[ রা জ নী তি ]

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঈদ-উপহার

ঈদ আসে খুশির বার্তা নিয়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই দেশে ঈদ এখন সার্বজনীন উত্সব। এই উত্সবের জন্য সারাবছরের অপেক্ষা। বিশেষ করে রমজানের ঈদ। টানা একমাস সিয়াম সাধনার পর যখন ঈদ আসে তখন খুশির তীব্রতাও অনেক বেশি অনুভূত হয়। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে রমযান আসে রহমত, নাজাত এবং মাগফিরাতের অপার সুযোগ নিয়ে। আমরা দেখি অসত্ মুনাফাখোরদের অবাধ দৌরাত্ম্য। গত কয়েক বছর যাবত্ ঈদ কেবল খুশি কিংবা আনন্দের বার্তা নয়, আসে আতঙ্ক নিয়ে। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে অনেকেরই ঘরে ফেরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যের হবে না তা মোটামুটি সবাই মেনে নিয়েছে। ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, সুদীর্ঘ জানজট, লঞ্চ-ট্রেনে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইসহ সীমাহীন দুর্ভোগ নিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছে ঈদের নামাজ পড়তে পারলেই খুশি। ঈদে নতুন আতঙ্কের নাম আন্দোলন। আন্দোলন-হরতাল আতঙ্কে গতবছর শেষ মুহূর্তে অনেকে গ্রামে গিয়ে প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করার কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন। এ বছরও ঈদের পরেই আন্দোলন গড়ে তোলার সানাই বাজতে শুরু করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রায় প্রতিদিন দলমত নির্বিশেষে সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। আমরা অশেষ আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করছি। আন্দোলনের নামে ২০১৩ সালের ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি না হয়! ‘ঈদের পরে সরকার পতনের কঠোর আন্দোলন’ ঘোষণাটি বিএনপির পক্ষ থেকে ২০১২ সাল থেকে নিয়মিতই প্রদান করা হচ্ছে। ঈদ আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর জন্য এই আতঙ্কজনক উপহারটি মেলে ধরেন! ২০১৩ সালে ঈদের খুব কাছাকাছি সময়ে দেশবাসীকে হরতালের মত বিধ্বংসী কর্মসূচি হজম করতে হয়েছে। ‘ঈদোত্তর আন্দোলনে’ অর্জন যেমনই হোক, বহু মানুষের আনন্দ মাটি হয়েছে! আন্দোলনের ঘোষণা বা হুমকির জন্য ঈদকে কেন বেছে নেয়া হয় তা বোধগম্য নয়। ঈদের পরে এরূপ ঘোষণা দিলে কী ক্ষতি হতো তা বুঝার মত বিদ্যাবুদ্ধি আমার মত রাজনৈতিক মূর্খের নেই। গত দুই দশকে বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিক ইফতার’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রমযান মাসে ইফতারের মধ্যদিয়েই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ বছর বিএনপি সারাদেশে চার হাজারের বেশি ইফতার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জামায়াতের পরিকল্পনা দেড় লাখ। কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি ছাড়াও ১৯ দল ও সমমনা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রায় প্রতিদিনই ইফতার কর্মসূচি চলছে। বেগম জিয়া এসব কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে ‘ডান-বাম, ছোট-বড় সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে’ ঈদের পরে সরকার পতনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য তিনি দেশের পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে শরিক হওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দু’বারের বিরোধীদলীয় নেতা যখন দেশের ‘মহাসঙ্কটে’ এরূপ আহ্বান জানান নিশ্চয় তার একটি তাত্পর্য আছে। কিন্তু গত তিন বছরে তিনি এতবার সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন যে বিষয়টি এখন খেলো হয়ে গেছে! গত অক্টোবর থেকে সরকারকে তারা ‘অবৈধ’ বলে আসছেন। অপব্যবহারের ফলে ‘অবৈধ সরকার’ কথাটিও ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। বিএনপি নেত্রী দাবি করেছেন, দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ তাদের সাথে আছেন। বেশ ভাল কথা। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে দেড় মাসের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। অথচ বিএনপি-জামায়াত ৯৫ শতাংশ মানুষকে সাথে নিয়েও নির্বাচন ঠেকাতে পারল না! অর্ধ শতাধিক বিদ্যালয় জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্যেই তাদের সাফল্য (?) সীমাবদ্ধ থাকল। মুখে যতই বলুক, সরকার পতনের ব্যাপারে বিএনপির নেতৃবৃন্দও সন্দিহান বলেই সবার ধারণা। ফাঁকটা ৯৫ শতাংশে (!) নাকি সংগঠনের শীর্ষে তা বিএনপিই ভাল জানে। তবে বিএনপির শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেরই অভিমত, বেগম জিয়ার এ মূহূর্তে সরকার অপেক্ষা নিজ সংগঠনে বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত। গত সাড়ে চার বছর ধরে দলের কাউন্সিল হয় না। প্রায় দু’বছর যাবত্ মহাসচিব ভারপ্রাপ্ত। এমতাবস্থায় আন্দোলন কিংবা নির্বাচন— দল কতটা সুবিধা করতে পারবে তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। বিএনপির কিছু রাজনৈতিক দৈন্য রয়েছে। তাদের এ দৈন্য থেকেও বের হতে হবে। আজন্ম ভারতবিরোধিতা থেকে হঠাত্ই তাদের ভারতপ্রীতি চোখে পড়ার মত। আসলে ভারত-প্রীতি নয়, বিজেপি-প্রীতি। বিজেপি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপির উল্লাস ও অতি উত্সাহ অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু ও নির্লজ্জ বলেই মনে হয়েছিল। বিএনপির কোনো কোনো নেতা হয়ত ভেবেছিলেন, বিজেপি আসার তিনমাসের মধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পত্রপাঠ বিদায়। মোদি সরকার হাতে ধরে বিএনপিকে বাংলার মসনদে বসিয়ে দিবে! কিন্তু সুষমা স্বরাজের সফরের পর তাদের চৈতন্য ফিরে পাওয়ার কথা। অনেক হ্যাংলামি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত্ করেছেন তা রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিবেচনায় খুব শোভন হয়নি, সম্মানের তো নয়ই। অথচ ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতিকেই তিনি অপমান করেছিলেন। এপয়েন্টমেন্ট নিয়েও দেখা করেননি। বিএনপি বিজেপিতে যতই আস্থা রাখুক, মোদি সরকার কিন্তু সুস্পষ্ট বার্তাই দিয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের সাথে কাজ করতে তারা আন্তরিক। অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে ভারত তার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারত তত্পরতা দেখাচ্ছে। আমার ধারণা, ভারত আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাঁটাতারের বেড়া দিলে দু’দেশের জন্যই মঙ্গলজনক। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির ৬৬ বছর পর চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বাংলাদেশ প্রায় ৭০ বিঘা জমির অধিকার গ্রহণ করেছে। ভারতের দাবিকৃত সমুদ্রের বিশাল এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারত এগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে। এটি কেবল বর্তমান সরকার নয়, দেশের জন্যও স্বস্তিদায়ক। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের এই বন্ধুসুলভ আচরণ ও মনোভাব তাদের নিজেদের স্বার্থে। বিচ্ছিন্নতাবাদ, উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ নির্মূল এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি আওয়ামী লীগ যে আন্তরিকতা প্রমাণ করতে পেরেছে বিএনপি সে তুলনায় যোজন যোজন দূরে। বরং ক্ষমতায় থাকতে বেগম জিয়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘স্বাধীনতা যোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাদেরকে নানারকম পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানেরও অভিযোগ আছে। খালেদা জিয়া তাঁর সাক্ষাত্কারে যতই অস্বীকার করুন, ভারত সবকিছু ভুলে তার সব কথা বিশ্বাস করবে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে আমলাদের প্রভাব সর্বজনস্বীকৃত। তাই কংগ্রেসের জায়গায় বিজেপি এলেই সব গণেশ উল্টে যাবে তা ভাববার কোনো কারণ নেই। ফলে মোদি জোয়ারে বিএনপির সিকে কতটা ছিঁড়বে তা ভবিষ্যতের উপর ছেড়ে দেয়াই ভাল। গত তিন বছরে নিরলস চেষ্টা করেও বিএনপি আন্দোলনের কোনো ফসলই ঘরে তুলতে পারেনি। আগুন ও পেট্রোল বোমায় নিরীহ মানুষ হত্যা, রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত সম্পদের অবর্ণনীয় ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তর্জন-গর্জনই সার হয়েছে। এর জন্য যতটা না সাংগঠনিক দুর্বলতা তার চেয়ে বেশি দায়ী ভুল রাজনীতি। যুদ্ধাপরাধী বিষয়ে বিএনপি শুরু থেকেই দেশের জনমতবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। জামায়াতে বিলীন হতে হতে দলটির আজ আর কোনো স্বকীয়তা লক্ষ্য করা যায় না। শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ভার বিএনপিকে আরো ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। অথচ দলটির বিশাল জনপ্রিয়তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। নানা প্রতিকূলতায়ও তারা যেসব স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে তার একটি বড় অংশে বিজয়ী হয়েছে। একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায় কেবল আওয়ামী লীগের নয়, সমানভাবে বিএনপিরও। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ফোন, ঐকমত্যের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বসহ অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ সবকিছুকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এতে তাদের অর্জন কতখানি তা হিসেব করে দেখা উচিত। যারা বিএনপিকে নির্বাচন বর্জনের কুমন্ত্রণা দিয়েছিল তারা দলের কতটা মঙ্গল সাধন করেছেন তাও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ও তার মিত্ররা মনে করেছিল, একটি দুর্বল, রুগ্ন ও অপুষ্ট সরকার তৈরি হবে। কেউ তার পাশে থাকবে না। ছোটখাটো ধাক্কা দিলেই এটি পড়ে যাবে। তাদের ভাবনাটি যে ঠিক নয় তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। সরকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি নিয়েই কাজ করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান ও চীন সফর, ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং সবশেষ সমুদ্র বিরোধে বাংলাদেশের জয়সূচক নিষ্পত্তি সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছে। দেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, খাদ্য, কৃষি, শিক্ষা ও আইসিটির সাফল্য সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী করছে, করবে। সরকার যদি সুশাসনে মনোযোগী হয়, দুর্নীতি ও লুটপাটের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে পারে তবে আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে কতটুকু সম্পৃক্ত করা যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, রায় ঘোষণা ও কার্যকরের ব্যাপারে সরকার আন্তরিকভাবে তত্পর হলেও জনমত সরকারের পক্ষে যাবে। ভারতীয় পত্রিকাকে বেগম জিয়া বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখানেই ভাল আছে। তারা কেন ভারতে অনুপ্রবেশ করবে’? সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য এবং অবস্থানকে সাধুবাদ জানাই। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু খুব খারাপ নেই। তাই সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসে জল-স্থল মিলে দেশের মানচিত্র পূর্ণতা লাভ করল। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বকে সকৃতজ্ঞ অভিবাদন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতেও সরকারের নানা প্রশংসনীয় উদ্যোগ রয়েছে। আর্থ-সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে নৈরাজ্য দেশের অর্থনৈতিক সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বেসিক ব্যাংকে গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি ঘটেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮৪৪ শতাংশ। এই ব্যাপারে সতর্ক না হলে চড়া মূল্য দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে সামান্যতম শৈথিল্য বা অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ বিষয়টি রাজনীতির নয়, এখানে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। জামায়াত-হেফাজত কখনো আওয়ামী লীগের প্রতি ন্যূনতম নমনীয়তা দেখাবে না। সুযোগমত মরণকামড় মারবেই। এসব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি সম্মিলন ঘটাতে হবে উন্নয়ন ও সুশাসনের। বেগম জিয়ার ‘ঈদ উপহার’ কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে সরকারের আগামীদিনের কার্যকলাপের উপর। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় । ihusain1979@gmail.com।