সঞ্চয়কারী ও অবসরপ্রাপ্তদের মরণ আর কি!

গত ছয় তারিখে ব্যাংকের উপর একটা স্টোরি প্রকাশিত হয়েছে। এটি সুদের হার সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট খবরটিতে বলা হয়েছে দেশের সকল ব্যাংক আমানতের উপর সুদের হার কমাচ্ছে। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, ঋণ চাহিদার অপ্রতুলতার কথা। দেখা যাচ্ছে কোন কোন ব্যাংক এখন তিন মাসের মেয়াদি আমানতের উপর সুদ দিচ্ছে বাত্সরিক মাত্র ৭ শতাংশ। আট সাড়ে আট শতাংশ কেউ কেউ দিচ্ছে। কিন্তু প্রবণতা হ্রাসের দিকে। আজ এক হার তো কাল হ্রাসকৃত হার। আমানতের উপর সুদের হার কমছে তো কমছেই। এই কিছুদিন আগেও আমানতের উপর সুদের হার ছিল কমপক্ষে ১২ শতাংশ, অনেক ক্ষেত্রে তেরো সাড়ে তেরো শতাংশ। বাজারে এরপরেও কোন আমানত পাওয়া যায়নি। আজ আমানতে আমানতে ব্যাংকগুলো সয়লাব। ঋণের কোন চাহিদা নেই। অতিরিক্ত তারল্যে ভুগছে সব ব্যাংক। ঋণ নেয়ার লোক নেই। অবস্থা এমন যে ব্যাংকগুলোতে বলছে “ঋণ লাগবে গো ঋণ।” এই যে অবস্থা এটাও ব্যাংকিং খাতের একটা বড় শিক্ষা। কখনও আমানতে আমানতে ব্যাংকগুলো সয়লাব হয় অতিরিক্ত তারল্যে। আবার কখনো কখনো বাজারে আমানত নেই। ঋণ নেয়ার লোক আছে। এই অস্থিতিশীলতার মধ্যেই ব্যাংকগুলোকে কাজ করতে হয়। অথচ ব্যাংকের বাইরের লোকেরা এই সমস্যা বুঝতে চায় না। এতে যে শুধু ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক পক্ষ। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমানতের উপর সুদের হার কমলে ব্যবসায়ীরা গড়ে সবাই খুশি, কোন কোন অর্থনীতিবিদও খুশি। তারা মনে করেন উচ্চ সুদের আমানতের জন্যই উচ্চ ঋণের সুদ এবং তাই দেশের শিল্পায়ন ক্ষতিগ্রস্ত। ২. এসব আলোচনায় আমানতকারীদের স্বার্থ চলে যায় পেছনে। এতে যে বিপুল সংখ্যক আমানতকারী/সঞ্চয়কারী মরতে বসে তার খবর সরকারও রাখে না, অর্থনীতিবিদরাও রাখেন না, ব্যবসায়ীরা তো রাখেনই না। উদাহরণ দিই। বলেই ফেলি আমানতকারীদের মধ্যে আজ সত্যি সত্যি সঞ্চয়কারী, যারা মধ্যবিত্ত, যারা অবসরপ্রাপ্ত, যারা নির্দিষ্ট আয়ের উপর নির্ভরশীল তারা সুদের হার হ্রাস পেলে মারা যায়। তাদের বাঁচানোর কোন লোক নেই। এদের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প’ নেই। এরা কারো কাছে হাত পাততে পারে না। এরা দেনায়, ধারে যেতে চায় না। এরা মুখ বুঁজে সব সহ্য করে। এরা রাস্তায় বাস ভাঙতে পারেন, পুলিশকে উদ্দেশ করে ঢিল ছুঁড়তে পারে না, এরা খবরের কাগজে চিঠিপত্রও লিখতে চায় না। বলাবাহুল্য, সুদের হার হ্রাসে এই শ্রেণির লোক এখন মরছে। তাদের কথা কেউ বলে না। একজন সঞ্চয়কারী অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোকের, ধরা যাক, এক কোটি টাকার মেয়াদি আমানত আছে। এটা তার সারাজীবনের সঞ্চয়। এখানে আছে তার প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুয়িটির টাকা। আছে প্রতিবছর তিলে তিলে সঞ্চয় করা টাকা যা সে গ্রামাঞ্চলে নানাভাবে খাটিয়ে সঞ্চয়কে বৃদ্ধি করেছে। এখন এই টাকাই তার সম্বল। এর থেকে তার দৈনন্দিন খরচ চলে। চলে মাসিক চিকিত্সার খরচ। ভাঙ্গা গাড়ি যা আছে তার খরচও এখান থেকেই। অবশ্যই কিছু সাপোর্ট পায় বিদেশে অবস্থানরত ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে যা সে নিতে চায় না। শত হোক তাদেরও তো একটা ভবিষ্যত্ আছে। ৩. এই এক কোটি টাকার উপর একবছর আগেও ঐ ভদ্রলোক সুদ পেতো ১৩ শতাংশ হারে ১৩ লাখ টাকা। ধরা যাক ১০ শতাংশ হারে উেস আয়কর কাটতো ব্যাংক। অতএব তার বাত্সরিক সুদ আয় হয় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। মাসে হয় ৯৩,৩৩৩ টাকা। বর্তমান অবস্থা কী? বর্তমানে যে ব্যাংকে ভদ্রলোক টাকা রাখেন সেখানে সুদের হার মাত্র ৭ শতাংশ। এর অর্থবছরে তার সুদ আয় মাত্র ৭ লাখ টাকা। মাসে হয় মাত্র ৫২,৫০০ টাকা। কারণ সুদ আসে ৭০ হাজার টাকা। তাকে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। কী দাঁড়াল? দাঁড়াল ভদ্রলোকের আয় মাসিক কমলো ৪০,৮৩৩ টাকা। ভাবা যায় আয় হ্রাসের গতি। এখন তার আয় হ্রাসের সাথে তুলনা করা যাক মূল্যস্তরের। গত একবছরে কোন একটি জিনিসের দাম কী কমেছে? ওষুধপত্রের দাম কী কমেছে? চিকিত্সার খরচ কী কমেছে? ড্রাইভারের বেতন, শাক-সবজির দাম, মাছ-মাংস, হাঁস-মুরগির দাম, চালের দাম কোন্ জিনিসটির দাম কমেছে? কমার প্রশ্নই ওঠে না। একটি জিনিসের দাম বেড়েছে। অর্থাত্ আয়, মাসিক আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে অথচ জিনিসের দাম কমপক্ষে ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত লোকজন, বেওয়া-বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা, স্বল্প সঞ্চয়কারী, নির্ভরশীল লোকজন, পোষ্য ব্যক্তিরা কীভাবে চলবে? এই প্রশ্নটি কী সরকার বাহাদুর, অর্থমন্ত্রী, সরকারের ‘সারিন্দা’দের জিজ্ঞাসা করা যায়? ৪. এই যে উদাহরণ দিলাম এ ধরনের লোক দেশে এখন লাখ লাখ। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে এই শ্রেণিতে এত লোক পড়তো না, আজকাল পড়ে। তাদের কথা ভাবার কোন লোক নেই। এই অবস্থার সৃষ্টি কেন হল? দেশে যখন এখনও ৮-৯ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে তখন ব্যাংকগুলো হঠাত্ করে ৭-৮ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে কেন আমানতের ওপর? এটা কী তাদের স্বেচ্ছামূলক আচরণ, এটা কী তাদের নির্যাতনমূলক আচরণ। না, এটা মনে করার কোন কারণ নেই। প্রকৃত ঘটনা কী? ঘটনা হচ্ছে ব্যাংকের হাতে টাকা আছে, আমানতের টাকা আছে, কিন্তু ঋণগ্রহীতা পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যত্সামান্য। যে হারে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে মোটামুটি সে হারেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে। তার মানে ঋণ বাড়ছে না। আবার সরকারি ব্যাংকের কিছু কিছু গ্রাহক থাকলেও তারা ঋণ দিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞার কারণে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যত ‘নো লোন’ নীতি অনুসরণ করছে। তারা বলছে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য মূল্যস্ফীতি ঠেকিয়ে রাখা। এই যুক্তি ফেলনা নয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে গিয়ে ঋণ সংকোচনের নীতি কী বাস্তবানুগ? এতে করে ৭ শতাংশ ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে তা বাস্তবায়িত হবে কী করে? এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পণ্ডিতরা এর জবাব দিতে পারবেন। কথা যখন উঠলই তখন একটা প্রশ্ন তুলি। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক ঋণ নীতির কারণেই এটা ঘটছে না। দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হরে-দরে অনেক দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে বিদেশে ঋণ করতে উত্সাহিত করছে। এর মধ্যে দৃশ্যত অনেক সফলকাম কোম্পানি আছে। আমি নাম উল্লেখ করে আলোচনা করতে চাই না যদিও তালিকাটা আমার কাছে আছে। এখানে দেখা যাচ্ছে তারা এ পর্যন্ত ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিদেশে করেছে। এটা ডলার ঋণ। ভাল ভাল কোম্পানি! বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। বহু নামকরা