নূতন প্রত্ন নিদর্শন আবিষ্কার ও সংরক্ষণ

বাংলাদেশের মাটি বিভিন্ন সভ্যতার লীলাভূমি। এখানে নূতন নূতন প্রত্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হইতেছে যাহা এই অঞ্চলের অতীতের উন্নত সভ্যতা ও ঐতিহ্যের স্মারক। ইহা আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত করিতেছে। মুসলমানগণ এই দেশকে অলি-আউলিয়ার দেশ হিসাবে বিবেচনা করেন। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাব্দী ধরিয়া ধর্মপ্রচারকগণ নিরবচ্ছিন্নভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রজন্ম পরম্পরায় তাহাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আজকের এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ যাহা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনপদ হিসাবে গণ্য। এজন্য এই ওলি-আউলিয়া ও মুবাল্লিগদের পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন যেখানেই পাওয়া যাইবে তাহা যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সমপ্রতি ইত্তেফাকে পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক ও শাসক হযরত খান জাহান আলীর (রহ.) স্মৃতিধন্য প্রাচীন নগরী বারোবাজারে কয়েকটি মসজিদ ও কবরস্থান আবিষ্কারের খবর প্রকাশিত হইয়াছে। গত শতাব্দীর আশির দশকে এই নগরীটি আবিষ্কৃত হইলেও এ ব্যাপারে এখন নূতন নূতন তথ্য পাওয়া যাইতেছে। উল্লেখ্য, হযরত খান জাহান আলী (রহ.) প্রথম যে স্থানে আস্তানা স্থাপন করেন তাহার নাম এই বারোবাজার। ইহা বর্তমানে ঝিনাইদহে অবস্থিত। পরবর্তীতে তিনি খুলনার বাগেরহাটে চলিয়া যান এবং সেখানে ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণসহ নানা কীর্তির স্বাক্ষর রাখেন। সূত্র অনুযায়ী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহায়তায় এই পর্যন্ত ১০টি মসজিদ আবিষ্কার করা হইয়াছে এবং ৬টি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হইয়াছে। বাকিগুলি আছে নির্মাণাধীন। মসজিদের পাশাপাশি কিছু কবরস্থানও আবিষ্কার করা হইয়াছে। আমরা আশা করি, এইগুলি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হইবে। জানা যায়, বারোবাজার নগরীর পরিধি ছিল ১০ বর্গমাইল। মসলিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান পণ্য এখান হইতে রপ্তানি হইত বিভিন্ন দেশে। এমন একটি মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বাহক ঐতিহাসিক এলাকাটির উত্তরোত্তর উন্নয়ন দরকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহানবীর (স.) জীবদ্দশায় ও ওফাতের পর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়া অনেক সাহাবী এই দেশে আগমন করেন। তাহাদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করা জরুরি। তাহাছাড়া অসংখ্য ওলি-আউলিয়া, মুবাল্লিগ ও মুসলিম শাসকদের স্মৃতিবিজড়িত দরগা-খানকাহ-মাজার বা তাহাদের নির্মিত মসজিদ-মাদ্রাসা, পুকুর-দীঘি ইত্যাদি ছড়াইয়া রহিয়াছে সারাদেশে। এইগুলি যথাযথ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য অনুযায়ী উন্নয়নের দাবি রাখে। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করি আমরা। তবে শুধু মুসলিম ঐতিহ্যই নহে, হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার প্রাচীন নির্দশনগুলিও আমাদের আবিষ্কার ও সংরক্ষণ করিতে হইবে। এভাবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হইবে। এখন পর্যটনের যুগ। পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছে। অনেক দেশের অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল পর্যটন খাতের ওপর। তাই এসব সমৃদ্ধময় অঞ্চল সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা আর্থিকভাবেও লাভবান হইতে পারি। সারা বিশ্বসহ বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও ভারতীয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে ইহা সহায়ক হইবে। মসজিদের পাশাপাশি দেশে বিভিন্ন মন্দির ও বৌদ্ধবিহার আবিষ্কারের যে ঘটনা ঘটিতেছে তাহা সত্যিই উত্সাহব্যঞ্জক ও ইতিবাচক। এই ধরনের যেকোন উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। সমপ্রতি আড়াই হাজার বত্সরের প্রাচীন দুর্গ নগর হিসাবে আলোচিত নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বরে আরো একটি বৌদ্ধ মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায়। ইহা শিবপুর উপজেলার টঙ্গিরটেক এলাকায় অবস্থিত। গবেষকদের ধারণা, মন্দিরটি প্রায় দেড় হাজার বত্সর আগের তৈরি। উয়ারি-বটেশ্বর এলাকা হইতে ইহা মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই আবিষ্কার আমাদের প্রত্নতত্ত্বে নূতন মাত্রা দান করিয়াছে এবং বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক তাত্পর্য বহন করিতেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইহা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এগুলির সংরক্ষণে দরকার হইলে বাজেট বাড়াইতে হইবে। পর্যটকদের সুবিধার্থে সকল মতবিরোধ ও জটিলতার অবসান ঘটাইয়া উয়ারি-বটেশ্বর এলাকায় শীঘ্রই সংগ্রহশালা ও জাদুঘর গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। বারোবাজার ও উয়ারি-বটেশ্বরসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতত্ত্ব এলাকায় পর্যটন করপোরেশনের মোটেল তৈরির উদ্যোগও নিতে হইবে। সর্বোপরি এসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করিতে হইবে।