হযরত ইউনূসের (আ.) মাজার ধ্বংস প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৬
ইরাক ও সিরিয়ার কিয়দংশ নিয়ন্ত্রণকারী ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিদার সুন্নীপন্থি আইসিস (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া) জঙ্গি বা যোদ্ধারা ঈদ-উল-ফিতরের আগে হযরত ইউনূস নবীর (আ.) মাজার শক্তিশালী বিস্ফোরকের সাহায্যে সমূলে ধ্বংস করে। সিএনএন, এএফপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এই খবর। কোন কোন সংবাদে ইহাকে শুধু মসজিদ বলিয়া অভিহিত করা হয়। আসলে ইহা একইসঙ্গে মাজার ও মসজিদ। ইহা ইরাকের মসূলে অবস্থিত। সমপ্রতি আইসিস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটিরও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। মাজারটি ধ্বংসের আগে তাহারা প্রথমে বাধা দেয় প্রার্থনায়। ইহার পর তত্সংলগ্ন এলাকা হইতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সরিয়া যাইতে নির্দেশ দেয় এবং মাজারের সামনের রাস্তাটি বন্ধ করিয়া দেয়। ইহার পর বাহিরে ও ভিতরে বোমা মারিয়া মাজারটি সম্পূর্ণ গুঁড়াইয়া দেওয়া হয় প্রায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে। ইহার আগে আইসিস সদস্যরা গত মাসে প্রায় ৩০টি মাজার এবং ১৫টির মতো হুসাইনিয়া ও মসজিদ ধ্বংস করে। তন্মধ্যে আছে হযরত দাউদ (আ.), ইমাম ইয়াহিয়া ইবনে আল কাশেম ও আয়ান আল-দ্বীনের মাজারও।
আসমানি কিতাব কুরআন শরীফে যে ২৫ জন নবী-রাসূলের নামোল্লেখ করা হইয়াছে, তন্মধ্যে ইউনূস (আ.) অন্যতম। বাইবেলে এই নবীর নাম জোনাহ। অন্যদিকে আমরা জানি, বাবা আদম (আ.) হইতে শুরু করিয়া এই পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল আগমন করিয়াছেন, তাহাদেরকে স্বীকার করা মুসলিমদের ঈমানের অঙ্গ। হাদীস অনুযায়ী তাহাদের সংখ্যা লক্ষাধিক। এই বিচারে হযরত দাউদ ও ইউনূসের (আ.) প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করা অবশ্য কর্তব্য। একই কারণে আমরা হযরত ঈসা ও মুসার (আ.) প্রতিও (খ্রিস্টান ও ইহুদিগণ যাহাদের অনুসারী) সম্মান প্রদর্শন করিয়া থাকি। কিন্তু সম্মান প্রদর্শন এক জিনিস, আর কোন নবী-রাসূল, ওলি-আউলিয়া বা কোন ব্যক্তির মাজারকে মসজিদ বানানো যায় কিনা তাহা ভিন্ন বিষয়। দ্বিতীয় বিষয়টি ইসলামী নীতির আলোকে ব্যাখ্যাযোগ্য।
বস্তুত আইয়্যামে জাহেলিয়াতের ন্যায় কবর পূজা ও শিরকের আশঙ্কায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে কবর জিয়ারতই নিষিদ্ধ ছিল। পরে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা প্রসারের পর কতিপয় বিধি-নিষেধ সাপেক্ষ ইহার অনুমতি দেওয়া হয় যাহাতে বান্দার দিল নরম হয় ও পরকালের স্মরণ আসে। তবে কবরের ওপর মসজিদ, গম্বুজ বা কোব্বা নির্মাণ, কবরকেন্দ্রিক ওরস বা মেলার আয়োজন, কবরে মৃতব্যক্তির নাম, জন্ম ও মৃত্যুর সন-তারিখ কিংবা কোন মর্সিয়া বা শোকগাথা লিখা সহি হাদিস অনুযায়ী নিষিদ্ধ। কবরে যাহারা বাতি জ্বালায় তাহাদের লানত দিয়াছেন স্বয়ং মহানবী (স.) এবং উঁচু কবর ভাঙিয়া সমান করিয়া দিতে নির্দেশ দিয়াছেন। তাহাছাড়া কবরকে হাত দ্বারা জড়ানো, চুম্বন করা, মৃত ব্যক্তিকে ওসিলা বানানো, তাহাদের নামে কসম করা ইত্যাদিও তওহিদী চিন্তা-চেতনার পরিপন্থি। কোন ওলি-আল্লাহর কবরস্থানকে মসজিদ বানানোর ফলে বেশিরভাগ সময় মসজিদের চাইতে কবরের গুরুত্ব বাড়িয়া যায় এবং কবরের প্রতি অধিক সম্মান প্রদর্শনের ঝোঁক বাড়ে। তাই ইহা নিষিদ্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইসলাম-পূর্ব যুগের অনুসরণ ও ভিন্ন ধর্ম বা ভক্তিবাদের প্রভাবে আজকাল কবরকেন্দ্রিক নানা আচরণ পরিলক্ষিত হইতেছে। অথচ বায়তুল্লাহ শরীফ, মদীনা মনোয়ারা ও জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস ছাড়া অন্যকিছুকে তীর্থস্থান না বানানোরও নির্দেশ আছে। যাহা হউক, ইরাকের উক্ত ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিয়াছে। এখানে আইসিস সম্পর্কে আমাদের কোন বক্তব্য নাই। তবে মতের ভিন্নতা সবসময় থাকে বা থাকিতে পারে। এমতাবস্থায় মুসলিমরা কী করে তাহার চাইতে ইসলাম কী বলে তাহাকেই আমাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত।