ইরান পরমাণু প্রকল্প আলোচনায় অচলাবস্থা

ইরানের পরমাণু প্রকল্প লইয়া দীর্ঘকালীন সমস্যা সমাধানের একটি রাস্তা দেখা দিয়াও যেন মিলাইয়া যাইতে বসিয়াছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়াই মূলত ইরানকে কতখানি পরিমাণে ইউরেনিয়াম পরিশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হইবে এবং তাহার মেয়াদ কতদিন চলিবে তাহা লইয়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাবান ছয়-জাতির সহিত মতবিভেদ চলিতেছিল ইরানের। এই ছয়-জাতির অপর পাঁচটি হইতেছে রাশিয়া, চীন, জার্মানী, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। আগামী রবিবার নাগাদ ইরানের ইউরেনিয়াম পরিশোধনের যে সময়সীমা পূর্বে বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছিল তাহা অতিক্রান্ত হইতেছে। সকল পক্ষ অবশ্য এই সময়সীমার মেয়াদ বাড়াইবার বিষয়ে ঐকমত পোষণ করিয়াছে। কিন্তু সমস্যা বাধিয়াছে অন্যত্র। শর্ত মানিবার বিনিময়ে ইরান কি পাইবে এবং ইরানকে কী কী করিতে হইবে তাহা লইয়া দর কষাকষিতে এক্ষণে বিষয়টি বেশ জটিল হইয়া পড়িয়াছে। পশ্চিমের ব্যাংকগুলিতে ইরানের তৈল বিক্রয়ের অনেক অর্থ দীর্ঘদিন ধরিয়া আটক হইয়া আছে; পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এমত হইয়াছে। পরমাণু প্রকল্প স্থগিতের বিনিময়ে অর্থনীতিতে বিষম ঝুঁকিতে থাকা দেশটি স্বভাবতই এই অর্থ ফেরত পাইতে চাহিতেছে এবং তাহা আলোচনার বর্ধিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হইবার পূর্বে। কিন্তু প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের কোন সিদ্ধান্তের বিনিময়ে ইরানের হস্তে পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের যে মজুত রহিয়াছে তাহা হ্রাস করাইয়া লইবার পক্ষে। এই প্রসঙ্গে মতদ্বৈধতার কারণে শুক্রবার নাগাদ ইরানের জন্য যে নূতন সময়সীমা বাঁধিয়া দিবার কথা ছিল তাহা সম্ভবপর হয় নাই। স্বাভাবিক যে, ইরানী কর্তৃপক্ষ নূতন বাস্তবতায় হতাশা প্রকাশ করিতেছে। উল্লেখ্য, দুই মাস পূর্বে পরমাণু প্রকল্প বিষয়ে নানা ধরনের ছাড় দিতে রাজী হইয়া সংলাপে বসে ইরান। উল্লেখ্য, ইরান তাহার নিকট মজুত ইউরেনিয়াম পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সেন্ট্রিফিউজগুলি আগামী সাত বত্সর পর্যন্ত ব্যবহার না করিতে রাজী আছে। সাত বত্সর অন্তে দেশটি এই সেন্ট্রিফিউজগুলি বেসামরিক কার্যে ব্যবহারের অনুমতি চায়। উল্লেখ্য, ইরানের নিকট বর্তমানে ১০ হাজার সেন্ট্রিফিউজ মজুত আছে। ইরানের প্রস্তাবের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে আগামী ২০ বত্সরের জন্য ইরানের হস্তে মাত্র দেড় হাজার সেন্ট্রিফিউজ রাখিবার প্রস্তাব দিয়াছিল। পরে অবশ্য সংখ্যাটি ছয় হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়। পরিস্থিতি এক্ষণে যাহা দাঁড়াইয়াছে তাহাতে উভয়পক্ষ কতটুকু সমঝোতায় আসিতে পারিবে বলা মুশকিল। বিশেষত, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যে উভয়পক্ষের আলোচনায় দারুণ প্রভাব বিস্তার করিতেছে তাহা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। ইরানী কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করিয়াছেন যে, অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু স্থাপনাগুলি বন্ধ করিয়া দেওয়া, দীর্ঘকালীন শর্ত মানিয়া লওয়া, সর্বোপরি বহু লোকের কর্মহানির মত বিষয়গুলি জনগণের নিকট শাসকগোষ্ঠীর বড় ধরনের পরাজয় হিসাবেই গণ্য হইবে। এই কারণে ছয়-জাতির সহিত সংলাপে নিজদিগকে অতিশয় নরম হিসাবে চিহ্নিত করিয়া ফেলিবার বিষয়ে সচেতন থাকিতেছে ইরানী আলোচকেরা। যুক্তরাষ্ট্রও রহিয়াছে একই ধরনের সমস্যায়। আগামী নভেম্বরে আইন সভার নির্বাচনে নিজের দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে ভালো ফলাফল লাভ করিতে বারাক ওবামার জন্য ইহা বড় এক পরীক্ষা। এমনিতেই বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি তাহাকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে “হাঁটু-কাঁপা” প্রেসিডেন্টের তকমা আঁটিয়া দিয়াছে। এইবার ইরানের সহিত আলোচনায় ওবামা-টীম এই বিষয়টি স্মরণে রাখিতেছে বলিয়া মনে হইতেছে। শেষমেশ দীর্ঘকালীন সমস্যাটির কোন ফয়সালা হয় কিনা তাহা দেখিবার জন্য আপাতত আমাদের অপেক্ষা করিতেই হইতেছে।