[ রা জ নী তি ]

আন্দোলন, না ভোকাল থেরাপি

ঈদের পর সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন করা হবে বলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের অন্য অনেক নেতাই গত কিছুদিন ধরে প্রচার করে আসছেন। রোজার মাসের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন ইফতার পার্টির আয়োজন করে বেগম জিয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের বার্তা প্রচার করলেও দেশের মানুষের মধ্যে তাদের এই আন্দোলন নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ বা কৌতূহল তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকার কিংবা শাসক দল আওয়ামী লীগও বিএনপির আন্দোলন নিয়ে খুব একটা বিচলিত আছে, তেমন লক্ষণও দেখা যায় না। বিএনপির আন্দোলন নিয়ে প্রায় একই ধরনের খবর নিয়মিত প্রকাশিত হওয়ায় এগুলো পাঠকদের তেমন একটা আকর্ষণ করে না। তারপরও বিএনপি যেহেতু একটি বড় রাজনৈতিক দল, এই দলের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যাও যেহেতু দেশে কম নয়, তাই তাদের আন্দোলনের হুমকি সামনে রেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ঈদের পরে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, সেটা দেখার জন্য চোখ-কান খোলা রাখছেন। তবে কেউই এমন আশা বা আশঙ্কা করছেন না যে, ঈদের পর দেশে বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে উঠবে, যার জন্য সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হবে। বরং এমনটাই আশা করা হচ্ছে যে, গত প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে বেগম জিয়া যে রকম ঈদের পর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বাস্তবে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার রেকর্ড তৈরি করেছেন, এবারও তারই পুনরাবৃত্তি হবে। এবারও ঈদের পর দেশের রাজনীতিতে উল্লেখ করার মতো কোনো কিছুই ঘটবে না। বিএনপি এবং তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলো কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তাতে সরকারের ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টির মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না। বেগম জিয়া, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি নেতারা আন্দোলন নিয়ে যে হম্বিতম্বি করছেন সেটা মূলত দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য এক ধরনের ভোকাল থেরাপি। এই ভোকাল থেরাপিতে না হবে আন্দোলন, না হবে সরকার পতন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেও বিএনপি সে নির্বাচন বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শুদ্ধতা নিয়ে যত প্রশ্নই তোলা হোক না কেন, বাস্তবতা এটাই যে, ওই নির্বাচনের মধ্যদিয়েই শেখ হাসিনার সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদকালের জন্যই ক্ষমতায় বসেছেন। অনেকের মধ্যে অস্বস্তি থাকলেও সাধারণভাবে দেশের মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছে। দেশে শান্তি-স্বস্তি ফিরে আসায় মানুষ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তাছাড়া দেশের বাইরে সরকারের গ্রহণযোগ্যতার সংকট আছে বলেও বাস্তবে দেখা যায় না। আন্দোলন করে এই সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই ক্ষমতা থেকে হটানোর মতো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি বা সক্ষমতা বিএনপির আছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখনই মনে করছেন না। তবে হ্যাঁ, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিএনপিকে অবশ্যই ঈদের পর গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে হবে। কত কয়েক মাস ধরে দলটি যেভাবে ঘরে বসে আছে তাতে তার সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরা কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অথবা ভেতরে সেমিনার কিংবা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে ‘স্বৈরাচারী-অগণতান্ত্রিক’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করার মধ্যেই যদি বিএনপির আন্দোলন-কার্যক্রম সীমিত থাকে তাহলে দল টিকিয়ে রাখা যে অসম্ভব হয়ে পড়বে সেটা বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বুঝতে পারছেন বলেই সম্ভবত অবিলম্বে দেশে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার অস্থিরতা তাদের পেয়ে বসেছে। দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার