পদ্মায় লঞ্চডুবি :আমরা শোকাহত
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৬
মাওয়া ঘাটের সন্নিকটবর্তী পদ্মাপাড়ের আকাশ-বাতাস এখনও ভারি। সেইখানে বুকফাটা আর্তনাদ ও আহাজারি অব্যাহত আছে। লঞ্চডুবিতে স্বজনহারা মানুষ এখনও তাহাদের প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় আছেন। কিন্তু তাহাদের এই প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হইতেছে না। গত সোমবার প্রমত্ত পদ্মার বুকে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাওড়াকান্দি ঘাট হইতে ছাড়িয়া আসা এমএল পিনাক-৬ নামক যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাটের সন্নিকটবর্তী লৌহজং চ্যানেলে আসিয়া ডুবিয়া যায়। তথ্যমতে, লঞ্চটিতে আড়াই শতাধিক, মতান্তরে তিন শতাধিক যাত্রী ছিলেন। ইতোমধ্যে তাহাদের ১১২ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হইয়াছে এবং পাওয়া গিয়াছে ২০টির মতো লাশ। তবে এখনও শতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রহিয়াছেন। গতকাল ভাটিতে ভাসিয়া উঠে কয়েকটি লাশ। তবে ব্যাপক তল্লাশির পরও গতকাল পর্যন্ত নিমজ্জিত লঞ্চটির কোনো হদিস পাওয়া যায় নাই। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগর্ডের উদ্ধার তত্পরতা এখনও অব্যাহত আছে। এই লঞ্চে নৌপরিবহন মন্ত্রীর তিন ভাগ্নিও ছিল এবং তাহারা দুর্ঘটনার শিকার হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আমরা যারপরনাই শোকাহত ও মর্মাহত। আমরা শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই সমবেদনা। আশা করি, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উদ্ধার তত্পরতা শীঘ্রই সমাপ্ত হইবে।
খবরে প্রকাশ, লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৮৫ জন। অথচ যাত্রী ছিল তাহার কয়েকগুণ বেশি। প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোত ও অতিরিক্ত যাত্রী এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। তাহাছাড়া লঞ্চটিতে ঢেউয়ের পানি উঠিবার পর আতঙ্কে যাত্রীরা একদিকে জড়ো হইলে লঞ্চটি ভারসাম্য হারাইয়া ফেলে বলিয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানা যায়। আসলে আমাদের বিমান ছাড়া বাসে, ট্রেনে ও লঞ্চে প্রকৃত যাত্রীসংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নহে। কেননা এইসব যানে সাধারণত আসন অনুযায়ী যাত্রী নেওয়া হয় না। অতিরিক্তি যাত্রী ও মাল বোঝাই ছাড়াও লঞ্চ দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ ত্রুটিপূর্ণ নৌযান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, দক্ষ ও লাইসেন্সধারী চালকের অনুপস্থিতি, চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়াভাবে নৌযান চালানো নৌপথে ডুবোচর ও নাব্যতা সংকট, সাইন-সিম্বলের অভাব ইত্যাদি। যাত্রী সাধারণের অসচেতনতা ও হৈ-হুল্লোড়ের কারণেও অনেক সময় ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। কেহ কেহ লঞ্চে উঠিয়া উচ্ছৃঙ্খল আচরণও করেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত দুই দশকে অর্থাত্ ১৯৯৪ হইতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬৫৮টি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে এই দেশে। ইহাতে মারা গিয়াছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার লোক। নিখোঁজ রহিয়াছেন আরও প্রায় দেড় হাজার। আর গত চার দশকে মারা গিয়াছেন দশ হাজার। প্রায় প্রতিটি বড় লঞ্চ দুর্ঘটনার পর সরকারিভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমিটির রিপোর্টই আলোর মুখ দেখে না। এই সংক্রান্ত মামলারও কোন সুরাহা হয় না। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭১-২০১৪ সালের মধ্যে এই ব্যাপারে ৫০০টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। তন্মধ্যে মাত্র ৫টি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। আবার প্রকাশিত তদন্ত কমিটির সুপারিশও কার্যকর করা হয় না। অর্থাত্ নৌদুর্ঘটনা বন্ধে আমাদের আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব আছে। ‘নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্প’ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকাইয়া থাকা তাহারও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই হতাশাজনক পরিস্থিতি হইতে আমাদের আগে বাহির হইয়া আসিতে হইবে।
ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো ও জলোচ্ছ্বাসের ন্যায় আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নূতন কিছু নহে। আমরা এইসব দুর্যোগ মোকাবিলার কিছু কৌশলও আয়ত্ত করিয়াছি। কিন্তু মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের যেন মাথাব্যথা কম। নৌযানের ফিটনেস নিশ্চিত করিতে না পারাটা নিঃসন্দেহে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যর্থতা। মাত্র চারজন সার্ভেয়ার দ্বারা সারাদেশের নৌযানের ফিটনেস ঠিক রাখা যায় না। এই সংক্রান্ত অর্গানোগ্রাম কেন সংশোধন করা হইবে না তাহাই আমাদের প্রশ্ন। দেখা যায়, নৌঘাটে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের ব্যাপারে আজকাল যথেষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হইতেছে। কিন্তু নৌকা করিয়া নদীর মাঝপথে যাইয়া লঞ্চে উঠিবার প্রবণতা বন্ধ করিবে কে? এই ব্যাপারে লঞ্চ মালিকদের যেমন দায়িত্ব রহিয়াছে, তেমনি যাত্রী সাধারণের সচেতনতাও দরকার। তাহারা জীবনের ঝুঁকি নিয়া কেনই বা লঞ্চে ওঠেন তাহাও এখানে বিবেচ্য বিষয়। অতএব, লঞ্চ বা নৌদুর্ঘটনা বন্ধে সকলকেই দায়িত্বশীল, সচেতন ও সতর্ক হইতে হইবে।