[স মা জ]

আনন্দ আছে আনন্দ নেই

যদিও চমকে যাওয়ার মত নতুন কোনো কথা নয়—তবু সচেতন আধুনিক মনস্ক মানুষের কাছে অনেক সময় অস্বস্তি ও বিব্রতকর আমাদের রাজনীতি অঞ্চলের পক্ষ-প্রতিপক্ষ নেতা-নেত্রীদের শব্দবাণ। রাজনীতিকদের চর্চায় থাকা রাজনৈতিক সংস্কৃতি কবে যে আধুনিক আর মার্জিত হবে তা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো জানার উপায় নেই। পবিত্র ঈদের দিনেও কণ্ঠশীলনে কোনো মাত্রাজ্ঞান থাকে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঈদের দিন নাগরিক শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বলেছেন জিনিসপত্রের দাম সহনশীল থাকায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ছিল। আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়ায় সড়কপথে বিড়ম্বনা কম হয়েছে ঘরে ফেরা মানুষের। এসব কারণে এবার মানুষ অনেক বেশি আনন্দের সাথে ঈদ উদ্যাপন করতে পেরেছে। এই বক্তব্য শুনে এদেশের কৌতুক অন্বেষী মানুষ চোখ-কান খাঁড়া করে রেখেছে চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রত্যুত্তরে কি শব্দ প্রয়োগ করেন তা শোনা ও দেখার জন্য। বরাবরের মতই উত্তর পেতে বিলম্ব হলো না। বেগম জিয়া ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়ে যথারীতি বললেন, এবার ঈদে মানুষের মনে কোনো আনন্দ নেই। অপূর্ণ গণতন্ত্রের এই দেশে আমাদের মেধাবী রাজনীতিকরা সব সময় জনগণের নাম ভাঙ্গিয়ে চলতে পছন্দ করেন। যেমন সরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা বলবেন জনগণ অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না আবার বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা বলবেন জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। বিএনপি নেতা-নেত্রীরা বলছেন, ঈদের পরে জনগণকে সাথে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করা হবে। আবার সরকার পক্ষ বলছে, জনগণকে সাথে নিয়ে বিএনপির আন্দোলন প্রতিহত করা হবে। এসব শুনে যার যার দলের অন্ধ দলীয় ‘জনগণ’ হয়তো হাততালি দেবে তবে মুক্তচিন্তার এবং দলবৃত্তের বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করবে বক্তব্যের তাত্পর্য অনুধাবন করার জন্য। বোঝা যায় এসব বলে আন্দোলনকারী পক্ষ এবং আন্দোলন প্রতিহতকারী পক্ষ যার যার অনুকূলে যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। আমরা ভেবে পাই না এই ডিজিটাল যুগে ঈদে মানুষ সার্বিকভাবে আনন্দে অবগাহন করেছে অথবা নিরানন্দে মুহ্যমান ছিল—এসব বায়বীয় কথা বলে আমাদের রাজনীতির অভিভাবকরা কী অর্জন করতে চাইছেন? নাকি এক পক্ষের বক্তব্যের বিপরীতে আরেক পক্ষকে কিছু বলতেই হবে তেমন ফর্মূলায়ই আটকে গেছেন! না হলে ভাবার অবকাশ ছিল যে ঈদের দিনটি তখনো শেষ হয়নি। মানুষের স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার সুযোগ তখনো তৈরি হয়নি। তাই বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর পরস্পর বিরোধী বাণীতে মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। প্রত্যেকেই তাদের ঈদ উদযাপনের আনন্দ বা নিরানন্দের হিসাবটা জানেন। তাই এসব ঢালাও মন্তব্যে কোনো পক্ষেরই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অবকাশ নেই। বরঞ্চ অসংস্কৃত রাজনীতির দীনতা প্রকাশিত হয়েছে মাত্র। কোনো কালেও সমাজের সকল মানুষ একই অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর অভিন্ন অর্থনৈতিক সামর্থ্যে অবস্থান করে না। সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বাস্তবতা হিসেবেই মেনে নিতে হয়। সমাজের সকল মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও এক নয়। খ্রিস্টপূর্ব তিন শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপি পাওয়া গেছে মহাস্থানগড়ের প্রত্ন খননে। সেখানে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে অর্থ ও শস্য অনুদান দিতে স্থানীয় প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বলা হয়েছে এসব ঋণ হিসেবে দিতে হবে। সুদিন আসলে তাদের কাছ থেকে এই ঋণ ফেরত নিতে হবে। সমাজের সকল মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য সমান থাকে না বলেই রাষ্ট্রকে আশ্রয় দিতে হয়। সুলতানি বাংলায় সুখ সম্পদে পূর্ণ ঐশ্বর্যশালী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এদেশকে। মরোক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণীতে সোনারগাঁওয়ের বাজারের বর্ণনা রয়েছে। তাঁর দেখা পৃথিবীতে সবচেয়ে সস্তা ছিল এদেশের পণ্য। তারপরেও ইবনে বতুতা সোনারগাঁও বাজারে গৃহকর্মের জন্য দাস-দাসী কেনা-বেচা করতে দেখেছেন। সুতরাং বোঝা যায় সুলতানি বাংলার সুখ সম্পদের অংশীদার দেশের সকল শ্রেণির মানুষ সমানভাবে হতে পারেনি। এটিই আসলে বাস্তবতা। ঊনিশ শতকের ঈদ উত্সবের কথায় আসি। নথিতে দেখা যায় নায়েবে নাযিমদের তত্ত্বাবধানে ঢাকায় যেভাবে জাঁকালো ঈদ উত্সব উদ্যাপিত হতো তার সাথে সারা দেশের চিত্র অভিন্ন ছিল না। সারা বছরে ছেলে-মেয়েরা ঈদ এলে একটি নতুন পোশাক পাবে বলে অপেক্ষা করতো। তাও সকল সময় সকল বাবা-মা সংস্থান করতে পারতেন না। ঈদ উল আযহাতে হাতে গোণা অল্প কয়েকজন এককভাবে একটি গরু কোরবানি দিতে পারতেন। সাতভাগে কোরবানি দেয়ার রেওয়াজই বেশি ছিল। অনেক কৃষক অকেজো হালের বলদকে কোরবানি দিতেন। একটি বড় সংখ্যক মানুষ ছাগল কোরবানি দিতেন। তখন ৫০ থেকে ১০০ টাকার ভেতর একটি ছাগল পাওয়া যেতো। আবার সমাজের একটি অংশ কোরবানি দেয়ার সামর্থ্যই রাখতেন না। তাই ঈদে মানুষ কতটা আনন্দে বা নিরানন্দে কাটিয়েছে সে বিতর্কের অবতারণা করাটা নিরর্থক। তাছাড়া ঈদ আনন্দ অনেকটা আপেক্ষিক বিষয়ও। অর্থ মূল্যে বা সামাজিক সংকটের প্রশ্ন সামনে এনে একে মূল্যায়ন করা যায় না। কিন্তু কথা হচ্ছে আমাদের রাজনীতিকগণ যে জনগণের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করেন সেই জনগণের বোধের ওপর মোটেই তাঁরা আস্থা রাখতে চান না। নাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যাবে বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যে কী তা পাওয়া যাবে? বাস্তব অবস্থার আপডেট সারাক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র বিশাল অংকের ঈদের বেচা-কেনা হয়েছে এবার। তাহলে প্রশ্ন থাকছে এসব কেনাকাটা করলো কারা? বিগত ঈদ যাত্রার তুলনায় এবার সড়ক, রেল ও নৌপথে মানুষের ভোগান্তি অনেক কম ছিল। এর প্রশংসা করলে বিরোধী দল ছোট হয়ে যেতো তা আমাদের মনে হয় না। বরঞ্চ মরচে ধরা রাজনীতির তুলনায় সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক বোধ অনেক বেশি শাণিত বলে এই সত্য প্রকাশের উদারতা দেখাতে পারলে বিরোধী দলের প্রতি মানুষের সহানুভূতিই বাড়াতো। এবার দেখলাম বিভিন্ন টিভি চ্যানেল শুধু ঢাকা নয় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ঈদ উদ্যাপনের প্রামাণ্য চিত্র দেখাচ্ছিল। সমস্ত বিনোদন কেন্দ্রে মানুষের ঢল নেমেছিল। সকল বয়সের মানুষ নিজেদের সহজাত আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে। তাহলে প্রশ্ন থাকছে বেগম খালেদা জিয়া যখন বলছেন এবার ঈদে মানুষের মনে কোনো আনন্দ নেই একে দেশের মানুষ কীভাবে নেবে? আমাদের রাজনীতির সকল পক্ষই কোথায় থামতে হবে সে হিসেবটা কম রাখেন। না হলে কথা প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেন বলবেন এতো সাফল্যের মধ্যে এক আধটা খুন হলে এ নিয়ে এতো মাতামাতি কেন! মন্ত্রীদের কেউ কেউ নারায়ণগঞ্জের সাত খুন নিয়ে মিডিয়ার এতো প্রচারণাকে ভালো চোখে দেখছেন না। আমরা আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে, রাষ্ট্র যখন এক খুন আর পঞ্চাশ খুনকে আলাদা গুরুত্বে দেখতে চায় তখন সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুদূর পরাহত হয়। ঈদের আনন্দের মধ্যেও যে বেদনা নেই তাতো বলা যাবে না। ঈদের দিন একটি টিভি চ্যানেলের রিপোর্ট দেখে আমার মন বেদনার্ত হয়ে উঠেছিল। আমার ধারণা অনেক দর্শকের বুকও ভেঙ্গে গিয়েছিল। দেখাচ্ছিল মহাখালির একদিকে বিলাসবহুল বাড়ির সারি আর অন্যদিকে বস্তিবাসীর নিরানন্দের ঈদ। বস্তির একটি ঘরের চিত্র টিভির পর্দায় ভেসে উঠলো। ঘরের কর্তা কোনো এক চিশতি। সম্ভবত তার পাঁচটি ছোট ছোট মেয়ে। আমি লক্ষ্য করলাম সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বুকের ভেতর থেকে কান্না বেরিয়ে এলো চিশতি সাহেবের। উত্তাল সমুদ্রে হালভাঙ্গা নাবিকের মত মনে হলো তাকে। অসহায় কণ্ঠে বললেন বাচ্চাদের কিছুই কিনে দিতে পারিনি। দশ-বারো বছরের বড় মেয়েটির পরনে লাল রঙের ছাপা প্রায় নতুন একটি জামা। জানালো প্রতিবেশী একজন একদিনের জন্য ধার দিয়েছে ওকে। বাকি ছোট মেয়েরা উদোম গায়ে করুণ মুখে ঘুরছে। সংবাদিক জানালেন বস্তির বেশিরভাগ ঘরের চিত্রই অভিন্ন। এই দৃশ্য দেখে বলতে ইচ্ছে হলো দ্রব্যমূল্য ‘সহনযোগ্য’ পর্যায়ে রাখা আর ঈদে যোগাযোগ ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত সচল রেখে সরকারপক্ষের আত্মপ্রসাদ লাভ করার খুব অবকাশ নেই। এই প্রান্তিক মানুষদের কাছে সামান্য ঈদের আনন্দ পৌঁছে দেয়ার সুযোগ কী সরকার পক্ষের ছিল না? সরকারের একটি জাকাত তহবিল আছে বলেও তো জানি। প্রতি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সহযোগিতার হাত বাড়ালে চিশতি সাহেবদের অসহায় কান্না দেখতে হতো না। শুধু সরকার কেন সামর্থ্যবান নগরবাসীর কী কোনো কর্তব্য ছিল না। মহাখালি, বনানী, গুলশানের বড় বাড়িগুলোর মানুষের যখন ঈদের বাজেট লক্ষ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায় তখন এসব প্রাসাদবাসীর পদতলে উদোম গায়ে গতানুগতিক খাবারে নিরানন্দ দিন কাটায় প্রান্তিক মানুষ। সরকারের পাশাপাশি এসব সামর্থ্যবানরা ঈদ বাজেট থেকে অন্তত দশ শতাংশ কৃচ্ছ্রতা সাধন করে তা থেকে যদি কয়েকটি নতুন পোশাক আর সামান্য সেমাই, চিনি, চাল, মাংস এদের উপহার দিতেন তাহলে সকলের জন্য ঈদের আনন্দ অনেক বেশি আনন্দময় হতো! ঈদ-উত্তর এই সময়ে কৃতিত্ব প্রচারে সরকার পক্ষ, সমালোচনা বিলাসী বিরোধী পক্ষ সকলকে আমরা অনুরোধ করবো বস্তাপচা ব্লে¬ম গেমের রাজনীতিতে না থেকে জনকল্যাণে কার কী কর্তব্য সেই সত্যে যাতে মনোনিবেশ করেন। আর সামর্থ্যবানদের কাছে অনুরোধ থাকবে যার যার এলাকার প্রকৃত দুঃখিদের খুঁজে বের করে এক একজন দু’চার ঘরের দায়িত্ব নিয়ে যতটা সম্ভব ঈদের আনন্দের ভাগ দেবেন। ঈদ উত্সব সর্বজনীন—ঈদের আনন্দও যাতে সর্বজনের কাছে পৌঁছে যায় আমরা সেই প্রত্যাশাই করি। লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। shahnawaz7b.gmail.com