মতো অনেক বাস্তব কারণ থাকলেও বিএনপির পক্ষে এখনই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। বিএনপি নেতারা নিজেদের নিয়ে যত বড়াই-ই করুন না কেন, বিএনপি আসলে কোনো আন্দোলনের দল নয়। আন্দোলনে বিএনপির সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আছে। দেশের অনেক মানুষই বর্তমান সরকারের শাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভালো বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে গ্রহণ করতে পারছেন না। তাছাড়া বিএনপির একক নেতৃত্বে দেশে একটি সফল গণআন্দোলন গড়ে ওঠার নজির দেখানো যাবে কি? বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির জন্মলাভের পর কবে, কোন আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে? শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত মেয়াদকালে বিএনপি-জামায়াত সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের নামে চরম সহিংসতার পথ অনুসরণ করেও দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে সক্ষম হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির প্রতি দেশের মানুষের মোটামুটি সমর্থন থাকলেও এবং প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তি ওই দাবির প্রতি একাত্ম থাকার পরও কেন ওই দাবি আদায় করা সম্ভব হয়নি-সে প্রশ্ন বিএনপি নেতারা কখনোই নিজেদের করেন না। তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আন্দোলনের কৌশল সঠিক ছিল কিনা সে প্রশ্নও তাদের মধ্যে নেই। সরকারি দমন-পীড়ন, গ্রেফতার-নির্যাতন, হামলা-মামলার কারণেই কি আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল নাকি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক ত্রুটি-দুর্বলতাও ছিল? ব্যর্থতার কারণগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ না নিয়ে কেবল ‘আন্দোলন’ ‘আন্দোলন’ বলে চিত্কার-চেঁচামেচি করে যে কোনো ফল হবে না- এটা বিএনপি নেতারা বুঝতে পারছেন না। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি নামক দলটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ভয়ানক রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য নেতৃত্বের মধ্যে যে ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, নেতৃত্ব তা দেখতে পারেননি। উল্টো নেতৃত্বের মধ্যে চরম সন্দেহ-অবিশ্বাস বিরাজ করছে। দলের ভবিষ্যত্ কাণ্ডারি বলে পরিচিত সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমান লণ্ডনে বসে যেভাবে এবং যে কৌশলে দল চালাচ্ছেন তাতে দলের ঐক্য ও সংহতি বাড়ছে না কমছে, সেটারও একটা হিসেব করে দেখার সময় এসেছে। সারা দেশে বিএনপি আছে অগোছালো অবস্থায়। দল পুনর্গঠনের কথা অনেকদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এতই মন্থর যে কবে নাগাদ সেটা শেষ হবে তা পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। বলা হয়ে থাকে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করার আন্দোলন সফল হয়নি বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির ব্যর্থতার জন্য। ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার নেতৃত্বে গঠিত মহানগর কমিটির উদ্যোগহীনতার কারণেই নাকি ঢাকাবাসীকে রাজপথে নামানো যায়নি, আর তার পরিণতিতে সরকার কেবল টিকেই যায়নি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনও সম্পন্ন করতে পেরেছে। দলের ‘ব্যর্থ’ ঢাকা মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করতেও বেগম জিয়ার ছয় মাস লেগে গেল। কিন্তু অনেক হিসাব-নিকাশ, ভাবনা-চিন্তা করে গত ১৮ জুলাই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট যে নতুন মহানগর আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা কি পারবে বেগম জিয়ার আন্দোলনের স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি যেতে? সংবাদপত্রে খবর বের হয়েছে, খোদ আহ্বায়ক সাহেবই নাকি নতুন কমিটি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সাদেক হোসেন খোকা নিজেও নতুন কমিটিতে উপদেষ্টা হিসেবে আছেন এবং কমিটির বেশিরভাগ সদস্য নাকি খোকা সাহেবের অনুগত! তো! কমিটি ঘোষণার পর কোথায় উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সবার মাঠে নামার কথা, সেখানে মান-অভিমান ভাঙাতেই নাকি সময় চলে যাচ্ছে। কমিটি নিয়ে এ ধরনের অম্ল-মধুর খবর যখন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, তখন