সাম্প্রতিক
উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৭
ইলিশ ধরার মৌসুমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলেরা জলদস্যুদের আতঙ্কে ভুগছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী প্রতিটি চ্যানেলে তাদের আনাগোনা বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বেড়েছে। জলদস্যুদের উত্পাত বন্ধে কোস্টগার্ডের তত্পরতা থাকলেও তা জেলেদের মধ্যে নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। দেশের উপকূলভাগ দীর্ঘদিন ধরেই জলদস্যুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সততার সংকট থাকায় জলদস্যুদের অপ্রতিরোধ্য অবস্থার অবসান ঘটছে না।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় প্রতিটি এলাকার জেলেদের মাছ ধরতে হয় জলদস্যুদের নির্দিষ্ট ‘খাজনা’ দিয়ে। দস্যু পাস ছাড়া কোনো জেলের পক্ষে বঙ্গোপসাগর উপকূলে মাছ ধরা নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার শামিল। জলদস্যুদের বখরা দিয়ে মাছ ধরতে হয় বলে সামপ্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকছে না। দেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা বরিশাল ও সুন্দরবন উপকূলই শুধু নয়, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী উপকূলেও জলদস্যুদের উত্পাত সীমা অতিক্রম করতে চলেছে। র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে কখনো কখনো জলদস্যুদের ওপর আঘাত হানা হলেও কার্যত এ দুর্বৃত্তদের সামাল দেয়ার আর কোনো উদ্যোগ নেই। জলদস্যুদের কারণে বঙ্গোপসাগর উপকূল নিরাপত্তাহীন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ছে।
প্রতি বছর ইলিশ মৌসুম এলেই বঙ্গোপসাগরে মত্স্য আহরণে নিয়মিত অংশ নেয়া জেলেপল্লীগুলোয় সাজ সাজ রব পড়ে। তবে অধিকাংশ সময়েই এই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী হয় না। জলদস্যুদের হামলায় প্রাণ হারানো, জাল, নৌকা বা ট্রলার খোয়ানোর ভয়, এমনকি আহরিত মাছ লুট হওয়ার আশঙ্কা জেলে, ট্রলার মালিক ও দাদন দেয়া আড়তদারদের ঘিরে ধরে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, গত বছর ইলিশ মৌসুমে কেবল বরগুনার পাথরঘাটায় ২৬ জেলে প্রাণ হারিয়েছেন জলদস্যুদের হাতে। মাছ ও ট্রলার লুট এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে অপহরণের ঘটনা কম নয়। কিন্তু জেলেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বহাল থাকা সত্ত্বেও বেআইনি সশস্ত্র জলদস্যুদের নজরানা দিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘটনা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে এক অর্থে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। এসব জলদস্যু দল নিশ্চয়ই আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে অধিক শক্তিশালী নয়। তার পরও তারা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে সরকারি দল ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে আরও জানা গেছে, এক জলদস্যু দলের প্রধানকে আটক করার পর ক্ষমতাসীনদের চাপে তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, জলদস্যু দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আঁতাত রয়েছে।
এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুদের অপতত্পরতা বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোথাও জলদস্যুদের তত্পরতা থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে এ জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে হবে। গোয়েন্দা তত্পরতার মাধ্যমে জলদস্যুতার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের গ্রেফতারের উদ্যোগ নিতে হবে। জলদস্যুদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া দরকার। জলদস্যুরাও উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যদি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষমতাসীন দলের কারও সুপারিশে কোনো অপরাধীকে ছেড়ে না দেয়ার ব্যাপারে যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্দেশজারি হয়, তাহলে উপকূলীয় এলাকায় কিংবা গভীর সমুদ্রে জলদস্যুদের উত্পাত কমে যেতে বাধ্য।
লেখক : সভাপতি, এলডিপি ঢাকা মহানগর, চেয়ারম্যান মেহেদী গ্রুপ