সীমান্ত পারাপারে বিড়ম্বনা

বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের বিভিন্ন চেকপোস্ট হয়ে বৈধ পথে প্রতিদিন পারাপার করেন অসংখ্য মানুষ, নারী ও পুরুষ। চিকিত্সা, পর্যটন, শিক্ষাসফর, আত্মীয় দর্শন এইরূপ নানান কারণে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবেশি ভারতে যান। আবার ওপার থেকেও মানুষ আসেন বাংলাদেশে। কিন্তু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এই যাতায়াতের যে যন্ত্রণা, সেটা ভোলার মত নয়, বলেও শেষ করা যায় না। আমরাও গিয়েছিলাম সীমান্তের ওপারে সবান্ধব, সপরিবারে। সেই যাওয়া-আসার অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করতে চাই এই লেখায়। সীমান্তে বাস পৌঁছার সামান্য আগে সুপারভাইজার নির্দেশনা দিলেন, কিভাবে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন পার হতে হবে। সাথে পরামর্শ দিলেন, দালালের খপ্পরে না পড়ার। অতীত অভিজ্ঞতা অছে। তারপরও মনে রাখলাম সব। কিন্তু বাস থেকে নামতেই দালাল ঘিরে ধরল। ওদের সোজা কথা লাগেজ প্রতি দুশো টাকা। রফা না হলে কাস্টমসে লাগেজ তছনছ করা হবে। লাগেজে এমন কিছুই নেই। এমন তথ্যের তোয়াক্কা নেই ওদের। বরং এতে তারা আরও মরিয়া হয়ে ওঠে, চ্যালেঞ্জ করে বসে। দালালদের কর্মতত্পরতায় কঠিন হয়রানীর আশংকা! অগত্যা পেরেশানি থেকে মুক্তির জন্য কিছু বুঝবার আগেই অনেক যাত্রী দালালের শরণাপন্ন হন। লাগেজ প্রতি অর্থ গুণে দেন দালালকে, ওখানকার কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সামনেই। এই প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের চোখাচোখিতে তথ্য আদান প্রদান হয়, যা সহজেই দৃষ্টিতে পড়ে। কাস্টমসে কর্মরত লোকের সাথে যাত্রীর পরিচয় করিয়ে দেন দালাল দূর থেকে ইশারায়। যাত্রীকে হাত তুলে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনিই সাহায্য প্রার্থী। অতপর কাস্টমসে যাওয়া। বাসের সুপারভাইজার বেশ ভাব নিয়ে প্রশ্ন করেন দালালকে অর্থ দেয়া যাত্রীদের, এখানে আপনার দালাল কই। কাস্টমস একই সুরে প্রশ্ন করেন, কি আছে লাগেজে? কাস্টমসের প্রশ্ন শেষ হতেই ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া যাত্রীর উদ্দেশে বাসের সুপারভাইজার পরামর্শ দেন যাত্রীকে, আর কি করবেন এখানে কিছু দিয়ে যান, লাগেজ ঘাটাঘাটি করতে দিতে না চাইলে। যাত্রীরা বুঝতে পারে, তারা অনিয়মের পাকে বাঁধা। পরিত্রাণ নেই। পুরো প্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ। তার ওপর এই অনিয়ম। যেন গোদের ওপর বিষফোড়া! যাত্রীরা পেরেশানির হাত থেকে বাঁচার জন্য উেকাচ দেয়ার সহজ পথটাই বেঁছে নেয়। দু’পারের অবস্থা একই রকম। আচরণে খুব একটা রকমফের নেই। আমি অনেক যাত্রীকে বলতে শুনেছি যে, বর্ডার ক্রস করে দেশের মাটিতে পা রেখে ভাবলাম, এখানে আর কে জ্বালাবে! কিন্তু এখন দেখছি আরও দ্বিগুণ জ্বালা! কি কিনেছি, কি এনেছি এই ফিরস্তি দিতে দিতে মুখে ফেনা উঠে যায়। টাকা দিয়ে ক্ষান্ত না করলে শুরু হয় লাগেজ নিয়ে টানা হ্যাচড়া। যাত্রীদেরকে সেবা দেয়ার মানসিকতা নেই। উপরন্তু অবৈধ দ্রব্য আনার মিথ্যে অভিযোগ, যাত্রীদের হয়রানি করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার জোড়ালো প্রক্রিয়া বিদ্যমান। সীমান্তে বৈধ যাতায়াতকারীদের পারাপারের নির্ধারিত নিয়ম-নীতি কতটা সততা, স্বচ্ছতার সাথে পালন করছে সংশ্লিষ্টরা তা অনুসন্ধান করে দেখা অতীব জরুরি। বর্তমান যে অবস্থা তা যাত্রীদের জন্য অসহনীয়। আবার চোরাচালান রোধে কর্তৃপক্ষের যে হাবভাব তা অনেকটাই যেন লোক দেখানো। অনেক ব্যবসায়ী কিছু অসত্ কাস্টমস কর্মকর্তাকে হাত করে অবৈধ মালামাল পাচার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ সকল ব্যবসায়ী বোধ হয় কর্তাদের পূর্ব পরিচিত এবং পূর্ব আলোচনা সাপেক্ষ সব কাজ সম্পন্ন করা হয়। আর হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ যাত্রী। আমি জানি না আমার ধারণা সত্য কি না যে, সীমান্তে দালাল, কাস্টমস ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর মধ্যে নীরব, কখনও সরব যোগসূত্র রয়েছে। যদি আমার ধারণা ভ্রান্ত হয়, তাহলে মঙ্গল। বর্তমান সরকারের সাথে ভারত সরকারের ভাল সম্পর্ক বজায় আছে, অতএব সীমান্তে বিড়ম্বনা থাকবে না, এমন ধারণার বিপরীতটাই দেখা গেছে সীমান্তে। এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত। বিষয়টির প্রতি আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। লেখক :কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী