বেদনার দিনলিপি
শোকাবহ আগস্ট ও সংগ্রামের দিনগুলি
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪০
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে পরিবারের ১৭ জন সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এরূপ ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ঘাতক খুনী-চক্র স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতিকে। ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই সকালে আমাকে প্রথমে গ্রেফতার করে গৃহবন্দী করা হয়। ধানমন্ডির যে বাসায় আমি থাকতাম— (এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান বাস করেন) সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সেই বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে দেয়া হয়নি। আমার সাথে তখন বাসায় অবস্থান করছিলেন ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব শামসুদ্দীন আহমেদ মিয়া। তিনি ভোলা জেলা বাকশালের সেক্রেটারি ছিলেন। দুইদিন পর ১৭ তারিখ খুনীচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল অভ্যুত্থানকারী আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমায় রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনীচক্রের সমর্থনে সম্মতি আদায়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। তখনো জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল ব্রিগেড কমান্ডার। তাদের হস্তক্ষেপে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা প্রয়াত আমিন আহমেদ চৌধুরী (পরে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) আমাকে বাড়ীতে মায়ের কাছে পৌঁছে দেন। এরপর ২৩ তারিখ ই এ চৌধুরী একদল পুলিশসহ এসে আমার বাসভবন থেকে আমাকে এবং জনাব জিল্লুর রহমানের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বাসভবন থেকে তাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যান। বঙ্গভবনে খুনী মোশতাক তার অবৈধ সরকারকে সমর্থন করার জন্য আমাদের দুইজনকে প্রস্তাব দেয়। আমরা দুইজনেই খুনী মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। এরপর আমাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ জিল্লুর রহমান, আমাকে ও আবদুর রাজ্জাককে একই দিনে গ্রেফতার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ৬ দিন বন্দী রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। আমাদের সাথে আর একজন বন্দী ছিলেন। তিনি “দি পিপল” পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক জনাব আবিদুর রহমান। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে পাশাপাশি দুইটি চৌকির একটিতে ঘুমাতাম আমি ও রাজ্জাক ভাই এবং অপরটিতে জিল্লুর ভাই ও আবিদুর রহমান। এমনি একদিন রমজান মাসের ৩ তারিখ আমরা রোজা রেখে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষ রাতের দিকে সেনাবাহিনীর একদল লোক আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে উচ্চঃস্বরে চিত্কার করে বলতে থাকে “হু ইজ তোফায়েল” “হু ইজ তোফায়েল!” রাজ্জাক ভাই জেগে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। আমি চোখ মেলে দেখি আমার বুকের ওপরে স্টেনগান তাক করা। আমি ওজু করতে চাইলে অনুমতি দেয়া হয়। কক্ষের সাথেই সংযুক্ত বাথরুম। ওজু করে আসার সাথে সাথেই জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আবিদুর রহমানের সামনেই আমার চোখ বাঁধে এবং বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমি অনুভব করি আমাকে রেডিও স্টেশনে আনা হয়েছে। এরপর হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায়ই চেয়ারের সাথে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে আমাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তাঁর কোথায় কী আছে এরকম বহু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না দেয়াতে ভীতি প্রদর্শন করে খুনীরা বলে, ইতিমধ্যে আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আমার বিরুদ্ধে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি দিয়েছে। সেই বিবৃতিতে আমার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। তথাপি আমি নিরুত্তর থাকি। শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, “বঙ্গবন্ধু যা ভালো করেছেন আমি তার সাথে ছিলাম, যদি কোন ভুল করে থাকেন তার সাথেও ছিলাম। এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারবো না।” তখন তারা চরম অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় আমার উপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এরপর অর্ধমৃত অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্যে খুনী ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলাম। আমাকে রুমের মধ্যে একা রেখে তারা মিটিং করছিল আমাকে নিয়ে কী করবে। এখনো মনে আছে- অজ্ঞাত একজন আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বলছিলেন “আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন, আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন।” কারণ তার ধারণা হয়েছিল ঘাতকের দল আমাকে মেরে ফেলবে। শেষপর্যন্ত ঘাতকেরা এসে আমাকে বললো, “আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি তার উত্তর দিতে হবে; উত্তর না দিলে আপনাকে আমরা রাখবো না।” এবারও নিরুত্তর থাকায় পুনরায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন ঘাতক দল পুলিশ কন্ট্রোল রুমের যে কক্ষে আমরা অবস্থান করছিলাম সেই কক্ষে রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইয়ের কাছে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে আসে। সেখানে জ্ঞান ফিরলে যন্ত্রণায় আমি চিত্কার করতে থাকি। শারীরিক অসহ্য ব্যথা নিয়ে যখন আর্তনাদ করছি তখন জিল্লুর ভাই ও রাজ্জাক ভাই আমার এ অবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং তারা দুইজনেই আমার সেবা-শুশ্রূষা করেন। এরপর সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। এ অবস্থার মধ্যেই রাতে মেজর শাহরিয়ার আমার কাছ থেকে বিবৃতি নিতে আসে। তিনি আমাকে বলেন, “যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে তার লিখিত উত্তর দিতে হবে।” আমি মেজর শাহরিয়ারকে বললাম, ”আপনারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন দিতে পারেন; আমি কোন কিছু লিখতেও পারবো না, বলতেও পারবো না।” ওরা যখন দেখলো আমার কাছ থেকে কোন বিবৃতি আদায় করা সম্ভবপর নয়; তখন তারা উপায়ান্তর না দেখে চলে যায়। পরদিন অর্থাত্ ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফাঁসির আসামিকে অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে যেভাবে রাখা হয়, ময়মনসিংহ কারাগারে আমাকেও সেইভাবে বন্দী করে রাখা হয়। এরপর ২০ মাস ময়মনসিংহ কারাগারে অবস্থানের পর ’৭৭-এর ২৬ এপ্রিল আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
কুষ্টিয়া কারাগারে আটকাবস্থায় ’৭৭-এর ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক সেকশন অফিসার কর্তৃক ব্যাকডেটে স্বাক্ষরিত অর্থাত্ ’৭৫-এর ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে জারি করা আটকাদেশের সত্যায়িত কপি আমার নিকট প্রেরণ করা হয়। আটকাদেশের সত্যায়িত কপি প্রাপ্তির পর আমার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আমার পক্ষের আইনজীবিগণ— সর্বজনাব সিরাজুল হক, এএইচ খোন্দকার, সোহরাব হোসেন, সালাহউদ্দীন আহমেদ এবং শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আদালতে বলেন, “তার আটক সম্পূর্ণ অন্যায় এবং ১৯৭৫ সালের জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় তার আটকাদেশের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার মতো কোন তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে নেই। ফলে উক্ত আটকাদেশ অবৈধ ও আইনের এখতিয়ার বহির্ভূত।” বিচারপতি জনাব কে এম সোবহান এবং বিচারপতি জনাব আবদুল মুমিত চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ’৭৮-এর ৯ জানুয়ারি এক রুল জারি করেন। রুলে বলা হয়, “কারাগারে আটক জনাব তোফায়েল আহমেদকে কেন আদালতের সামনে হাজির করা হবে না এবং কেন তাকে মুক্তি দেয়া হবে না” সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যদের কারণ দর্শাতে বলা হচ্ছে। কুষ্টিয়া কারাগারে যখন আমি বন্দী তখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। রাজ্জাক ভাই এবং আমার একসাথে রিট হয়। রাজ্জাক ভাই হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাই নি। অবশেষে সুপ্রীম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে আমি মুক্তি পেলাম ৪ মাস পর অর্থাত্ ১৯৭৮-এর ১২ এপ্রিল। কুষ্টিয়া কারাগারে ১৩ মাসসহ সর্বমোট ৩৩ মাস বন্দী থাকার পর আমি মুক্তি লাভ করি। ইতিমধ্যে কারাগারে আটকাবস্থায় আমি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই।
জাতির পিতাকে হত্যা করেই খুনীচক্র ক্ষান্ত হয় নি; একই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিতেন বা বারংবার নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের এবং সরকারের— ঐতিহাসিক মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেব— যারা জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করার জন্য তাদেরকে কারাভ্যন্তরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের আসল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে চরম শূন্যতা তৈরি করা। সেই মুহূর্তে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পর ’৭৬-এ দলের হাল ধরেন জনাব মহিউদ্দীন আহমেদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম সহ-সভাপতি। যখন ’৭৫-এ “বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ” গঠিত হয় তখন তিনি ছিলেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও জেলহত্যার পর ’৭৬-এ যখন দল পুনর্গঠিত করার সুযোগ এলো তখন মহিউদ্দীন আহমেদকে অস্থায়ী সভাপতি আর সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে দল অগ্রসর হলো। আওয়ামী লীগ তখন নিষিদ্ধ। এরপর ’৭৭-এ সেনাশাসক জিয়াউর রহমান দরখাস্ত করে দলের অনুমোদন দিতে আরম্ভ করেন। যেহেতু, আওয়ামী লীগ কোন গুপ্ত সংগঠন নয়, নিয়মাতান্ত্রিক দল তথা কন্সটিটিউশনাল পার্টি। সেহেতু, অবৈধ পন্থায় দাবি আদায়ের দৃষ্টান্ত দলের ইতিহাসে নাই। সুতরাং, আওয়ামী লীগকে চিরাচরিত সাংবিধানিক পথেই এগুতে হয়েছিল।
অনেক ষড়যন্ত্র করেছে জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিতে বলেছে। দলীয় গঠনতন্ত্র থেকে মূলনীতিসমূহ পরিবর্তন করতে বলেছে; কিন্তু নেতৃবৃন্দ বাদ দেন নাই। ’৭৭-এ জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে সুন্দর একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। তারপর ’৭৮-এ যখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়, তখন সংগ্রামী জননেতা জনাব আব্দুল মালেক উকিল সভাপতি, রাজ্জাক ভাই সাধারণ সম্পাদক এবং আমি সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ’৭৮-এর ১২ এপ্রিল, কারাগার থেকে বেরিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শুরু করি। রাজ্জাক ভাই, আমি এবং অন্য নেতৃবৃন্দ যেমন— আব্দুল মান্নান, আব্দুল মোমিন, মহিউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ প্রত্যেকেই দলকে পুনসংগঠিত করতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন। শেখ আব্দুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ থেকে শুরু করে যারা বরেণ্য নেতৃবৃন্দ তারা তখন কারাগারে। যারা বাইরে ছিলেন সকলেই দলকে সংগঠিত করতে কাজ করেছেন। কারামুক্ত হওয়ার পর আমি ও রাজ্জাক ভাই, মালেক উকিল সাহেবকে সামনে রেখে সংগঠনকে তৃণমূল থেকে মজবুত ও চাঙ্গা করার চেষ্টা করি।
মুক্তিযুদ্ধের পর ’৭২ থেকে ’৭৫ কালপর্বে দল ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় সদ্য-স্বাধীন দেশে ষড়যন্ত্রকারী গুপ্তঘাতকদের হাতে পাঁচ জন সংসদ সদস্যসহ চার হাজারেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার অবর্তমানে নেতা-কর্মীদের মনোবল শক্তিশালী ও সংগঠিত করতে আমরা ছিলাম বদ্ধপরিকর। সারা বাংলাদেশ আমরা চষে ফেলেছিলাম। এমন কোন থানা বা ইউনিয়ন ছিল না এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত আমরা সাংগঠনিক সভা করেছি। আমার মনে আছে, তখন বছরে ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই আমরা মফস্বলে থাকতাম। দেশের এমন কোন স্থান নাই যেখানে আমরা সফর করি নাই। এলাকা ভাগ করে নিজদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে কর্মসূচি ঠিক করে নিতাম। এমনকি রোজার মাসে— ’৭৯ সালে পঞ্চগড়ের আমাদের সাবেক এমপি জনাব সিরাজুল ইসলাম, তার গাড়ীতে করে আমি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট সফর করেছি। প্রতিটি থানায় দিনে ২-৩টা করে মিটিং করেছি। এভাবেই আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করেছি। আমাদের দৃঢ় মনোবল ছিল ক্ষমতা দখলকারী খুনী মোশতাক ও তার দোসর স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া উভয়েই সংবিধান লঙ্ঘনকারী এবং অবৈধ। তাদের ক্ষমতার আস্ফাালন সাময়িক। এরা মিথ্যাচার করে বিপথগামী সেনা সদস্যদের ব্যবহার করে পেছনের দরোজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে।
’৭৫-এর ২০ আগস্ট অবৈধ প্রোক্লেমেশন জারি করে, সংবিধান স্থগিত করে খুনী মোশতাক বাণিজ্য মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি বনে গিয়েছিল। অথচ ক্ষমতাসীন হওয়ার আগ পর্যন্ত খোন্দকার মোশতাক ছিল মন্ত্রিসভার সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মাত্র। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পীকার, প্রধান বিচারপতি তখনো বর্তমান। এতদসত্ত্বেও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে খুন করে, সাংবিধানিক পন্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সীমাহীন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে খুনীচক্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। তারপর ১৪৮ অনুচ্ছেদটি ছিল শপথ-সংক্রান্ত। রাষ্ট্রপতির শপথ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধি-বিধানকে ভূলুণ্ঠিত করা হলো। অপরদিকে স্বৈরশাসক শাসক জেনারেল জিয়া বিচারপতি সায়েমকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিল স্রেফ বন্দুকের জোরে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারী খুনী চক্রের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অসাংবিধানিক। খুনীচক্রের এই অবৈধ অবস্থানের মধ্যেই নিহিত ছিল আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করার অমোঘ মন্ত্র। কেননা, বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক-সাংবিধানিক নীতিই হচ্ছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। আজ উচ্চ আদালত কর্তৃক ৫ম সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, মিথ্যার জয় সাময়িক, সত্যের জয়-ই চূড়ান্ত। সেদিন সাংবিধানিক সত্য প্রতিষ্ঠায় আমরা যেখানেই গিয়েছি নেতা-কর্মীদের বুঝিয়েছি- এই সরকার অবৈধ-অসাংবিধানিক। আমাদের লক্ষ্য দেশকে আবার সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে জাতির জনকসহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার করা।
জিয়াউর রহমানের আমলে আমাদের উপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। আমাদের মিছিল-মিটিংয়ে আক্রমণ হয়েছে। যখন জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলেন তার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে আমরা কতো কষ্ট করেছি। প্রাণান্ত পরিশ্রম করে দলকে সংগঠিত করেছি, নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছি। সংগ্রামের সেদিনগুলো পেরিয়ে আজ যখন দেখি গণমানুষের মধ্যে দলের সাংগঠনিক তত্পরতা কম, তখন আমার অতীত দিনের সেসব কথা মনে পড়ে যায়। সামরিক শাসনের মধ্যেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমরা সাংগঠনিক তত্পরতা চালিয়েছি। চরম দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আমরা আপোষ করি নাই। ’৭৫-এর পর চরম দুঃসময় তখন তো একটা করুণ অবস্থা। সারা দেশ জুড়ে হত্যা, গুম, গ্রেফতার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। অবর্ণনীয় করুণ অবস্থায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমাদের কেটেছে। নিজের বাড়ীতে থাকতে পারি নাই। পাঠক ক্ষমা করবেন! নেহায়েত্ ব্যক্তিগত বিষয় বলছি। আসলে আমরা যারা জনকল্যাণের রাজনীতি করি তাদের ব্যক্তিগত কোন বিষয় নাই। রাজনীতির সাথে ব্যক্তিগত জীবন একাকার হয়ে আছে। আমি যখন কারাগারে, আমার স্ত্রীকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয় নাই। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। আমার ভাগ্নি-জামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিচয় গোপন করে মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাড়ায় সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থেকেছেন। তিনি একবছর ছিলেন কলাবাগানে। সেই বাসায় কোন ফ্যান ছিল না। পরে এক এডিসির কল্যাণে তার আজিমপুরের বাসার দোতলায় তিনি আমার পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমি কারামুক্ত হয়ে ফিরে এলে তার সেই আজিমপুরের বাসায় আমাদের ঠাঁই হয়।
জিয়াউর রহমান সাংঘাতিকভাবে ক্ষিপ্ত ছিলেন আমার উপর। কারণ, তিনি অনেককে পাঠিয়েছেন আমার কাছে তার সাথে দেখা করার জন্য। আমি দেখা করি নাই। আমার এই বনানীর বাড়ি, এই বাড়ির জমি বঙ্গবন্ধু আমাকে দিয়েছিলেন। ’৭৫-এর ৩০ জুলাই বরাদ্দ করে দিলেন আমার স্ত্রীর নামে। ১৫ আগস্টের পর আমি কারাগারে। ’৭৬-এ আমার স্ত্রী চিঠি পেলেন বরাদ্দকৃত প্লটের জন্য টাকা জমা দিতে হবে। আমার স্ত্রীর নিকট কোন টাকা নাই। তখন তার ২৮ ভরি স্বর্ণ, যার থেকে ইতিমধ্যে ৪ ভরি বিক্রি করে খেয়েছেন। আর ২৪ ভরি বন্ধক দিয়ে ভোলার সোনালী ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার টাকা নিয়েছেন; কিন্তু প্রথম কিস্তি পরিশোধে লাগবে ১৭ হাজার টাকা। ১ লাখ টাকা করে বিঘা। এখানে জমির পরিমাণ ১২ কাঠার থেকে একটু কম। তাতে জমির দাম হয় ৫৯ হাজার টাকা। ১৩ হাজার টাকা জোগাড়ের পর ৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন রফিকুল্লাহ চৌধুরী। আজকে যিনি জাতীয় সংসদের স্পীকার শিরিন শারমীন চৌধুরী, তার বাবা। তিনি ৪ হাজার টাকা দিয়ে আমার স্ত্রীকে সাহায্য করার পর বাড়ীর প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভবপর হয়েছিল। আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। আমি তাকে চাকরি দিয়েছিলাম ১৯৭৩ সালে। ১৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য খুনীচক্রের ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কতিপয় সেনাসদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়; কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজী না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। তার মৃতদেহটি পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। আমার মেজো ভাইকে ’৭৫-এর ৫ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামের বাড়ী থেকে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করে সর্বহারা পার্টির লোকেরা। আমার বড় ভাই ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে। এক ছেলে কারাগারে, দুই ছেলে নাই। আমার মায়ের তখন কী ভয়াবহ আর করুণ অবস্থা!
এই অবস্থার মধ্যদিয়ে ধীরে ধীরে আমরা সাংগঠনিক তত্পরতা বৃদ্ধি করে আমাদের মূল দলসহ সকল সহযোগী সংগঠনকে শক্তিশালী করে নিজদের মধ্যে সকল ভেদাভেদ ভুলে কেবল দলকেই ধ্যান-জ্ঞান করে, দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হয়ে দলের সেই পতাকা গৌরবের সাথে সমুন্নত রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হবার পর আমরা তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে যেখানেই গিয়েছি সেখানেই সর্বস্তরের গণমানুষের সমর্থন পেয়েছি। ব্যাপক গণসমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করেছে সংবিধান ও সত্যের কাছে আমাদের অঙ্গীকার ও দৃঢ় মনোবল। যা গড়ে উঠেছিল ঊনসত্তর আর একাত্তরের মহত্তর চেতনায় তথা বঙ্গবন্ধুর চেতনার ভিত্তিতে— যে চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ’৭৫-এর মর্মন্তুদ ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শির সমুন্নত রাখার সাহসী অভিযাত্রায় এটা প্রমাণিত সত্য যে, আওয়ামী লীগ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চেতনার সফল ও সার্থক উত্তরাধিকার।
লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
tofailahmed69@gmail.com