মহাকাশ
মহাকাশে আবর্জনার বিপদ
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৪, ২১:২৯
বিশ্বকবি লিখেছিলেন-‘আকাশভরা সূর্য-তারা।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃত অর্থেই অনুভব করেছিলেন মহাকাশের অপার সৌন্দর্য। এরপর বিশ্বের সাতসমুদ্রে বয়ে গেছে অনেক স্রোত। আকাশভরা সূর্য-তারা এখনো আছে। কিন্তু সেই আকাশ যে ভরে যাচ্ছে আবর্জনায়! আর এই আবর্জনা অপসারণে সবারই ট্যাকে যেন টান পড়ে। তাই এবার বেসরকারি উদ্যোগে মহাকাশে আবর্জনা সাফাইয়ের তোড়জোড় চলছে। আর এই উদ্যোগের ওপর ভর করে বেশ কয়েকটি দেশ আবর্জনা সাফাইয়ের কাজকে ভালো ব্যবসাতে পরিণত করে তুলেছে।
বহু দশক ধরে পৃথিবীর কক্ষপথে যে সব কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে, তার অনেকগুলো বাতিল হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে—কখনো আস্ত অবস্থায়, কখনো বা ভেঙে টুকরো হয়ে। মানবজাতিকে এই সব আবর্জনা থেকে অবিলম্বে মুক্তি না দিলে বিপদের শেষ থাকবে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এরপর আর স্যাটেলাইট সঙ্কেত পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাবে না। ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাবে না, জিপিএস ন্যাভিগেশন ঠিকমতো না চলায় গাড়ি ভুল রাস্তায় চলে যাবে। এই সমস্যার সমাধান করতে একেবারে আঁটঘাট বেঁধে নামতেও শুরু করেছে বিভিন্ন সংগঠন। মহাকাশে বেসরকারি উদ্যোগের জোয়ার এসেছে, যাকে বলা হচ্ছে নিউ স্পেস ইন্ডাস্ট্রি।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার অনুমান, মহাকাশে এই মুহূর্তে পাঁচ লাখেরও বেশি জঞ্জালের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে। অকেজো স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে মার্বেল আকারের লেন্স কভার—কী নেই সেই তালিকায়! আরো কোটি কোটি আবর্জনা আছে যেগুলো এতই ছোট যে তার হিসাব রাখা অসম্ভব। প্রবল বেগে ধেয়ে চলেছে এই সব ছোট-বড় বস্তু। সংঘর্ষ ঘটলে যে কোনো মহাকাশযানকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে এগুলো। তবে আশার আলো হলো, এই জঞ্জাল অনন্তকাল ধরে ভেসে বেড়ায় না। কোনো এক সময় বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে জ্বলে উঠে ছাই হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এখনো পর্যন্ত অনেক প্রস্তাব শোনা গেছে। যেমন বিশেষ বিদ্যুত্ তরঙ্গের মাধ্যমে মহাকাশ জঞ্জালের গতি কমিয়ে সেগুলোকে দ্রুত বায়ুমণ্ডলের উপর ফেলা। টাংস্টেন ধুলোর মাধ্যমে জঞ্জাল ঝেটিয়ে মহাকাশে ঠেলে দেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন কিছু বিজ্ঞানী। তবে এত বড় কর্মযজ্ঞের ব্যয়ভার বহন করতে কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
এই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে এগিয়ে এসেছে সিঙ্গাপুরের অ্যাস্ট্রোস্কেল কোম্পানি। তারা এমন এক প্রযুক্তি প্রস্তুত করছে, যার ব্যয় কম এবং অনেক বেশি করিত্কর্মা। এর আওতায় একটি বড় মহাকাশযান কক্ষপথে পাঠানো হবে, যার মধ্যে থাকবে ছটি ছোট যান। সেগুলো ২০০ বড় জঞ্জালের টুকরোর সংস্পর্শে এসে সেগুলোকে বায়ুমণ্ডলের দিকে ঠেলে দেবে। সম্ভব হলে বিকল স্যাটেলাইট মেরামত করে তার আয়ুও বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করবে এইসব যান।
মানুষ তার সভ্যতার জঞ্জাল ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশ থেকে পাতালে, সর্বত্র। সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতেই সেই জঞ্জাল অপসারণ অবশ্য কর্তব্য। নইলে, প্রযুক্তি হয়ে উঠবে বিপদের সবচেয়ে বড় কারণ।
লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক