প্রশংসনীয় উদ্যোগ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২০:৫২
ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু দীর্ঘদিন যাবত্ জাতীয় উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইলেও কোনোভাবেই ইহার লাগাম টানিয়া ধরা যাইতেছে না। পরিসংখ্যান বলিতেছে, বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় বত্সরে যতো মানুষ হতাহত হয়—তাহার ৮৫ শতাংশেরও বেশি সংঘটিত হয় নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলিতে। আর এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা তাহার অত্যধিক দুর্ঘটনাপ্রবণ বৃহত্ প্রতিবেশি ভারতের চাইতেও শোচনীয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, দেশে বত্সরে গড়ে ১২ হাজার প্রাণহানির ঘটনা ঘটিতেছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। আর আহত হইতেছে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। কাহারো কাহারো মতে, প্রকৃত চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এই হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অতি উচ্চ। দুর্ঘটনার অনুপাতে প্রাণহানির তুলনামূলক বিচারেও বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলির শীর্ষপর্যায়ে। ইহাও প্রমাণিত যে, সর্বাধিক সংখ্যক প্রাণহানির ঘটনাই ঘটিতেছে মহাসড়কগুলিতে।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন যাবত্ সড়কপথে দুর্ঘটনায় অতি উচ্চ মৃত্যুহারের জন্য প্রধানত সময়োচিত ও যথাযথ চিকিত্সার অভাবকেই দায়ী করিয়া আসিতেছেন। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হার যে মূলত জরুরি ও অত্যাবশ্যক স্বাস্থ্যসেবার লভ্যতার ওপর নির্ভরশীল তাহা সুবিদিত। কিন্তু আমাদের মহাসড়কগুলিতে দুর্ঘটনার হার ক্রমবর্ধমান হইলেও হতাহতদের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে যথাযথ চিকিত্সাসেবা কখনোই সহজলভ্য ছিল না। এমনকী অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও সুলভ নহে। মহাসড়কের উভয়পার্শ্বের ভয়াবহ যানজট ঠেলিয়া দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তির চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করিতে প্রায়শ কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগিয়া যায়। ফলে গুরুতর আহত ব্যক্তিরাই শুধু নন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা অন্যবিধ কারণে গুরুতর নহে এমন বহু ব্যক্তিকেও করুণ পরিণতি বরণ করিতে হয়। এই কারণে বিশেষত মহাসড়কগুলিতে দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য একদিকে যেমন তাত্ক্ষণিকভাবে জরুরি চিকিত্সা সেবার অভাব মারাত্মক অনুভূত হইয়া আসিতেছিল দীর্ঘদিন যাবত্, অন্যদিকে তেমনি দেশি-বিদেশি নানা মহল হইতে এই ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো তাগিদও ছিল। সহযোগিতার হাত প্রসারিত করিতেও আগ্রহী ছিল অনেকে।
স্বস্তির খবরটি হইল, অবশেষে সেই ধরনের একটি উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছে পরীক্ষামূলকভাবে। উদ্যোক্তা হইল ‘ট্রমালিংক’ নামের একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ইহার সভাপতি হইলেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট একজন চিকিত্সক। গত বুধবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের সর্বাপেক্ষা দুর্ঘটনাপ্রবণ ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হইবে। আর এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকিবেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮৬ জন স্বেচ্ছাসেবক। শুধু তাহাই নহে, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, সিআরপি, বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সংস্থারও সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে ইহার সহিত। সব মিলাইয়া, উদ্যোগটি বেসরকারি এবং তাহার পরিধি সীমিত হইলেও ইহা যে অতি প্রয়োজনীয়, সময়োপযোগী এবং তাত্পর্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ তাহাতে সন্দেহ নাই। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাইবে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগই সহযোগিতার হাত প্রসারিত করিবে। উদ্যোক্তারা বলিয়াছেন যে, উদ্যোগটি সফল হইলে দেশব্যাপী তাহা ছড়াইয়া দেওয়া হইবে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, ডায়রিয়া প্রতিরোধ এবং প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনাসহ অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করিয়াছে বাংলাদেশের মানুষ। অতএব, এই ক্ষেত্রেও অসফল হইবার কোনো কারণ নাই। আমরা এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।