[ রা জ নী তি ]

ফর্মুলাহীন রাজনীতি এবং আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

রাজনীতি, ইফতার এবং আন্দোলনের হুমকি-প্রস্তুতি সমানভাবে চলছে। রাজনীতি ও ইফতার দুটি আলাদা বিষয় হলেও রাজনীতিবিদদের জন্য বর্তমানে এর পার্থক্য করা কঠিন। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিভিন্ন ইফতার কর্মসূচিতে দেয়া বক্তব্যের বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ্য করলেই এ বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যায়। বিশেষ করে তিনি প্রতিটি বক্তব্যেই ঈদ-পরবর্তী কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগ এ বিষয়টিকে খুব বেশি আমলে নিচ্ছে না। কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ মনে করছে এবারও বিএনপি আগের মতোই সঠিক লাইনে নেই। বিগত সরকারের সময়ে বিএনপি সংসদ বর্জন করেছে, হরতাল-অবরোধ ইত্যাদি করছে। এ ছাড়া বিএনপি যে কোনো বিষয়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ভারতের উগ্র বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছিল। পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি তাদের দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল। এসব ঘটনায় বিএনপি সম্পর্কে মানুষের মনের মধ্যে অনেকক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতে মোদী সরকারের বিজয়ে বিএনপি প্রথম দিকে অনেক আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত হলেও সম্প্রতি এ বিষয়ে কোনো তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত মোদী সরকারও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখাবে না। প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই দেশ-কাল উপযোগী নতুন চিন্তা-চেতনার লড়াই দরকার। কিন্তু সাম্প্রতিককালের সরকারবিরোধীদের নানাবিধ রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মনে হয়েছে তারা গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। ফলে ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মাঠ। তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ‘ডু অর ডাই’। ফলে সামনে কোনো ইতিবাচক রাজনীতির জায়গা থাকছে না। এই মুহূর্তে সরকারের বিপাকে পড়ার মতো বড় ধরনের কোনো দুর্বলতা নেই। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা বর্তমানে রাজনীতির মাঠে নিজেদেরকে অনেক ইতিবাচক অবস্থানে দেখছেন। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো তারা আমলে নিয়েছে তাহলো: বিরোধী দল সহসাই সরকারবিরোধী কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ পাবে না; দেশের বিভিন্ন সমস্যা সরকার ইতিমধ্যেই ভালোভাবে সামাল দিয়েছে; ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একতরফা হওয়ার প্রতিক্রিয়া পশ্চিমা বিশ্বে শিথিল হয়ে আসছে ও সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এবং ভারতে দক্ষিণপন্থী শক্তি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তেমন টানাপড়েন দেখা দেয়নি বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকায় এসে অনুকূল বার্তাই দিয়েছেন। সর্বশেষ, মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের আন্তর্জাতিক সালিশে জয়লাভ দলীয় নেতা-কর্মীদের সন্তোষজনক ভাব তৈরি করেছে। তবে আগামী দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক চ্যালেঞ্জ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা দুটি বড় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণে বলা যায়, শুধুমাত্র নির্বাচনের দাবি এবং নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি ছাড়া বিরোধীরা আন্দোলনের কোনো যথাযথ ইস্যু পাচ্ছে না। এ কথা নিঃসন্দেহে পরিষ্কার যে, কোনো কারণে সরকার ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকলে বিরোধীরা এঁটে-সেঁটে বসতে দ্বিধা করতো না। ফলে একটি বিষয় জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিএনপি চেয়ারপার্সন নতুন কোনো ইস্যু ছাড়া ঈদ-পরবর্তী কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া আর কোনো বক্তব্যই নেতা-কর্মীদের উপহার দিতে পারছেন না। কাজেই অবস্থা দেখেই মনে হচ্ছে যে, বিরোধীরা হালে পানি পাচ্ছে না। গত এপ্রিল-মে মাসে নারায়ণগঞ্জে একজন সিটি কাউন্সিলরসহ সাতজন ও ফেনীতে একজন কাউন্সিলরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তাত্ক্ষণিকভাবেই সরকার ওই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। বলা যায়, ওই পরিস্থিতি থেকে এক ধাপ উন্নয়ন ঘটেছে বলে মনে হয়। ওই সময়ে দেশব্যাপী এর যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল তা সরকার অল্প সময়ের মধ্যে সামলে উঠেছে বলে বিএনপি এ বিষয়ে কথা বলতে পারছে না। এরই মধ্যে এ ঘটনাগুলোর পর সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন। কেন্দ্র দখল থেকে খুনোখুনি পর্যন্ত বিভিন্ন মহলের নানা আশঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণ ভোটাভুটিতে একটি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেনি। অভ্যন্তরীণ এ ঘটনাগুলো সরকার সফলভাবে সামাল দিতে পেরেছে বলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কিছুটা স্বস্তির মধ্যেও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিএনপি কোনোভাবেই সরকারকে দোষারোপের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। এমনকি সাংগঠনিকভাবে নিজেদের দুর্বলতার ফলে আন্দোলনের মাঠ সাজাতে পারেনি। কাজেই বিএনপি যে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। বিএনপি চেয়ারপার্সন বিগত সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতা থাকা অবস্থায় সংসদে উপস্থিত না থেকে সংসদের বাইরে থেকে নানাবিধ লক্ষ্যহীন কর্মসূচি পালন করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি যেসব হরতালের কর্মসূচি পালন করেছিল, তা প্রথম দিকে কিছুটা জনসমর্থন পেলেও শেষ দিকে জনবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যে, হরতাল মানেই সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি। হরতালের আগের দিন এমন কোনো দিন ছিল না যে, দু-একটি গাড়ি পোড়েনি কিংবা দু-একজন মানুষ মারা যায়নি। এসবের নাম নিশ্চয়ই গণতন্ত্র কিংবা জনগণের রাজনীতি নয়। আমরা জানি, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ বিএনপি সরকার পতনের জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বিএনপিকে একদিন আগেও ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। এছাড়া ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ঘটনাসহ স্থানীয় পর্যায়ের বেশিরভাগ নির্বাচন সরকারদলীয় প্রার্থীদের কারচুপিপূর্ণ বিজয় ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে যৌক্তিকতায় পরিণত করেছিল। কারণ, বিগত সময়ে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু না হওয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ওইরকম সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ঈদ-পরবর্তী সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের যে দাবিতে কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যেতে চাচ্ছে তা কতটুকু যৌক্তিক তা একটু ভেবে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে বিএনপিও ভালো করে জানে যে, সরকার না চাইলে কোনাভাবেই সরকারকে দ্রুত একটি নির্বাচন দেয়ার বিষয়ে বোঝানো সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয় যে, দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস আর সন্দেহের ঘূর্ণিপাক থেকে এখনও বিএনপি বের হতে পারেনি। দলের নেতা-কর্মীরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ সৃষ্টি করেই যাচ্ছে। চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও দলের ভেতরে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে সাংগঠনিকভাবে অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো। তারপর শুরু হয় দল গোছানোর প্রক্রিয়া। বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময়ও দেখা গেছে তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতার চিত্র। তবে সম্প্রতি দল পুনর্গঠনের খবরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। কেউ মনে করেন দল পুনর্গঠন হলে সুবিধাবাদী, আঁতাতী, ষড়যন্ত্রকারী ও ব্যক্তিত্বহীন নেতারা বাদ পড়বেন। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, দলের মধ্যে যে জটিলতা তাতে সহসা দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হবে না। অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশ না হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের কোনো আশার বাণীই কাজে আসছে না। একের পর এক দুর্যোগে দলের ভিত হিসেবে পরীক্ষিত তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যেন কোনো আস্থার জায়গা পাচ্ছে না। দলটির নেতারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা স্বীকার না করলেও অধিকাংশ কর্মী মনে করেন, বিএনপির সামনে ইস্যু আসছে আর যাচ্ছে। দলের ভেতর কোন্দল থাকায় কোনো ইস্যুকেই কাজে লাগাতে পারছে না। ঈদের পরে দল গুছিয়ে মাঠে নামতে পারলেও আন্দোলনে কতোটা সফল হতে পারবেন তা নিয়ে চিন্তিত আছেন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাসহ চেয়ারপার্সন নিজেও। বিএনপি নেতারা মনে করেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে বাধ্য হবে ক্ষমতাসীনরা। দাবি আদায়ে প্রাণপণ চেষ্টার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিএনপি। এছাড়া বিএনপি আগামী নির্বাচনের জন্য অবিলম্বে সংলাপে বসার জন্য সরকারকে তাগিদ দিচ্ছে। সম্প্রতি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠককালে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ আগাম নির্বাচনের জন্য যে কোনো সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসতে বিএনপি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। আর এই মুহূর্তে সরকারদলীয় নেতারা সংলাপের জন্য প্রস্তুত নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। কাজেই সংলাপ-আলোচনা-আন্দোলনের মাধ্যমে কোনোভাবেই সমাধানের সুযোগ এই মুহূর্তে নেই। এক্ষেত্রে অবশ্যই বিএনপিকে রাজনৈতিক দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে আগামী নির্বাচনে নিজেদের অবস্থানকে মজবুত করতে পারে। আগামী দিনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের সামনেই কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জকে কে কতো গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে পারবে তার ওপরেই নির্ভর করবে ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক সম্ভাবনা। নিজেদের মধ্যে সমঝোতামূলক মনোভাব তৈরি করতে না পারলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাবে। অতএব, রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে বের হয়ে এসে সরকার ও সরকারবিরোধী উভয়েরই সুশাসনের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রাখা দরকার। কারণ একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহযোগিতা গণতন্ত্রের যথাযথ পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। তাঁর মতে, ‘গণতন্ত্র সত্যিকার সভ্যতার এমন এক পর্যায়ের ওপর নির্ভরশীল যেখানে সভ্য জনগণ অন্যের অধিকার ও প্রয়োজনকে সম্মান করতে জানে।’ লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: sultanmahmud.rana@gmail.com