প্রযুক্তি

ডিজিটাল বাংলাদেশ :কিছু কথা

ফিলিপ আর্থারটন ফোন করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে। তিনি ফোনে ডাক্তারের এপোয়েন্টমেন্ট পেলেন এবং যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে তিনি ডাক্তার দেখালেন। তিনি কিন্তু জানতেও পারলেন না তার ফোন কলটি চলে গিয়েছিলো ভারতের গুরুগাঁওতে। অভিবাদন থেকে শুরু করে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তাকে সহযোগিতা করেছেন একজন ভারতীয় কল সেন্টার এজেন্ট। ডিজিটাল বাংলাদেশের শ্লোগান যখন শুরু হয় তখন আমি ভেবেছিলাম আমরা বোধ হয় বিশ্বায়নের এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবো। যেমন কাজে লাগিয়েছে ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, চীন, আর শ্রীলংকানরা। দিল্লীর উপকণ্ঠে অবস্থিত ছোট্ট উপ-শহর গুরুগাঁও। হারিয়ানার এই উপ-শহরে রয়েছে অসংখ্য এইচসিসি, এইচসিসিএসপিসহ নানা ধরনের কল সেন্টার। এক একটি কল সেন্টারে কাজ করছে শত শত এমনকি হাজার হাজার এজেন্ট। বহুতল ভবনের নিচে রয়েছে তাদের নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন। ইউরোপ, আমেরিকার নামি-দামি সব কর্পোরেট কোম্পানির ক্লায়েন্টদের তথ্যভাণ্ডার এবং সাপোর্ট সেন্টার হিসাবে কাজ করছে গুরুগাঁওয়ের কল সেন্টারগুলো। এজেন্ট প্রতি ঘণ্টায় ১৫ থেকে ১২৫ ডলার পর্যন্ত আয় করছে তারা। পুরো ভারত যেন ডলারের উপর ভাসছে। ভারতীয়দের ইংলিশ প্যাটার্ন কিন্তু মোটেই আমেরিকান স্টাইলের মতো নয়। কিন্তু তারা সেটা শিখেছে। তারা মানবসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলো। তারা সেই সুফল পাচ্ছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শুরুর প্রথম দিন থেকে মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু সেটা করা হয়নি। ফলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি আমলাতান্ত্রিক গণ্ডির মধ্যেই রয়ে গেছে। সেখানে জনসম্পৃক্ততা বাড়েনি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’কে একটি শ্লোগান থেকে বিপ্লবে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বে প্রযুক্তির দৌড়ে বাংলাদেশ তাই পিছিয়ে পড়েছে। ফলে The ICT Development Index (IDI) এর র্যাঙ্কিং-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৫ যেখানে ভুটানের মতো দেশের অবস্থানও আমাদের চেয়ে অনেক উপরে (১১৮), আর মালদ্বীপের অবস্থান ৭৩ এ। এমনকি সামরিক শাসনে ক্লান্ত মিয়ানমারের অবস্থানও আমাদের উপরে। আইডিআই হলো তথ্য ও প্রযুক্তির মান নির্ণয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ইন্ডিকেটর। সেই মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ শুধু ২০১১ সালেই ভারতের প্রযুক্তি খাতে প্রায় ২.৫ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। শুধু টাটা কনসালটেশন কোম্পানিতেই কাজ করছে ১,৭৫০০০ দক্ষ প্রযুক্তিবিদ। ভারতের ব্যাঙ্গালুর, চেন্নাই, কলকাতা, পুনেসহ বিভিন্ন রাজ্য হয়ে উঠেছে প্রযুক্তির মহামিলন। ব্যাঙ্গালুরকে বলা হয় ভারতের সিলিকন ভ্যালী। ব্যাঙ্গালুরের কোনো কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির অবকাঠামো আমাদের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ে কয়েকগুণ বড়। ডিজিটাল বাংলাদেশ কোনো বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ সরকারের নির্বাচনী শ্লোগানে যতটা তত্পরতা ছিলো কার্যক্ষেত্রে সেই পরিমাণ বরাদ্দ ছিলো না, সঠিক পরিকল্পনা ছিলো না, প্রচার-প্রসার ছিলো না। সর্বোপরি অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ছিলো না চোখে পড়ার মতো কোনো কার্যক্রম। প্রশ্ন আসতে পারে পাঁচ-ছয় বছর কি যথেষ্ট সময়? আমি বলবো যথেষ্ট সময়। কারণ এই পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ফিলিপাইন প্রযুক্তি খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। কল সেন্টার খাতে ফিলিপাইনের ম্যানিলাকে বলা হচ্ছে ‘পৃথিবীর রাজধানী’। এই খাতে তাদের প্রবৃদ্ধির হার বিস্ময়কর, ১৮-২২%। তারা এটা অর্জন করেছে বিগত সাত বছরের মধ্যে। বর্তমানে তারা ভারতকে পেছনে ফেলে উঠে এসেছে এক নম্বরে। শুধুমাত্র দুটি জিনিস ফিলিপাইনকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে :অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। আমি ফিলিপিনোদের সাথে কাজ করেছি। তাদের ইংলিশ উচ্চারণের প্যাটার্ন ইউরোপ আমেরিকার মতো ছিলো না। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা সেটা অর্জন করেছে। ২০০৭-০৮ সালে এই খাত উন্নয়নে যথেষ্ট কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। আমি তখন এইচসিসি লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি কোম্পানির কনসালটেন্ট হিসাবে কাজ করেছি। তখন বিটিআরসি দারুণ সহযোগিতা করেছে আমাদের। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার কেন এই প্রজেক্টগুলো এগিয়ে নিয়ে যায়নি সেটা আমার আজও বোধগম্য নয়। অথচ এই খাতে আমাদের প্রায় দুই লক্ষ কর্মসংস্থান হতে পারতো। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার পাশাপাশি আমরা ঠেকাতে পারতাম অবৈধ ভিওআইপি’র মাধ্যমে চুরি হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ওভারসীস কল। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে শুধুই বুঝি যেন, ইন্টারনেট কানেকশন, কম্পিউটারের ব্যবহার আর টুজি/থ্রি জি প্রযুক্তি। কেউ কেউ ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারের মতো হাস্যকর ব্যাপারকেও ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে থাকে। আবার কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার আর মোবাইল সিম বিক্রি বেশি হওয়াই নাকি ডিজিটাল বাংলাদেশ। কিন্তু এগুলোর সবগুলোতেই হলো আমরা বিশ্বায়নের ক্রেতা হিসাবে ভূমিকা পালন করছি। ফেসবুক, টুইটার, মোবাইল কোস্পানিগুলো প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র গ্রামীণফোনের আয় থেকেই নরওয়ের জিডিপি’র একটা উল্লেখযোগ্য যোগান আসে। আমাদের গড়ে তুলতে হবে মানবসম্পদ। ভারতীয়রা তাদের প্রযুক্তিকর্মীকে মাসিক দিচ্ছে ৬০,০০০ টাকা, ফিলিপাইনরা দিচ্ছে ৮৫,০০০ টাকা। আর আমরা দিচ্ছি ১৫,০০০ টাকা যেখানে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর। এভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ সফল হবে না। আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মেধাবীরা যাতে দেশত্যাগ না করে সেজন্য ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে, পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। লেখক :প্রাক্তন প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স, লন্ডন ইউনিভার্সিটি ই-মেইলঃ sk_s_rana@yahoo.com