মানুষ কি খুব উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হচ্ছে এই কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য? বিএনপির ভেতরে যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ চলছে তা কি সহজে নিরসন হওয়ার মতো? যদি সহজেই মিটমাট করে ফেলা যায়, তাহলে এগুলো দিনের পর দিন জিইয়ে রাখা হচ্ছে কেন? দলের সাংগঠনিক অবস্থা যখন ‘থোড় বড়ি খাড়া-খাড়া বড়ি থোড়’, তখন যদি সরকার পতনের ‘কঠোর’ আন্দোলনের ডাক দেয়া হয় তাহলে সেটা কি দেশের মানুষকে আশাবাদী করে তুলবে; নাকি বেগম জিয়ার ঈদের পরের আন্দোলন রাজনৈতিক মহলে একটি নতুন তামাশা হিসেবেই গণ্য হবে? আর যাই হোক, বিএনপি নেতৃত্বের কাছে মানুষ এখন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণই প্রত্যাশা করে। বেগম জিয়া পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব গেছেন। সেখানে তার সঙ্গে পুত্র তারেক রহমানের দেখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর মা ও ছেলে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সামনা-সামনি কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। বেগম জিয়া এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ছেলের মতামতকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন বলে শোনা যায়। দলের জন্য তারেকের মতামত কতটা ফলপ্রদ হচ্ছে সে প্রশ্ন অবশ্য রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমান লণ্ডনে বসে যেসব বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলো দলকে কতটুকু উপকৃত করেছে সে প্রশ্নও সব মহলেই আছে। তারপরও দলের দুই নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারেক রহমানের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেই নাকি দেশে ফিরে বেগম জিয়া আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। কেমন হবে সেই আন্দোলনের কর্মসূচি? সহিংস হরতাল-অবরোধ থাকবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কর্মসূচি? এগুলো এখনও অস্পষ্ট আছে। তবে বলা হচ্ছে, আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়া হবে; কিন্তু সরকার যদি বাধা দেয়, তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। সরকারি বাধার মুখে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি-সামর্থ্য বিএনপির কি আছে? সরকারের হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত বিএনপি কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা তৈরির আগে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের হঠকারিতায় যাবে না বলেই রাজনীতি সচেতন মহলের বিশ্বাস। বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির নতুন আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস মনে করছেন, তার নেতৃত্বে দলের নতুন কমিটি ঘোষিত হওয়ায় সরকার ভয় পেয়ে গেছে। সেজন্য সরকারকে অভয় দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভয় পাবেন না। আন্দোলন হবে অহিংস। তবে আমাদের অহিংস আন্দোলনে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালাবেন না।’ সরকার কি আসলেই ভয় পেয়েছে? মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মহানগর কমিটি আন্দোলনের মাঠে নামলেই সেটা বোঝা যাবে। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে শোনা গেছে, বিএনপি নেতাদের আষাঢ়ে তর্জন-গর্জনে তারা মোটেও বিচলিত নন। সরকার ‘ভয়’ পেয়েছে মনে করে বিএনপি নেতারা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে থাকুন, তবে অচিরেই তারা হয়তো নিজেদের অদূরদর্শিতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন। কারণ সাধারণ মানুষ এখন আর নতুন করে দেশের মধ্যে অশান্তি দেখতে চায় না। আন্দোলনের নামে বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াত দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, সেটা আবার ফিরে আসুক, মানুষ কোনোভাবেই তা চায় না। তারপরও যদি বিএনপি মাঠ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে পথে নামে তাহলে সরকার তা অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখবে তেমন দুর্বল অবস্থা সম্ভবত সরকারের এখনও হয়নি। একটি প্রবাদ বাক্য আছে, যে যতো নত, সে ততো উন্নত। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের রাজনীতিতে নত হওয়ার ঔদার্য কারো নেই। লেখক :সাংবাদিক, কলাম লেখক bibhu54@yahoo.com