চলাচলের অনুপযোগী যত সড়ক

ইন্টারনেটে ‘চলাচলের অনুপযোগী সড়ক’ লিখিয়া সন্ধান চালাইলে যেই বিপুল খবরের সন্ধান মেলে তাহা যে কাহারো কপালে ভাঁজ ফেলাইয়া দিতে পারে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের এই বিপুল সম্ভার হইতে একটুখানি চোখ বুলাইবার পর মনে হইতে পারে, যত সড়ক বেহাল আছে, তাহা তৈরির সময় কি রক্ষণাবেক্ষণের শর্তটি একবারও বিবেচনায় রাখা হয় নাই? অসংখ্য রাস্তা বত্সরের পর বত্সর, এমন কি কোনো কোনোটি এক যুগের মধ্যেও, কখনও সংস্কারের মুখ দেখে নাই। রাজধানীর মৃধাবাড়ি হইতে শ্যামপুর পর্যন্ত জিয়া সরণি এমনই একটি সড়ক। সারা দেশে এই ধরনের রাস্তার অভাব নাই। জলা জঙ্গলের এই দেশে সড়কপথ বলিতে মাত্র শতাব্দীকাল পূর্বেও প্রায় কিছুই ছিল না। মাকড়শার জালের মতো বিস্তৃত নৌপথকেই চলাচলের উপায় মানিয়া এক স্থান হইতে অন্যস্থানে যাতায়াত করা হইত। যুগের প্রয়োজনে সড়ক পথের বিস্তার ঘটিয়াছে ব্যাপক। একস্থানের সহিত অন্যস্থানের সংযোগ ঘটিবার ফলে মানুষের জীবন-জীবিকার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়াছে। বলা যায়, অর্থনৈতিক কর্মস্রোতের প্রবহমানতা অব্যাহত রাখিবার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হইল যোগাযোগব্যবস্থা। একটি বিস্তৃত স্থলপথ; সড়ক হউক, কিংবা এক পল্লী হইতে অন্যপল্লীতে গমনের সরুপথই হউক—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ওইসবের কমবেশি ভূমিকা থাকে। সেই কারণে সামান্য-অসামান্য সকল ধরনের প্রয়োজনেই বিগত চার দশকে আমাদের দেশে ছোট-বড়-মাঝারি সড়ক নির্মিত হইয়াছে ব্যাপক হারে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ছাড়াও বিবিধ কর্মসূচী ও প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত হইয়াছে অসংখ্য রাস্তা। রাজপ্রাসাদও বট-অশ্বত্থবৃক্ষের জঙ্গলবাড়িতে রূপান্তর হইতে পারে, যদি তাহার নিয়মিত পরিচর্যা ও সংস্করণ করা না হয়। আর, নিত্য ব্যবহারের রাস্তা তো এই শর্তেই জন্ম নেয় যে, তাহাকে নিয়ম করিয়া দেখভাল করিতেই হইবে। কিন্তু এই দেশে নানা উপায়ে এন্তার রাস্তা তৈরি হইলেও সৃষ্টির সড়কটির জন্মের শর্তটিতে মনোযোগ না দিয়া নির্বিচার ব্যবহারে তাহাকে জীর্ণ-শীর্ণ করিয়া জন্মের পূর্বেকার রূপে ফিরাইয়া দেওয়া হয় অতি দ্রুত। সেই অবস্থাও চলিতে থাকে বত্সরের পর বত্সর। তাহার কারণটি উপলব্ধি করা যায় উপকথার একটি গল্পের মধ্য দিয়া। এক খলিফার কাছে একজন দেড় হাত কাপড় লইয়া বলিয়াছিল পাঞ্জাবি তৈরি করিয়া দিতে। পাঞ্জাবি তৈরির পর যেইটুকু কাপড় বাঁচিবে তাহা দিয়া একটি হাফ প্যান্টালুন তৈরি করা যাইবে নিশ্চয়ই। এমনটি ভাবিয়া তাহারও অর্ডার দেওয়া হইল। খলিফা রাজি হইলে তাহার মনে হইল একটি অন্তর্বাসও নিশ্চয়ই তৈরি হইবে। তাহা পর একটি রুমালেরও অর্ডার দেওয়া হইল। খলিফা সেই কাপড় দিয়া কয়েকটি ‘পোশাক’ তৈরি করিলেন বটে, কিন্তু তাহা এতই ছোট হইল যে, একটি সদ্যজাত শিশুর জন্যও পরিধানযোগ্য হইল না। আমাদের অবস্থাও তদ্রূপ। রাস্তা প্রথম দফায় নানা উপায়ে দাঁড় করানো সম্ভব হইলেও তাহা রক্ষণাবেক্ষণের আর্থিক সীমাবদ্ধতায় রক্ষা করা সম্ভব হইয়া উঠে না। অথচ একটি রাস্তা প্রাথমিকভাবে তৈরি হইলে তাহাকে ঘিরিয়া, ক্ষুদ্র পরিসরে হইলেও, একটি অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলও গড়িয়া ওঠে। সুতরাং পরবর্তীতে সেই রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখাও আবশ্যক হইয়া পড়ে। এই সামগ্রিক বিষয়টি মাথায় রাখিয়া সামর্থ্যের পরিসর বৃদ্ধি করার বিকল্প নাই। কীভাবে তাহা করা সম্ভব, তাহা লইয়া ভাবিয়া দেখিতে হইবে।