মানবিক বোধের এ কোন্ দৈন্য!
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৬
পবিত্র ঈদের দিন বৃদ্ধাশ্রমের অনেক বাসিন্দা অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনিয়াছেন স্বজন-সন্তানের পথ চাহিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনজনদের কেহই আসে নাই। গত শুক্রবার এমনই বেদনাঘন সচিত্র রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত অন্য এক খবরে জানা যায় যে, সন্তানেরা বস্তায় ভরিয়া ফেলিয়া গিয়াছে বৃদ্ধা মাতাকে। কী মর্মান্তিক এই খবর! দুনিয়া জুড়িয়া প্রতিদিন নানান অমানবিক ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে। বাংলাদেশেও প্রতিদিনই নানান মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটিতেছে। কিন্তু উপেক্ষিত পিতা-মাতার বঞ্চনার সংবাদে কাঁদিয়া ওঠে কার না বিবেক! সন্তানেরা বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা করিয়া থাকে, ইহা খুব নূতন নহে। কিন্তু অসহায় এক বৃদ্ধাকে বস্তায় ভরিয়া রাস্তায় ফেলিয়া আসিবে সন্তানেরা, ইহা বাংলাদেশে অকল্পনীয় ব্যাপার। ঐ সন্তানদের মানবিক বোধ ও নৈতিকতা যে অতি নিম্নস্তরের, তাহা নিয়া কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু ইহাকে কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিয়া উপেক্ষা করা যায় না। অনেক সময় একটি দুইটি ঘটনাই বৃহত্তর সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়া যায়। আমাদের হূদয়ে সংবেদনশীলতা যতটুকু অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহা দিয়া এই ঘটনার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নগরায়নের প্রভাবে একান্নবর্তী পরিবার প্রথা ভাঙ্গিয়া যাইতেছে। কিন্তু পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রতীচ্যে বা এশীয় দেশগুলিতে পারিবারিক বন্ধন এখনও সুদৃঢ়। সন্তান শহরে বসবাস করিলেও পিতা-মাতার খবরাখবর লওয়া কিংবা অবসরপ্রাপ্ত অথবা বৃদ্ধ পিতা-মাতার আর্থিক দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা, এইসব দেশের মানুষের সাধারণ প্রবণতা। শত বাধা-বিপত্তি-কষ্টকে তুচ্ছ করিয়া শহরের মানুষ গ্রামে বা নিজ বাড়িতে ঈদ করিতে গিয়াছে, তাহা তো পিতা-মাতার সঙ্গে ঈদের দিনটি কাটাইবেন বলিয়াই। ঈদে বা উত্সবে পিতা-মাতার কাছে ছুটিয়া যাইবার এই প্রবণতা বাংলাদেশে যেমন দেখা যায়, পৃথিবীর খুব কম দেশেই তাহা দেখা যাইবে। এইরকম একটি দেশের এইরকম একটি সাধারণ মূল্যবোধের বিপরীতে হাসিনা বেগমের মত অনেকেই শেষ বয়সে অবজ্ঞা-অবহেলার শিকার হইতেছেন কেন?
বার্ধক্যে অনেকেই অসংলগ্ন কথা বলেন, চাল-চলনে কিছুটা বিকারও ভর করিতে পারে, ফলে শিশুদের ন্যায় খানিক উত্পাতও হয়তো করিয়া থাকেন সংসারে। তাই বলিয়া তাহার প্রতি অবজ্ঞার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতে হইবে! যেই পিতা-মাতা শিশুসন্তানকে তিল তিল করিয়া বড় করিয়া তুলিয়াছেন, নিজে না খাইয়া হইলেও সন্তানের মুখে পরম যত্নে অন্ন তুলিয়া দিয়াছেন, এইবার তো সেই সন্তানের ঋণশোধের সময়, যখন সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক এবং পিতা-মাতা শিশুর ন্যায় অসহায় হইয়া পড়িয়াছেন। ইহাই তো মানবিকতার শিক্ষা। তাহা হইলে কি জীবনের কষাঘাতে পর্যুদস্ত প্রতিটি সাবালক নাগরিক অনেকেই অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দেখভাল করিবার সক্ষমতা হারাইয়াছে? কিংবা পাশ্চাত্যের ন্যায় স্ত্রী-পুত্র-কন্যা মিলিয়া আত্মকেন্দ্রিক প্রাইভেসির বোধ ষোলোআনা গজাইয়াছে, যেইখানে সিনিয়র সিটিজেনের কোনো স্থান নাই? এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তাহা হইলে কোথায় যাইবে? শেষ বয়সে পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করিয়া দেওয়াও হয়তো অসঙ্গত নয়। তাই বলিয়া উত্সবে-অবকাশে তাহাদের একটু চোখের দেখাও দেখিতে যাওয়া সম্ভব হইবে না, এমনটি কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যিক মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। এ জায়গাটায় মানবিকবোধটা জাগ্রত রাখা সকলেরই একান্ত কর্তব্য।