রাজনীতি
বিএনপি চায় আন্দোলন, জনগণ কি চায়?
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৪, ২১:১৯
আন্দোলনের হুমকি-ধমকিতে দেশের প্রতিটি স্তরের নাগরিক শঙ্কিত। সম্ভবত রাজনীতি-বিদরাও এই শঙ্কার বাইরে নেই। এমন শঙ্কার অন্যতম কারণ হলো বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব সহিংস আন্দোলন। সবার মনে একটাই ভয় আবার কী সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও! ঘর থেকে বের হলেই কী সহিংসতার মুখোমুখি হতে হবে? যদিও বিএনপি নেতৃবৃন্দ বারবারই বলছেন, আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ। এর আগেও বিএনপি চেয়ারপার্সন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। তবুও সৃষ্টি হয়েছিল অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা ও জ্বালাও-পোড়াও সংস্কৃতি। ফলে সেই সূত্র ধরে এবারও সাধারণ মানুষের শঙ্কা-উত্কণ্ঠার বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক। ঈদ-পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিএনপি প্রবল গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উত্খাতের ঘোষণা দিয়েই চলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে আন্দোলন? এটি কি সত্যিই সরকার পতনের আন্দোলন হতে পারে? এভাবে কি কোনো সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব? এসব উত্তর পাঠকরাই বিবেচনা করবেন। অনেকদিন থেকেই বিএনপি যে আন্দোলনের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন তার কোনো রূপরেখা আজও জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি। শুধু তাই নয়, এ পর্যন্ত আন্দোলনের সঠিক কোনো রোডম্যাপও বিএনপি জোট দিতে পারেনি। বর্তমানে এটি পরিষ্কার যে, বিএনপির আন্দোলনের একমাত্র ইস্যু হলো নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি এবং সেই সরকারের অধীনে আরেকটি নির্বাচন। আর এর জন্য দরকার বর্তমান সরকারের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া। তবে এসব বিষয়ে বিএনপি আজ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্মূলা দিতে পারেনি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের একটি ফর্মূূলা দিয়ে দেশবাসীকে হাস্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। তারপরে আজও নির্বাচনকালীন সরকার এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে কোনো রূপরেখা তারা দেয়নি। বাংলাদেশে বিগত সময়ের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি গণআন্দোলনের পেছনে একটি রোডম্যাপ এবং সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালের বিএনপির তথাকথিত আন্দোলনের কোনো রূপরেখা আমাদের চোখে পড়েনি। যদিও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী সমপ্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির এবং ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হবে। সেসব বৈঠকেই নাকি আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত এটা সবার কাছে পরিষ্কার যে, ‘ঈদের পর সরকার-বিরোধী আন্দোলন’ বলতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কী ধরনের কর্মসূচির কথা ইঙ্গিত করেছেন তা দলের নেতা-কর্মীদের কাছেও স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আপাতত শক্ত কোনো কর্মসূচি আসছে না। এই মুহূর্তেই কঠোর কোনো কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের শক্তি ক্ষয় করা যে বোকামি হবে সেটিও বিএনপি ভালো করে জানে। কাজেই বিএনপি নরম কর্মসূচির মাধ্যমেই আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এক্ষেত্রে ওইসব কর্মসূচিতে সফলতা পেলেই হয়তো শক্ত কর্মসূচির দিকে তারা দৃষ্টি দেবে।
অনেকের মুখেই একটি কথা শোনা যাচ্ছে যে, বিএনপির আন্দোলন কী জনসম্পৃক্ত হবে? এর উত্তরে সহজেই বলা যায়, আন্দোলন জনসম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা, অস্থিরতা, কাজে-কর্মে স্থবিরতা সবই জনবিমুখ হিসেবেই বিবেচিত হয়। এছাড়াও আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত জনসম্পৃক্ততার জন্য প্রয়োজন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যে ইস্যুতে আপামর জনসাধারণ একই প্লাটফর্মে দাঁড়াতে পারে কিংবা দাঁড়ানোর জন্য উদগ্রীব থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন কোনো জাতীয় সমস্যাসংকুল পরিস্থিতি নেই যে, তাতে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও দেশের জনমতের মাত্রায় যথেষ্ট দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে। তাছাড়া বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক শক্তির বিষয় নিয়ে বলার কিছু নেই। কাজেই নামে হলেও বিএনপিকে তাদের আন্দোলনকে ‘জনসম্পৃক্ত’ বলতে হবে। এ অবস্থায় বিএনপির কৌশল হতে পারে ছোট ছোট (তাদের ভাষায় ‘নরম’) কর্মসূচি দিয়ে জনগণের কাছে একটা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা। জনগণের আস্থা অর্জন না করলে আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা যাবে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আন্দোলনের নামে যা হয়েছে, তাতে মানুষের মনে ‘আন্দোলনভীতি’ তৈরি হয়েছে। ফলে বিএনপির ‘আন্দোলন’ শুধু বিএনপিরই থাকবে। তাতে জনগণের কোনো সম্পৃক্তি থাকবে না। রাজনীতিতে লাভবান হতে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করাটাই বড় কথা। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে সব অর্জন কিংবা আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে। অতএব এদিক থেকেও রাজনীতিবিদদের সতর্ক থাকা জরুরি।
বিএনপি আন্দোলনের হুঁশিয়ারিতে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও সরকার দলীয় কোনো কোনো হাই প্রোফাইল নেতা বিরোধী শক্তির হুংকারকে নানাভাবে উসকানি দিচ্ছেন। এতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আন্দোলনের হুমকি-ধমকি এবং উসকানি একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিএনপির আন্দোলন করার সাংগঠনিক শক্তি যে দুর্বল, এ বিষয়ে এখন আর কারো বুঝতে বাকি নেই। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে ঢালাওভাবে প্রচারের বিষয়টি নিতান্তই নিষ্প্রয়োজন। সাম্প্রতিককালের বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়ে টানাপোড়েনে অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে বিএনপির অবস্থান। এতে করে সাধারণ জনগণের বুঝতে আর বাকি থাকছে না কেমন হতে পারে বিএনপির আন্দোলনের রোডম্যাপ। প্রায়ই সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের মুখ থেকে শুনতে পাই যে, বিরোধীরা রাস্তায় নামলে সরকারি দল তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। এ কাজে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করবে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে যদি কোনো ধরনের সহিংসতার আভাস পাওয়া যায় তাতে অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বসে থাকা ঠিক হবে না। আর যদি আন্দোলন সত্যিকার অর্থেই শান্তিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে তা বিনাবাধায় পালনের সুযোগ করে দেয়াই ন্যায়সঙ্গত হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বাধা দিলে তা হবে গণতন্ত্রের বাধা। আমরা শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে রাজপথে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা চাই না।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের মূল আন্দোলন পরিকল্পনা হলো রাজপথে তাদের সহিংসতা সৃষ্টি। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার খাতিরে বিরোধী জোটকে রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমাদের প্রত্যাশা, তাদের কর্মকাণ্ড যেন অশান্তি সৃষ্টি ও জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে। তবে এ কথাও সত্য যে, বিরোধী জোট আন্দোলন থেকে বিরত থাকলেই দেশে বিরাজমান বিরোধের, বিশেষত নির্বাচন নিয়ে বিরোধের অবসান হবে না। বরং তাতে সমস্যা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে, যা আমাদের এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন ছাড়া সরকারকে উত্খাতের কোনো শক্ত ইস্যু বিরোধীদের কাছে নেই। সাংবিধানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেই গণতান্ত্রিক সরকারের পরিবর্তন ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। ইতিপূর্বেও তাই হয়েছে। এসব অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারে মেয়াদ পূর্ণ-পরবর্তী সাংবিধানিকভাবে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই সাধারণদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রত্যাশা। এতে বিএনপিসহ সকল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সহযোগিতা জনগণ আশা করে। কারণ দেশের প্রতিটি মানুষই বিরাজমান সমস্যার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চান। কেউই চায় না আন্দোলন কিংবা সহিংসতা।
প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি আন্দোলনের কথা বললেও আগামীদিনে ক্ষমতায় আসলে জনগণের জন্য কী করতে চান সে বিষয়ে কোনো রূপরেখা নেই কেন? ফলে আন্দোলনে সাধারণের সম্পৃক্ততা ঘটার বিষয়েও সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে অনেকেরই একটাই মত যে, এসব কারণেই সাধারণের কোনো সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হওযার সুযোগ বর্তমান পরিস্থিতিতে নেই। বিএনপি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে কী করবে, সে ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। বিএনপি আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমানে রাজপথে পরাস্ত করতে পারবে না। তবে এজন্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগিরা যদি মনে করে যে তারা অপ্রতিরোধ্য, তাহলে তারা ভুল করবে। বিএনপি ইতিপূর্বে এতটা খারাপ সময় অতিবাহিত করেনি। বিএনপির মধ্যে যে অনৈক্যের সূত্রপাত ঘটেছে তা থেকেই পরিষ্কার বুঝতে পারা যায় তাদের বর্তমান অবস্থা কেমন। কারণ সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ঐক্যের ডাকের প্রতিফলন ঘটেনি এখন পর্যন্ত। বেগম খালেদার এ আহ্বানের পর এখনো দলের বাইরে রয়ে গেছেন একসময়ের হেভিওয়েট নেতারা। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে শুরু করে ওয়ান-ইলেভেনের বিপর্যয় এবং তারপরও দল থেকে বহিষ্কার কিংবা অভিমানে দূরে সরে যাওয়া নেতাদের দলে ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিএনপি চেয়ারপার্সন ঐক্যের জন্য ডান-বাম কিংবা ছোট-বড় সকলকে আহ্বান জানালেও তার উত্তরসূরী নেতাদের এখনো কাছে পাননি। অপরদিকে তথাকথিত সংস্কারপন্থিদের তালিকার একটি বড় অংশ এখনো দলের বাইরে রয়েছেন। এছাড়া যারা ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে দল থেকে সরে গেছেন তাদেরকেও তিনি কাছে ডাকেননি। ফলে সরকার-বিরোধী আন্দোলন এবং দেশ গড়ার আন্দোলন সফল করার জন্য ঐক্যের আহ্বান ফ্লপ হচ্ছে বলে মনে করছেন খোদ বিএনপি নেতাকর্মীরাই।
কাজেই বিএনপি যে আন্দোলনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে তা আদৌ তাদের পক্ষে যাচ্ছে কিনা সে জন্যে দলের ভেতরে আরো সচেতনতা আবশ্যক। আর বিএনপির আন্দোলনের হুমকি-ধমকিকে সরকারদলীয় হেভিওয়েট নেতাদের পক্ষ থেকে যে পাল্টা উসকানি দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টিও নিতান্তই ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টির নামান্তর বলেই মনে হয়। সরকার-বিরোধীরা প্রতিনিয়ত যে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে তাতে সরকারের টনক নড়ার চেয়ে জনগণের শঙ্কার মাত্রাই বাড়ছে। অতএব এই মুহূর্তে বিএনপি যে আন্দোলন চায়, জনগণ তা চায় কিনা- তা ভেবে দেখার সময়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।