তিনটি ছাত্রাবাসের কাহিনী

গত শনিবার পত্রিকান্তরে একখানা ইমারতের ফটো ছাপা হইয়াছে, দেখিয়া অবহেলায় পড়িয়া থাকা কোনো প্রত্ননিদর্শন কিংবা পোড়োবাড়ি বলিয়া যে কাহারও ভ্রম হইতে পারে। ভবনের আঙিনা আকীর্ণ করিয়া অবাধে বাড়িয়া চলিয়াছে ঘাস-বিচালি। বোঝাই যায়, বহুদিন এইখানে কোনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়ে নাই। পলেস্তারা খসিয়া না পড়িলেও দেওয়ালে ধূলার যে আস্তরণ জমিয়াছে শেওলা পড়িয়া তাহাও ঢাকিয়া গিয়াছে। ভবনের বারান্দা ঘেঁষিয়া একাকী দণ্ডায়মান চালতা কিংবা অন্য কোনো প্রাচীন বৃক্ষ। জনমানবহীন এই নিঃশব্দ ভবনটি আসলে কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি নয়; ইহা একটি ছাত্রাবাস। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের পদচারণায় যে নিবাস ছিল একসময় মুখরিত, তাহা আজ চার বত্সর ধরিয়া পড়িয়া আছে তালাবদ্ধ অবস্থায়। একই অবস্থা এই ইনস্টিটিউটের আরও দুইটি ছাত্রাবাসের। চার-চারটি বত্সর ধরিয়া হলগুলি বন্ধ রাখা হইয়াছে, বলিতে গেলে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই। ২০১০ সালের কথা। ওই বত্সর সন্ধ্যায় আধিপত্য বিস্তার ও ভর্তিবাণিজ্য নিয়া সৃষ্ট বিরোধের জের ধরিয়া দুইটি ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান শেষবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। অতঃপর কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বন্ধ ঘোষণা করেন। কিছুদিন পর ইনস্টিটিউট খুলিলেও ছাত্রাবাসগুলির তালা আর খোলে নাই। কিন্তু কেন, তাহার সদুত্তর পাওয়া কঠিন। শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর যথারীতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছিল। কিন্তু চার বত্সরেও সেই কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে নাই। আর তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া যায় নাই বিধায় হল তিনটি নাকি খুলিয়া দেওয়া সম্ভবপর হইতেছে না। ইহার চাইতে খোঁড়া যুক্তি আর কি হইতে পারে! প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, তদন্ত রিপোর্ট না পাইবার কারণে যদি ছাত্রাবাস খুলিয়া দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহা হইলে ইনস্টিটিউট খোলা হইল কেমন করিয়া? প্রতিষ্ঠানের অন্যসব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ যথারীতি চলিতে পারিতেছে, কেবল ছাত্রাবাস খুলিয়া দিতেই তদন্ত রিপোর্ট না পাইবার অজুহাত! বলিহারি যুক্তির দৌড়! এখন আবার বলা হইতেছে যে, তালা মারা অবস্থায় থাকিবার কারণে ছাত্রাবাস তিনটির হালফিল অবস্থা যাহা দাঁড়াইয়াছে তাহাতে ছাত্রদের বসবাস করা অসম্ভব। কাজেই তালা খুলিয়া দিবার আগে সংস্কার করা জরুরি। দীর্ঘ চার বত্সর পতিত পড়িয়া থাকিলে যেকোনো ভবনেই যে চামচিকা বাসা বাঁধিবে, শেওলা পড়িবে, ভূতুড়ে বাড়ির রূপ পরিগ্রহ করিবে—ইহাতে আর বিস্ময়ের কি আছে! তাই বলিয়া ঝাড়িয়া মুছিয়া ধোয়াপাখলা করিয়া রং দিয়া ছাত্রাবাস তিনটিকে কি আবারও বসবাস উপযোগী করিয়া তোলা যাইত না? ইহা কি এমন কোনো হারকোলিয়ান টাস্ক, যাহাতে কর্তৃপক্ষের মাস বত্সর পার হইয়া যাইতে পারে? বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে হানাহানি, রক্তপাত, খুন-খারাবি এবং ক্লাস বন্ধ হইয়া যাওয়া নূতন কোনো ঘটনা নহে। ছাত্রাবাসে তালা লাগাইয়া ছেলেমেয়েদের বাড়িও পাঠাইয়া দেওয়া হয়। কিন্তু তাহা আবার কিছুদিন পর খুলিয়াও দেওয়া হয়। টানা চার বত্সর হল বন্ধ রাখিবার দৃষ্টান্ত রাজশাহী পলিটেকনিক ছাড়া বোধহয় আর একটিও নাই। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্রসংখ্যা তিন হাজার। নূতন করিয়া ভর্তি হইয়াছে আরও আট শতাধিক। দূর-দূরান্ত, গ্রাম মফস্বলের বহু শিক্ষার্থী আছেন যাহারা ছাত্রাবাসের অভাবে দুর্ভোগ পোহাইতেছেন। তাহাদের পড়ালেখার ক্ষতি হইতেছে। অথচ কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্যের কারণে তিনটি ছাত্রাবাস পড়িয়া আছে অব্যবহূত। এই অবস্থা চলিতে পারে না। যত শীঘ্র সম্ভব ছাত্রাবাস তিনটি খুলিয়া দেওয়া হইবে ইহাই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা।