ঈদে বাড়ি যাবো কিভাবে
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৪, ২১:৫৩
দেশের নামকরা একজন লেখক ফোন করে বললেন, ঈদের আগের তিনদিনের মধ্যে যেকোন সময়ে তার চট্টগ্রামে যাবার দুটি ট্রেনের টিকিট দরকার। সাংবাদিক হলে ‘সব কাজের কাজি’ এমন ধারণা থেকেই সম্ভবত তাঁর এই ফোন। অবশ্য দোষ তাঁর নয়। কারণ এর আগেও একবার একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ধরে তাঁর ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।
আবার সেই সরকারি কর্মকর্তাকে অনুরোধ করতে হবে ভেবে বললাম, এবার বাসেই চলে যান না। ভাল বাস তো রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে। ভদ্রলোক কিছুটা যেন ক্ষিপ্ত হয়েই বললেন, ‘বাড়ি না গেলেও বাসে যাবো না। ছেলেপুলে নিয়ে রাস্তার গর্তে আটকে থাকবো নাকি? তবে ট্রেনের টিকিট না পেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হয়ত বাসেই যেতে হবে। কিন্তু রাস্তার যে চিত্র তাতে সত্যি ভয় হয়।’ কথা শেষ হবার আগে আবার বললেন, দেখেন না কিছু পাওয়া যায় কিনা?
ভদ্রলোককে কিভাবে একটু সহযোগিতা করা যায় ভাবছিলাম। কারণ ইতিমধ্যে পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’-এরই প্রধান শিরোনাম হয়েছে ‘কোটায় খেয়ে ফেলেছে রেলের অগ্রিম টিকিট’। চাহিদার তুলনায় টিকিট কম। ফলে রাতভর লম্বা লাইনে অপেক্ষার পরও যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না। ঈদের আগে প্রতিদিন কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ১৮ হাজার টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু এ টিকিটের প্রায় অর্ধেকই ভিআইপিদের নামে আর ট্রেনের কর্মকর্তাদের নামে তুলে নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
এসব হতাশার খবরের পরও দুটো টিকিটের জন্য ফোন করলাম সেই কর্মকর্তাকে। কিন্তু তিনি জানালেন তাঁর অসহায়ত্বের খবর। তাঁর আত্মীয়ের জন্য একটি টিকিট চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। সব টিকিট নাকি বিক্রি হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রাস্তাঘাটের দুর্দশার চিত্র দেখে মানুষ এবার বাসে যাওয়ার কথা কম ভাবছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কিংবা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে মানুষ ভয়ই পেয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার জন্য তাই নির্ভর করতে চাইছে ট্রেনের উপর। এখন সেই ট্রেনেরও টিকিট নেই। তাহলে সে বাড়ি যাবে কিভাবে। যারা লঞ্চে বাড়ি ফিরবেন তাদের জন্য কোন সুসংবাদ নেই। বরং আছে দু:সংবাদ। কারণ পুরনো বাতিল ঘোষিত লঞ্চগুলো আবার রং লাগিয়ে ঘাটে ভেড়ানো হচ্ছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে সামান্যও ভাবছেন না কেউ। ব্যবসাই বড় হয়ে উঠছে মানুষের জীবনের চেয়ে।
রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখতে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এখন ছুটছেন প্রতিদিন। এক মহাসড়ক থেকে আরেক মহাসড়কের বেহাল অবস্থা দেখছেন। নির্দেশ দিচ্ছেন দ্রুততম সময়ে রাস্তা মেরামতের। মন্ত্রীর নির্দেশমত ইটা, খোয়া, বালু দিয়ে কিছু গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আবার তা ভেঙ্গে যাচ্ছে। আবার খানাখন্দে পরিণত হচ্ছে রাস্তাগুলো। মন্ত্রী সচল থাকলেও অচলই থাকছে রাস্তা। কারণ চাইলেই এক বছরের কাজ এক সপ্তাহে কোন জাদুমন্ত্র দিয়ে করা সম্ভব নয়। তার মধ্যে সময়টা যদি বর্ষাকাল হয়। এটা অন্য কেউ না বুঝলেও সড়ক বিভাগের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকজন ঠিকই বোঝে। কারণ বৃষ্টিতে আর যাই হোক রাস্তা সংস্কারের অন্যতম প্রধান উপকরণ বিটুমিন দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না। ইটা-আধলা ফেলে গর্ত ভরাট করে হাজারো যানবাহনের চাপ কিভাবে সামলাবে মহাসড়কগুলো।
আর মাত্র চার অথবা পাঁচদিন পরেই ঈদ। এ সময় স্বজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে মানুষ ছুটবে। ইতিমধ্যেই বাড়ি ফেরা শুরু হয়ে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাড়ি ফেরার গতি আরও বাড়বে। পরশু আরও। এটাই স্বাভাবিক।
প্রতিবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি মানুষ যাবে ঢাকা থেকে। ফলে বেশি চাপ ঢাকার ট্রেন-বাস-লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে। ঈদের সময় রাজধানী থেকেই প্রায় ৪০ লাখ লোক বেরিয়ে পড়েন। ছুটে যান সারাদেশে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা তাদের স্বজনদের কাছে। একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে।
ঈদের আনন্দযজ্ঞে সবাই মিলিত হতে চান পরিবারের সকলকে নিয়ে। আত্মীয় স্বজন-বন্ধুবান্ধবও যুক্ত হয় তাতে। আর এজন্য প্রতিবার ঈদ এলেই মানুষ তার শেকড়ের টানে ছুটে গ্রামের বাড়ির দিকে।
কিন্তু এবার মানুষ ঠিকমতো বাড়ি যেতে পারবেন তো? এ প্রশ্নের জবাব কি আছে কারো কাছে।
লেখক: সাংবাদিক
saikatasis@yahoo.com