পোশাক শিল্প

কর্মজীবী মানুষের দক্ষতা ও পরিবেশ

পোশাক নির্মাণ ও রপ্তানি খাতের একটি শিল্প গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কারখানাটির এক হাজার দুইশ শ্রমিক তিন মাসের বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে এমন সময়ে অনশন করেছে যখন দেশবাসি পবিত্র ঈদ উল ফিতর উদযাপন করেছে। আনন্দ উত্সবের ঠিক এ সময়টিতে অনশন, অনশনরত কর্মজীবী মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার মত পর্যায়ে চলে যাওয়া এবং ‘এক সপ্তাহের মধ্যে’ সমস্যা সুরাহার আশ্বাস সবই ঈদের সামাজিক ও আত্মিক তাত্পর্যকে এর অয়োময় আবেগ অনুভূতি ও আনন্দকে বিমলিন বেদনার্ত করে তোলে বৈকি। সদস্য প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীদের বেতন বোনাস পরিশোধের দাবি দোয়া মেটানোর ব্যাপারে বিজিএমইএ স্বপ্রণোদিত হয়ে যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছ তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। গত বৃহস্পতিবার দেশের পোশাক শিল্প মালিকদের এই বৃহত্ সমিতির সহ-সভাপতি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কারখানাটির মালিক জেলখানায় থাকায় এবং ব্যাংক-এর অসহযোগিতার জন্য গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বেতন বোনাস পরিশোধ করা গেলেও এই একটি কারখানার বকেয়া বেতন বোনাস প্রদানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যায়নি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পখাত এই মুহূর্তে বিশেষ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বছরের সাধারণত দুটি সময়ে পোশাক শিল্পখাতে অস্থিরতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মে-জুন-জুলাই যখন বিদেশি বায়াররা বড়দিনের বিপণন উপলক্ষে অর্ডার দিতে আসে, আরেকবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবর যখন বড়দিনের অর্ডার শিপমেন্ট হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উন্নতি চায় না এমন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত থাকলেও এটা ঠিক এসব বিশৃঙ্খলা এই খাতকে এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতকে নানান আঙ্গিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ বারের ঈদের সময় অনশনের এই ঘটনাটি অনিবার্য বেদনার আবহ তৈরি করেছে। এটিকে কেন্দ্র করে কর্মজীবী মানুষের মানবিক উন্নয়নের প্রসঙ্গটি এসেই যায়। আমাদের পোশাক শিল্পের কর্মজীবীদের মানবিক উন্নয়নের অনেকগুলো সমস্যা বা বিষয় রয়েছে। আজ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করতে চাই। মানুষের কর্মক্ষমতা ও কর্মকুশলতা, তার দক্ষতা, উত্পাদনশীলতা এবং অধিক মনোযোগ সহকারে কর্মতত্পর হওয়া তার সার্বিক সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। সুস্থ দেহ সুস্থ মন, সুস্থ মন সৃজনশীলতার দ্যোতক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে তিনজন সাধারণ পর্যায়ের অসুস্থ শ্রমিকের কর্মক্ষমতা একজন সুস্থ দেহ শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা ও কর্মকুশলতার সমান। সুস্থ ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশ কর্মদক্ষতাকে ও কর্মে মনোনিবেশকে যেমন কার্যকর করে তোলে শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুস্থতা ও তার পুষ্টিমান সেই কার্যকর কর্মক্ষমতাকে বিশেষভাবে বাড়িয়ে তোলে। জাপানে একজন শ্রমিকের কর্মে মনোনিবেশের জন্য যে পরিবেশ এবং যত প্রকার প্রণোদনা প্রয়োজন, তার প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়াকে উত্পাদনশীল ব্যবস্থাপনার প্রধান কর্তব্য জ্ঞান করা হয়। বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য সনি কর্পোরেশনের প্রবাদ পুরুষ প্রেসিডেন্ট মরিতা সান ( জাপানীরা মিঃ মিসেস সকলকেই সান সম্বোধন করে থাকে ) এর আত্মজীবনীতে দেখা যায়- তিনি প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে তার চেম্বারে না যেয়ে সরাসরি চলে যেতেন কারখানার ওয়াশ রুমগুলো পরিদর্শনে। সাংবাদিকরা একবার তাকে প্রশ্ন করেছিল-তুমি বাপু এমন একজন ডাক সাইটে এবং সকল ক্ষমতার অধিকারী অধিকর্তা, প্রত্যেক দিনের শুরুতে কারখানার ওয়াশ রুম পরিদর্শন করা কি তোমার জন্য শোভা পায়? মৃদুভাষী এবং অসম্ভব কাজের লোক মরিতা সান তাদেরকে জানান, দেখ - ধর আমার এখানে ৫০০০ শ্রমিক টেলিভিশন এসেম্বলিং এর কাজ করছে। তারা দিনে মনে কর ২৫০০ টেলিভিশন চূড়ান্ত সংযোজন করছে (তখন রোবট ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাদির প্রচলন শুরু হয়নি)। কাজের ফাঁকে এসব শ্রমিকেরা ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে যেয়ে এমনকি সিগারেট টানতে গিয়ে তারা যদি সবকিছু ঝকঝকে তকতকে দেখে তাহলে তাদের মন প্রশান্তিতে ভরে যায় - কাজে ফিরে এসে তারা গভীর মনোনিবেশ ও অধিকতর আন্তরিক হতে অনুপ্রাণিত হয়। আর যদি ওয়াশরুমগুলো থাকে অপরিষ্কার, স্যাঁেসতে, যেখানে যা থাকা দরকার তা নেই, পুরো পরিবেশটা যদি হয় দুর্গন্ধযুক্ত তাহলে প্রশান্তির পরিবর্তে বিড়ম্বনা, বিরক্তি ও বিব্রত হয়েই তারা কাজে ফিরে আসে। এর ফলে তাদের মনোযোগ বিগড়ে যায়। পরে তারা কাজ করে ঠিকই কিন্তু আন্তরিকতা ও মনোযোগ সেখানে খুব একটা পাত্তা পায় না। মরিতা সান লিখেছেন, আমি একবার হিসেব কষে দেখেছিলাম- প্রশান্ত মন ও উন্নত পরিবেশে দিনে অন্তত: ৫টি টেলিভিশন সংযোজনের কাজ বেশি হয়। আমি ঐ ৫টি অতিরিক্ত টেলিভিশনের উত্পাদনের কৃতিত্ব ওয়াশরুম পরিচর্যাকারীদের দিতে চাই।’ ২০১০ সালের লেবার কোর্ট সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশের (১৫+ বছর বয়েসী) মোট শ্রমশক্তি ৫ কোটি ৪১ লক্ষ। এর মধ্যে পুরুষ ৩ কোটি ৭৯ লক্ষ এবং মহিলা ১ কোটি ৬২ লক্ষ। এরা কৃষিতে (৪৭.৩০%); শিল্পে (১৭.৬৪) এবং সেবা খাতে (৩৫.০৬%) নিয়োজিত। দেশ ও অর্থনীতির উন্নয়ন অভিযাত্রায় অনবদ্য অবদান রাখতে সক্ষম গার্মেন্টস শিল্প কাজ করে চল্লিশ লাখেরও বেশি সাধারণ শ্রমিক (যাদের শতকরা ৮০ ভাগ মহিলা)। সক্ষম ও কর্মক্ষম এই প্রায় অর্ধ কোটি জনশক্তির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি অতিসংগত কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে এর সাথে (১) আমাদের অতি সম্ভাবনাময় এই শিল্প উদ্যোগ বেকারের ভারে ন্যুজ দেশে কমংসংস্থানের অন্যতম অবলম্বন এবং (২) মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অতি কার্যকর উপায় জড়িত। এরা বিশ্বব্যাপী মানুষের দ্বিতীয় প্রধান উপজীব্য পোশাক তৈরিতে তথা আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ হিস্যা বহনকারী পণ্যের উত্পাদনের কাজে নিয়োজিত। এই শ্রমিকদের সার্বিক কর্মকক্ষমতার স্বার্থে তাদের নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ, তাদের শ্রমের উপযুক্ত পারিশ্রমিক এ সবই সুনিশ্চিতকরণের শর্ত ও দাবি বিদেশি ক্রেতা সাধারণের। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শ্রম ও শ্রমিকের উপযুক্ত মজুরি ও স্বীকৃতি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এক নম্বর শর্তের মধ্যে চলে এসেছে। সে কারণে শ্রমিকদের শারীরিক সুস্থতার প্রসংগটি অনিবার্যভাবে চলে আসে। এটি চলে আসে আরো এ কারণে যে, যেমনটি লেখার শুরুতেই বলেছি, পোশাক খাতের শ্রমিকদের শারীরিক সুস্থতার সাথে এই খাতের উত্পাদনশীলতা, উত্পাদন মাত্রা ও মানের স্বার্থ পরস্পর প্রযুক্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সাবলীল কর্ম ভাবনায় নিয়োজিত শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় যেমন সুখকর তেমনি প্রতিযোগিতার বিশ্বে ক্রেতা সাধারণের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যও জরুরী। এ নিরীখেই বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফাকচারিং এণ্ড এক্সপোর্টিং এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) তাদের সদস্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করণের গুরুত্ব অনুধাবন করে কয়েকটি গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিজিএমইএ বিশাল হাসপাতাল নির্মাণ করছে এবং তার পরিচালনার ভার সরকারের পর বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থাপনায় শীর্ষ সংস্থা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিকে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা চালাচ্ছে। সবচাইতে বড় কথা গত বছর মার্চ মাসে বিজিএমইএ ও ডায়াবেটিক সমিতির মধ্যে একটি সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তদানুযায়ী-সদস্য ফ্যাক্টরিগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদেরকে ডায়াবেটিক সমিতির স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান যেমন বারডেম, এনএইচএন, এইচসিডিপি এমনকি এফেলিয়েটেড এসোসিয়েশনসমূহের (আউটডোর ও হাসপাতাল) সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। এর আওতায় ডায়াবেটিক সমিতির তরফে শতকরা ২০% রেয়াত বা সাশ্রয়ী মূল্যে সকলকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে-কারখানার শ্রমিক ও মালিক পক্ষের সবাইকে। ফ্যাক্টরির কাছাকাছি এলাকায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোকে এ জন্যে বিশেষভাবে উন্নত করা হচ্ছে। নিরাময়ের চাইতে প্রতিরোধ শ্রেয় এই ধারণায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সচেতন ও স্বশিক্ষিত করে তুলতে পারলে তাদের রোগ বালাইয়ের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়ার কাজ সহজতর হবে, চিকিত্সা ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। তাই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরামর্শ প্রদান এবং টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সরাসরি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উপদেশ ও নির্দেশনা গ্রহণের সুযোগ পাবেন সবাই। বিজিএমইএ এবং ডায়াবেটিক সমিতির এই বিশাল স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার্কিং গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কর্মকুশলতা অর্জনের লক্ষ্যে সমপ্রতি সুইস ডেভলপমেন্ট কোপারেশন এর সহায়তায় দ্য সুইস মাইক্রো ইনস্যুরেন্স কনসালটেনসি গ্রুপ এর ব্যবস্থাপনায় সুইস ট্রপিক্যাল এন্ড পাবলিক হেল্থ ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞ পরামর্শকগণ এর অশগ্রহণে Comprehensive Health care for Garments Workers through Micro Health Insurance Program শীর্ষক একটি মাইক্রোহেলথ ইনসুরেন্স পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। গাজীপুরের সফিপুর ও আশুলিয়া অঞ্চলে অবস্থিত নিউ এশিয়া গ্রুপের ৪টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ৬৫০০ শ্রমিকের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে এক বছর মেয়াদী এই স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের স্বনামধন্য বীমা কোম্পানি ইউনাইটেড ইনসিওরেন্স কোম্পানি লিমিটেড স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছেন। আর ফ্যাক্টরি চারটির মালিক কর্তৃপক্ষ নিউ এশিয়া গ্রুপ তাদের ট্রাস্টের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ১ বছর ব্যাপী স্বাস্থ্য বীমা প্রিমিয়াম ব্যয়ভার বহণে স্বত:প্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি গাজীপুর এর চন্দ্রাস্থ হাসপাতালে, সফিপুর নার্সিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন আউটডোরে , আশুলিয়ার খাগান ও সাভারে অবস্থিত হাসপাতাল ও আউটডোরসমূহে এবং জটিল চিকিত্সার ক্ষেত্রে বারডেম হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ জনবল দিয়ে শ্রমিকদের সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবে। বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও কর্মকুশল শ্রমিকেরা যদি এরূপ স্বনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মিত পরামর্শ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন তাহলে তাদের পুষ্টিহীনতা দূর হবে, সুস্থতা সুনিশ্চিত হলে তাদের কর্মক্ষমতা ও কুশলতা বৃদ্ধি পাবে ফলে উত্পাদনশীলতায় নবযুগের সূচনা হবে। দেশ ও অর্থনীতির জন্য যা বয়ে আনবে সুরভিত সৌভাগ্য। লেখক :সাবেক সচিব ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক