সাম্প্রতিক
লঞ্চটি কোথায় হারিয়ে গেল
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৪, ২১:২০
৪ আগস্ট দুপুর ১১টা কিংবা সোয়া ১১টা। অনেক মানুষের চোখের সামনেই মাঝনদীতে একদিকে কাত হয়ে ডুবে গেল যাত্রী বোঝাই লঞ্চটি। মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অনেকটা টাইটানিকের মত ডুবে গেল এম এল পিনাক-৬ নামের লঞ্চটি। প্রায় তিনশ’ যাত্রীর কেউ লাফিয়ে পড়ল, কেউবা আটকে পড়ল লঞ্চ নামের ওই মৃত্যুকূপে।
লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময় পাশ দিয়ে যাওয়া ফেরি থেকে অনেকে মোবাইল ভিডিও দিয়ে দৃশ্যটি ধারণ করেন। যেন অনেকটা সিনেমার মত দৃশ্য। প্রথমে একদিকে কাত হয়ে সামনে এগুচ্ছে, এর মধ্যে একটি বড় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। আর এরপরই ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিল লঞ্চটি। এক পর্যায়ে পুরো সলিল সমাধি হয়ে গেল লঞ্চটির। কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে ছেড়ে আসা এ লঞ্চটিতে ডোবার সময় প্রায় তিনশ’ যাত্রী ছিল।
ফেরি থেকে মোবাইল ফোনে তোলা লঞ্চডুবির ওই ছবি পরে টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্রিকায়ও ফলাও করে প্রকাশ হয়। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার কাজ শুরু করে। কিন্তু প্রবল স্রোতের কারণে স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ খুব একটা এগুতে পারেনি। তবে যাত্রীদের যারা লঞ্চের ভেতর থেকে বের হতে পেরেছিলেন এবং সাঁতার জানেন তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ফায়ার ব্রিগেড, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ অংশ নেয়। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান একাধিকবার ঘটনাস্থলে যান। দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের স্বজনদের নানা সান্ত্বনার বাণী শোনান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হতাশা বাড়তে থাকে।
এক পর্যায়ে আকাশে হেলিকপ্টার উড়িয়েও নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চ খোঁজার চেষ্টা হলো। নৌবাহিনী ও বিআইডাব্লিউটিএ জাহাজ খুঁজতে ‘সোনার’ যন্ত্র আনা হল। বলা হলো, সাইড স্ক্যানার সোনার নামের এ যন্ত্র দিয়ে দেখা যাবে নদীর কোথায় আছে লঞ্চটির অবস্থান। চিকিত্সা বিজ্ঞানে ব্যবহূত আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রের মতো এ সোনার যন্ত্রটি। সোনার বিশেষ কম্পাংকের শব্দ তরঙ্গ নদীর তলদেশে পাঠায়। এরপর ফেরত আসা প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নদীর তলদেশে থাকা বস্তু শনাক্ত করে। সোনারগুলো তার অবস্থানের দুই পাশে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার বস্তু শনাক্ত করতে পারে। গত দুই দিন ধরে সোনার নিয়ে নদীতে অনেকবার ঘুরে কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সোনারে ধরা না পড়া সম্পর্কে একজন সরকারি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেছেন, পদ্মার পানি ঘোলা হওয়ায় ‘সোনার’ যন্ত্রটি হয়ত কাজ করছে না। অন্যদিকে আরেকজন বলেছেন, পলি মাটিতে লঞ্চটি ঢেকে যাবার কারণেও সমস্যা হতে পারে। তার মতে, মাটিতে ঢেকে গেলে অনেক সময় যন্ত্রে ধরা পড়ে না অনেক কিছুই।
হারিয়ে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম এসেছে মাওয়া ঘাটে। আরেক উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক এলো ঘটনার আরো একদিন পর। তারাও খুঁজে চলছে নিখোঁজ লঞ্চটিকে। প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটির স্থান শনাক্ত হওয়ার পর উদ্ধারকাজ পরিচালনা করার।
দুর্ঘটনার পর ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে তিনদিন। কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না লঞ্চটিকে। লঞ্চে থাকা যাত্রীদের মধ্যে প্রায় দেড়শ’ নিখোঁজ। ধীরে ধীরে নিখোঁজ মানুষদের জীবিত পাওয়ার আশা কমছে। যদিও এখনও স্থানীয় প্রশাসন নিখোঁজদের তালিকা করছে। নদীতে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের নাম উঠে উঠে দীর্ঘ হচ্ছে তালিকা। সর্বশেষ হিসেব অনুসারে এ লঞ্চডুবিতে নিখোঁজের সংখ্যা ১৩২ জন। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান গত মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেছেন, তার ধারণা নিখোঁজ এ ১৩২ জনের কেউ বেঁচে নেই।
কিন্তু এতবড় একটি লঞ্চ কোথায় এত দ্রুত হারিয়ে গেল। এটিতো আর সমুদ্র নয়, অপরিচিত কোন নৌপথও নয়। এ যেন কয়েকমাস আগে হারিয়ে যাওয়া মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের সেই বোয়িং-এর মত ঘটনা। গত ৮ মার্চ ২৩৯ জন যাত্রী নিয়ে আজো নিখোঁজ হয়ে রয়েছে বোয়িং-৭৭৭।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাত্রাপথে সে নিখোঁজ হয়। গত কয়েকমাস পৃথিবীর প্রায় সব দেশ মিলে খুঁজেও হদিস পায়নি এ বোয়িংটির। অনেকের মতে, সম্ভবত গভীর সমুদ্রে এটি বিদ্ধস্ত হয়েছে। সমুদ্রের যেসব অংশে মানুষ এখনও যায় না, সেসব এলাকায় এটি বিদ্ধস্ত হওয়ার সম্ভবনাকেই বড় করে দেখছেন তারা। প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র এখনো কতটা প্রকট সেটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে এবার এই বিমান নিখোঁজের ঘটনায়।
কিন্তু পদ্মা নদীতে কি এভাবে দিনে দুপুরে একটি লঞ্চ হারিয়ে যেতে পারে। শত শত মানুষের চোখের সামনে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির আশা ছেড়ে দিতে হবে। নৌপথের নিরাপত্তা কি এই আমাদের? এ লঞ্চের হতভাগ্য যাত্রীদের স্বজনদের কাছে কি জবাব দেবো আমরা।
৪ আগস্ট থেকে স্বজনহারা মানুষ পদ্মার পাড়ে এসে কাঁদছেন। কখনও কখনও বিক্ষোভ করছেন, মিছিলও করছেন হতভাগ্য এ মানুষেরা। কাঁদতে কাঁদতে এখন অনেকের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। স্বজনকে জীবিত পাওয়ার আশা আর করছেন না তারা। এখন শুধু মরদেহটি নিয়ে যেতে চান। সেটি এখন সকলেরই চাওয়া।
লেখক : সাংবাদিক।
saikatasis@yahoo.com