কোম্পানি, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই ঋণখেলাপি হয়েছে। উপরে উপরে তারা ভাল। কিন্তু পরিণামে অনেক কোম্পানি ব্যাংকগুলোকে ডুবিয়েছে, ডুবাচ্ছে। তারা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ কাঠামো পরিবর্তন, স্বল্পমেয়াদী ঋণকে দীর্ঘমেয়াদী করে কোনমতে কাগজে-কলমে বেঁচে আছে। নাম বলতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু নামোল্লেখ করা সঙ্গত নয়। বলাবাহুল্য এরা বিদেশ থেকে ঋণ করছে স্বাধীনভাবে নয়। বিদেশি ব্যাংক ডলারে ঋণ দেয়ার সময় নিশ্চয় স্থানীয় ব্যাংকের ‘স্টান্ডবাই গ্যারান্টি’ নিয়েছে। এই গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ দেয়ার কথা নয়। এর অর্থ যদি তারা ঋণের টাকা ডলারে দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে স্থানীয় ব্যাংককে ডলারে সেই টাকা পরিশোধ করতে হবে। এখানে দুটো প্রশ্ন। যদি ঐ রকম অবস্থা হয় তাহলে স্থানীয় ব্যাংক তা পারবে কীনা, দ্বিতীয়ত. ডলার তখন পাওয়া যাবে কীনা। অনেক প্রশ্ন। কথা সহজ, যদি তাই হয় তাহলে স্থানীয় ব্যাংক থেকে এদের ঋণ দিতে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে কেন? বলা হবে সুদের হারের কথা। বিদেশি ব্যাংকের ডলার ঋণ সুদ কম, দেশি ব্যাংকে টাকা ঋণে সুদ বেশি। সত্যি। কিন্তু প্রশ্ন সুদের হারই একমাত্র বিবেচ্য নয়। অর্থনীতিতে নানা বিবেচ্য বিষয় আছে। দেখা যাচ্ছে এই ঘটনার জন্য স্থানীয়ভাবে ঋণের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এতে ব্যাংকের তারল্য উদ্বৃত্ত হচ্ছে, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের। সরকারি ব্যাংক ইচ্ছে করলেই পারে না। এসব প্রশ্ন বাদেও আরেকটা প্রশ্ন আছে। দেখা যাচ্ছে অনেক বিদেশি কোম্পানিকেও বিদেশি ঋণ দিতে উত্সাহিত করা হচ্ছে। এটা আমি বুঝতে পারছি না। তাদের বিদেশ থেকে নিজের মূলধন নিয়ে আসার কথা, তারা তাদের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করতে পারে। এসবের অনুপস্থিতিতে আমরা কেন তাদেরকে ডলারে ঋণ করতে উত্সাহিত করব। দেখতে পাচ্ছি এর স্থানীয় মুদ্রায়ও ঋণ করছে কেউ কেউ। এটা কেমন কথা। তাহলে বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে কেন? বিদেশি নামকরা কোম্পানিগুলো যদি লাভ পুনঃবিনিয়োগ না করে, বিদেশ থেকে যদি তারা অধিকতর পরিমাণ পুঁজি না আনে তাহলে আমাদের কী লাভ হলো—এ বিষয়টি কেউ বুঝিয়ে বললে খুশি হবো। দেখা যাচ্ছে এরা আবার কর ফাঁকিও দেয়। তাহলে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল ভুল নীতির কারণে আজ অর্থনীতি ভুগছে, ব্যাংকগুলো ভুগছে। পরিণামে ভুগছে লাখ লাখ আমানতকারী, সঞ্চয়কারী। ভুগছে বিরাট সংখ্যক মধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্ত আবার করের যন্ত্রণায়ও উত্পীড়িত। এদের আয় হ্রাস পাচ্ছে, এদের বেশি মূল্যে জিনিসপত্র খেতে হচ্ছে, আবার এদের বেশি বেশি কর দিতে হচ্ছে। এদের কোন স্বস্তি নেই। এক বন্ধু কয়েকদিন আগে কলকাতা থেকে ঘুরে আসল। তার বয়স ৬৫’র উপরে। ট্রেনে, বিমানে, চিকিত্সায় সে বাংলাদেশি হয়েও সর্বত্র ‘ডিসকাউন্ট’ পেয়েছে। হতভাগা সোনার বাংলা! সারাজীবন কর দিয়েও এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়স হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজ দেশে কেন রেয়াত পাচ্ছে না। বরং সুদ হ্রাস, মূল্য স্ফীতি ও করের বোঝা নিয়ে তাকে বসবাস করতে হচ্ছে। কেউ কী বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করবেন? সরকারের চামড়া বড় মোটা— এটাই এখন মনে হয়। লেখক:অর্থনীতিবিদ