যুদ্ধ

গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসনের শেষ কোথায়

তি ন কিশোর অপহরণের অজুহাতে ৭ জুলাই থেকে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের উপর operation protective edge নামে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে একে মানবাধিকার বা বিশ্ববিবেক কোনটাই সমর্থন করার কথা নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে , প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের পরেও ইহুদীবাদী এ রাষ্ট্রটি বিশ্বের অনেক দেশের প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন পাচ্ছে। সমর্থন পাচ্ছে বলেই পবিত্র রমজান মাসে; এমনকি ঈদের দিনেও একের পর এক হামলা চালিয়ে ইসরাইল প্রায় দেড় সহস্র ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। আহত করেছে কয়েক হাজার। বাড়ি ঘরসহ সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞ চলছে অবিরাম। তাদের হামলা থেকে জাতিসংঘ কেন্দ্রগুলোও বাদ যায়নি। ১৯১৭ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরের ঘোষণার মাধ্যমে তিলে তিলে গড়ে উঠা ইহুদী রাষ্ট্রটি মূলত: বিশ্বজায়নিষ্ট আন্দোলনের ফসল। সারা বিশ্বের জায়নিষ্টরা এরও অনেক পূর্ব থেকে কিভাবে দরিদ্র আরব ফিলিস্তিনিদের জমি বেশী দামে ক্রয় করবে এবং এর টাকা কোথা থেকে আসবে এর পরিকল্পনা আঁটে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তত্কালীন মুসলমানেরা জায়নিষ্টদের এ পরিকল্পনা না বুঝে চড়ামূল্যে জমি বিক্রি শুরু করে। ক্রয়কৃত জমিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদীদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসিত করা হয়। অত্যন্ত কৌশলে শক্তিশালী হয়ে উঠা ইহুদী বসতি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা পর্যন্ত আরবের জনগোষ্ঠী তেমন আমলে আনেনি। যখন থেকে আমলে আনা শুরু করল ততদিনে ইসরাইল রাজনীতিতে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বর্তমানে ইহুদীরা বিশ্বস্বীকৃত একটি রাষ্ট্রের কর্ণধার। আরবদের প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, ওআইসির গঠন, পিএলও-র সশস্ত্র আন্দোলন ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে বিশ্বে জনমত গঠনে সহায়ক হয়েছে সত্যি, ততদিনে বিশ্বের বড়বড় মোড়লদের সাহায্যে ইসরাইলও শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, এক ইসরাইলে যত বিজ্ঞানী কর্মরত সারা মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে এত বিজ্ঞানী নেই। ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্সে প্রবাসী ফিলিস্তিনী প্রতিনিধিদের অধিবেশনে হঠাত্ করে ইসরাইলীদের দাবির অনুকূলে ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র সংগ্রামের সমাপ্তি এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ইসরাইল রাষ্ট্রের ভিতকে আরও শক্তিশালী করে তুলে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে আরাফাত কর্তৃক এসব সিদ্ধান্ত সে সময়ে প্রশংসিত হলেও ইসরাইলের কাছে তা কমই গুরুত্ব পেয়েছে। ইসরাইল রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব মেনে নেয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফিলিস্তিনিদের এতবড় পরিবর্তনকে তেলআবীবের বিশ্বস্ততায় নিয়ে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বেই প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়ে ফেলা উচিত ছিল। কিন্তু ইসরাইল তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অস্ত্র আর গোলাবারুদের ভাষার কাছে সকল মানবিক আবেদন ও বিবেকের আকুতি মার খেয়েছে বারংবার। এখনো খেয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। তারা অবশ্য সকল অভিযানের পিছনে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে এনেছে বারংবার। ইসরাইলের এ আচরণের ব্যাপারে মার্কিন কলামিষ্ট নোয়াম চমস্কির উক্তি খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, পশ্চিমা বৃহত্ রাষ্ট্রসহ ইউরোপ সমর্থন ও নীরবতা পালন করবে ততদিন গাজায় ইসরাইলের এ আগ্রাসন চলবে। ইসরাইল তাদেরই সৃষ্টি এবং এর লাগাম তাদেরকেই টেনে ধরতে হবে।’ ইহুদী এক রাব্বী বলেন, ইসরাইল অর্থ প্রতিশ্রুত ভূমি। কেবল গাজা আর পশ্চিম তীর-ই নয় ইরাক ও সিরিয়াও এ প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সকল প্রতিশ্রুত ভূমি উদ্ধার করা ছাড়া আমাদের তথা ইসরাইলের যুদ্ধ থামবে না। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেই ইসরাইলকে ইহুদী রাষ্ট্র বলে স্বীকার করেছেন। ইসরাইলের আগ্রাসী কাজে সাহায্য করছে সারা বিশ্ব থেকে প্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক সাহায্য। ইসরাইলের মূলত তাদের দরকার ফিলিস্তিনি হত্যা এবং এর মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রের তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে বৃহত্ ইসরাইলী রাষ্ট্রের পথ সুগম করা। এ কারণেই শিশু অপহরণ বা রকেট হামলার ঠুনকো অজুহাতে প্রায়শই যুদ্ধ বাধিয়ে শতশত ফিলিস্তিনি নারী-শিশুকে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের যুদ্ধের পর এবার এমন সময়কে এ যুদ্ধের জন্য বেছে নেয়া হয় যখন রমজানের সিয়াম সাধনায় ফিলিস্তিনসহ সারা মুসলিম বিশ্ব মগ্ন। অন্যদিকে ইরানের রুহানির নতুন সরকার ইসরাইল বিরোধিতার চেয়ে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যস্ত, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ আর ইরাকে ইসলামী জঙ্গীদের দাপটের কাছে বাগদাদ সরকারের অনেকটা পলায়নপর অবস্থা। আর মিশরে গণতান্ত্রিক মুরসি সরকারকে হটিয়ে ফাত্তাহ সিসির সামরিক সমর্থিত সরকার ইসরাইলের প্রতি অনেকটাই নমনীয়। আর নখ দন্তহীন আরব লীগের কথা এবং তাদের শক্তিমত্তার অবস্থা ইসরাইলের খুব ভাল করেই জানা। মধ্যপ্রাচ্যের এ জটিল সমীকরণে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের ফাতাহ ও গাজার হামাসের মধ্যে ইতোমধ্যেই যে ঐক্য গড়ে উঠেছে তা বসে দেখার কথা নয় ইসরাইলের। আব্বাস ও খালেদ মিশেলের দুই গ্রুপের ঐক্য ইসরাইলের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে যে কোন সময়, এ চিন্তায় উদ্বিগ্ন কেবল ইসরাইল নয় তাদের সমর্থনকারী বন্ধুরাও। এ জন্যই ঠুনকো অজুহাতে এরূপ হত্যাযজ্ঞের মহোত্সব, যেখানে নারী ও শিশুই বেশী শিকার হচ্ছে তাদের রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসছে না কেন? ফিলিস্তিন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে,২০০০ সাল থেকে ২০১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ইসরাইল ১৫১৩জন শিশুকে হত্যা করেছে,৬০০০ আহত করেছে এবং ৯০০০ অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুকে বন্দী করেছে। যুদ্ধের নামে এভাবে নারী-শিশু ও বেসামরিক লোক হত্যাকে জেনেভা কনভেনশনের ৩৩ নং অনুচ্ছেদেও অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতবড় যুদ্ধাপরাধের ন্যায় ঘটনার প্রতিক্রিয়া পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের মধ্যে হয়েছে বলে মনে হয় না। পশ্চিমাশক্তি কেবল রাসায়নিক অস্ত্রের ধারণা থেকে ইরাকে আক্রমণে দেরী করলো না, সন্ত্রাসী নিধনের নামে এখনো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে সেখানে তাদের প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যানকারী ইসরাইলকে যুদ্ধের নামে একতরফা হত্যাকাণ্ড থেকে নিবৃত করতে পারবে না একথা বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন মানুষের বিশ্বাসে আনতে চায় না। পূর্বতিমুর ও দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করার প্রশ্নে আমেরিকাসহ বিশ্ব শক্তিগুলোর যে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে এর সামান্যটুকু সহানুভূতি ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলী ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে পারতো বলে অনেক বিশ্লেষক তাদের লেখা ও গবেষণায় উল্লেখ করেছেন। বাস্তবতা হলো এ সত্যের কাছে তারা আসছেন না এবং আদৌ আসবেন কিনা এ নিয়ে সন্দেহ আছে। আমরা শান্তিকামী মানুষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইসরাইলী হত্যাযজ্ঞ ও হামাসের রকেট হামলা বন্ধের দাবি জানাই। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি জাতি নিজস্ব অস্তিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করুক, স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হোক, ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতা ফিরে পাক এটা এখন সময়ের দাবি। এ দাবি পূরণে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কার্যকরী ও মুখ্য ভূমিকায় এসে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনীদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হবে।  লেখক :অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক