রণে নয়, সৃজনে ব্যবহূত হোক পরমাণু
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৪
মানবসভ্যতার সবচেয়ে কলঙ্কিত দিনটি হলো ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চূড়ান্ত পরিণতির মুখোমুখি ছিল। হিটলারের উপর আক্রোশ মেটাতে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি এস ট্রমাসের নির্দেশে হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ নামে পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ হয়। মারা যান ১ লক্ষ ৪০ হাজার নিরীহ মানুষ আহতও হন লক্ষ লক্ষ । যারা আহত হয়ে বেঁচে ছিলেন তারা হয়েছিলেন জীবন্ত লাশ। তাদের মানুষ বলে চেনা মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। এর তিনদিন পর ৯ আগস্ট পুনরায় জাপানের নাগাসাকিতে যে দ্বিতীয় আণবিক বোমা ‘ফ্যাটম্যান’ বিস্ফোরিত হয়, সেই বিস্ফোরণেও মারা যান ৮০ হাজার মানুষ। ক্ষমতাশক্তির বর্বরতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়েই ৬ এবং ৯ আগস্ট সভ্যতা বিরোধীদের ধিক্কার দিবে যতদিন পৃথিবী জীবন্ত থাকবে।
৬ আগস্ট দিনটিতে প্রতিবছরই হিরোশিমায় হাজির হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। হিরোশিমার জিরো পয়েন্ট, যেখানে মার্কিন বিমান বোমা নিক্ষেপ করেছিল, সেখানে বসেই শোকাবহ দিনটিকে স্মরণ করেন। শোক স্মরণসভা। আন্তর্জাতিক স্তরে যেসব দিবসকে আমরা স্মরণ করে থাকি, সেই সব দিনের মধ্যে ৬ ও ৯ আগস্টই সবচেয়ে শোকাবহ এবং মানবসভ্যতা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার দিন। ক্ষমতাধররা মানুষের প্রিয় পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে চায়। তাই এখন আর অস্ত্র নয়, পৃথিবী রক্ষার্থে আলিঙ্গনের যে প্রয়োজন, সেই শান্তির বাণী প্রচারের দিন এসেছে।
পারমাণবিক বোমায় আহত হয়ে যারা সেদিন বেঁচেছিলেন, যাদের জাপানি ভাষায় বলা হতো ‘হিববুশ’ অর্থাত্ জীবন্ত লাশ, সেই জীবন্ত লাশ আজ গোটা পৃথিবী জুড়ে বাড়ছে।’ পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে না হোক, বোমা বিস্ফোরণে ও আগ্নেয়াস্ত্রের ঝলকানিতে। তাই বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের স্বার্থে গোটা বিশ্ব থেকেই এখন অস্ত্র নির্মাণের কারখানার বিলুপ্তি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অস্ত্র এখন খেলনা। তাই সামরিক শক্তির জন্য নির্মিত অস্ত্র-শস্ত্র এখন লাভ করা সাধারণ মানুষের কাছে কত যে সহজ তা আর বলতে হয় না। প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক চোখকে ফাঁকি দিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে অসামরিক শক্তির শক্তি প্রদর্শন করতে মানুষ নিধন। আজ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে মানুষের ভবিষ্যত্ কোথায়? আজ প্রতিটি মুহূর্তে মানুষের কান্না ছাড়া হাসির আনন্দ ধ্বনি শোনার সম্ভাবনা নেই। গোটা বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর মিছিল। যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যেদিন থেকে বিজ্ঞান অস্ত্র তৈরির জ্ঞান বিকাশ ঘটাতে শুরু করল সেদিন থেকেই অহংকারী মানুষ বুঝে গেল ক্ষমতা এখন হাতের মুঠোয়। কাছাকাছি থেকে দৈহিক শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার দিন ফুরিয়েছে। আজ মানুষ বুঝে গেছে মানসিক লক্ষ্য ফলপ্রসূ করা কত সহজ। আসলে মানুষ সূচনালগ্নেই পেয়ে গিয়েছিল একটি দারুণ জিনিস, সেটি হলো মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কের জোরেই আজ সে হতে চায় বিশ্বের নকল অধীশ্বর। বর্তমান যুগের একটা প্রধান সমস্যা হলো প্রযুক্তি দ্রুত পাল্টাচ্ছে ঠিক, সেই সঙ্গে চিন্তাপদ্ধতি ততো দ্রুত পাল্টাচ্ছে না। ফলে দক্ষতা বাড়লেও প্রজ্ঞা হারিয়ে গেছে। তাই প্রজ্ঞাহীন মানুষের হাতে থাকা বিশ্বে গোটা মানবজাতি কতদিন টিকে থাকবে তা বলা অসম্ভব।
গোটা বিশ্বজুড়েই মানবজাতি আজ চরম দুঃখজনক পরিস্থিতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে গণহত্যার অস্ত্র নির্মাণজনিত বিপদের মূল্যায়ন করতে বিশ্বের রাজনীতিকদের বৈঠকে বসা, সেই বৈঠকে বিজ্ঞানীদেরও আমন্ত্রণ জানানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই বৈঠকে যারা মিলিত হবেন তারা কোনো জাতি বা ধর্মমতের সদস্য হিসাবে পরিচয় প্রদান করবেন না, বরং মানুষ হিসাবে, মানব প্রজাতির সদস্য হিসেবেই নিজেদের বক্তব্য পেশ করবেন। অবশ্য বলতে হয় রাজনৈতিক সচেতনতা তো মানুষের থাকবে। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেদের এক জৈবিক প্রজাতি হিসাবেও ভাবা দরকার। এই জৈবিক প্রজাতির ইতিহাস আছে। কোন অবস্থায় এই জৈবিক প্রজাতির অবলুপ্তি ঘটুক, তা কাম্য নয়।
তবে এটা বলতে হয় মানুষের মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হলে প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ইতিহাস শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইতিহাস শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে হবে। শিল্পকলা, আবিষ্কার বা অভিধান, যে কোনো বিষয়ে জ্ঞানের ব্যাপারে অপরাধমূলক বই, যুদ্ধসংক্রান্ত ঘটনাবলীর ওপর গুরুত্ব কম দিয়ে শান্তিপূর্ণ সাফল্যের ওপর বেশি করে গুরুত্ব দিতে হবে। উগ্র স্বাদেশিকতা প্রচার যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার সম্ভাবনাময় দিকগুলো সম্বন্ধে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলা। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সামগ্রিকভাবে মানবজাতির স্বার্থরক্ষা সংক্রান্ত চিন্তার অভ্যাস গড়ে তোলা।
লেখক :সাংবাদিক