আশাব্যঞ্জক সংবাদ
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৪, ২১:২৮
মশলার কদর বিশ্বব্যাপী। আর দক্ষিণ এশিয়ায় যাহা ‘গরম মশলা’ নামে খ্যাত তাহার সুঘ্রাণবর্জিত উপাদেয় খাদ্যের কথা এখন অনেকে কল্পনাও করিতে পারেন না। শত শত বত্সর আগেই দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়া ইহার সুঘ্রাণ ছড়াইয়া পড়িয়াছিল বিশ্বের দেশে দেশে। শুধু মশলার লোভেই বিপদসঙ্কুল অচেনা উত্তাল সমুদ্র অতিক্রম করিয়া সুদূর ইউরোপ হইতে বহু নাবিক ছুটিয়া আসিয়াছেন এশিয়ার এই প্রান্তে। যত দিন গিয়াছে মশলার কদরও তত বৃদ্ধি পাইয়াছে। আর তাহা এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছিল যে, মশলার বাণিজ্য করিয়া যেমন ইউরোপের একাধিক দেশ ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিয়াছিল, তেমনি এই বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ বা দখল লইয়া তাহাদের মধ্যে যুদ্ধও হইয়াছে। মশলা লইয়া কাড়াকাড়ি এখনও থামে নাই। বরং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সহিত পাল্লা দিয়া উত্পাদনও বাড়িয়াছে। বিস্তৃত হইয়াছে মশলা-বাণিজ্যের পরিধি।
মশলার কদর বিশ্বজনীন হইলেও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই এই একটি ক্ষেত্রে এখনও পরমুখাপেক্ষী। বিস্ময়করভাবে শত শত বত্সর ধরিয়া মশলা-ঐতিহ্যের গৌরবপতাকাবাহী দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশও তাহার ব্যতিক্রম নহে। এই দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ব্যাপকভাবে মশলানির্ভর হওয়া সত্ত্বেও গরম মশলা তো বটেই, এমনকী আদা, রসুন, পিঁয়াজের জন্যও আমাদের পরনির্ভরতা এখনও কাটে নাই। ইহার নেতিবাচক দিকটি সুবিদিত। বাহিরে কোনো কারণে এইসব পণ্যের সংকট দেখা দিলে সাথে সাথে দেশের ভিতরেও হু হু করিয়া দাম বাড়িয়া যায়। গরম মশলার ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা যে আরও ব্যাপক তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে রসনা তৃপ্ত করিবার জন্য এই দেশের মানুষকে প্রায়শ উচ্চমূল্যে এইসব মশলা ক্রয় করিতে হয়। একইভাবে আমদানির পিছনে ব্যয় করিতে হয় বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা।
এই প্রেক্ষাপটে আশাব্যঞ্জক একটি সংবাদ শোনাইয়াছেন বেনাপোলের সৌখিন চাষি শাজাহান আলী। তিনি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ইন্টারনেট হইতে তথ্য সংগ্রহ করিয়া এলাচ চাষ শুরু করিয়াছিলেন ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তিন বত্সরের ব্যবধানে ফলে ফলে ভরিয়া গিয়াছে তাহার ক্ষেত। দুই জাতের এলাচ উত্পাদিত হইয়াছে তাহার জমিতে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করিয়াছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে যে, দেশে উত্পাদিত এই এলাচের গুণাগুণ আমদানিকৃত এলাচের সমপর্যায়ের। তবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হইল, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে এলাচ উত্পাদন ইহাই প্রথম। প্রসঙ্গত তিনি মন্তব্য করিয়াছেন যে, সারা দেশে এই ধরনের উদ্যোগ ছড়াইয়া দিতে পারিলে আমাদের আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পাইবে। তাহার এই মন্তব্যের সহিত দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নাই।
এলাচ ‘গরম মশলা’ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সফলভাবে এলাচ উত্পাদন করিয়া বেনাপোলের সৌখিন চাষি শাজাহান আলী যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণেরাও চাকরির পিছনে শক্তি ও উদ্যম ক্ষয় না করিয়া স্ব-স্ব এলাকায় অনুরূপ উদ্যোগ গ্রহণ করিতে পারেন। শুধু এলাচই নহে, আমদানিনির্ভরতা রহিয়াছে এমন সকল মশলাজাতীয় ফসল উত্পাদনেই আগাইয়া আসিতে পারেন তাহারা। আগামীদিনের কৃষি তাহার বিশাল সম্ভাবনা লইয়া শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বাগত জানাইবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। আর বাংলার সুফলা মাটি যে উদ্যোগী ও পরিশ্রমী মানুষকে কখনোই নিরাশ করে না, এলাচই তাহার একমাত্র দৃষ্টান্ত নহে।