম্রাজ্যেরও পতন হবে। সেও এক ধ্রুব সত্য। সেদিন কি ফিলিস্তিনীদের মনে থাকবে একটি মানুষের কথা যে জলপাই গাছের ডাল বুকে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতো একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নেশায়। ইয়াসির আরাফাত, তোমাকে লাল সালাম।
লেখক :প্রাক্তন প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স, লন্ডন ইউনিভার্সিটি
ই-মেইলঃ sk_s_rana@yahoo.com