যুদ্ধাপরাধের দায় কি
দলেরও নয়?
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪১
আমেরিকার কোনো সরকারি প্রতিনিধি যখনই ঢাকায় আসেন এবং মুখ খোলেন তখনই আমার ভয় হয় এবার চোরের মায়ের বড় গলা শোনা যাবে। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত তো ঢাকায় আসতে না আসতেই বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচন সম্পর্কে অনভিপ্রেত কথা বলতে শুরু করেছেন। যে নির্বাচনের পর বাংলাদেশে শান্তি বিরাজ করছে এবং জনগণের মনে কোনো ক্ষোভ নেই, সেই নির্বাচনটি নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের উদ্বেগের অন্ত নেই এবং বিষয়টিকে খুঁচিয়ে তুলে দেশটিতে আবার অশান্তি সৃষ্টির তালে তারা আছেন বলে অনেকে সন্দেহ করেন।
গাজায় যখন ইসরায়েলি বর্বরতায় অসংখ্য নর-নারী, শিশুর জীবনান্ত ঘটেছে, আমেরিকার দেয়া অস্ত্রে অঞ্চলটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরায়েল, তখন বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত ব্যাপারে মানবতার বাণী ছড়াতে এসেছেন আরেক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যাপ। তার আসল পরিচয়টি নতুন করে দেয়ার দরকার নেই। তার প্রচেষ্টা বাংলাদেশে ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধ থেকে জামায়াতকে বাঁচানো। জামায়াত একটি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি মৌলবাদী দল। একাত্তর সালে বাংলাদেশে গণহত্যায় পাকিস্তানের হানাদারদের দোসর সেজেছিল। কিন্তু এই দলটির প্রতি ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান নির্বিশেষে মার্কিন প্রশাসনের অসীম দরদ।
ভারতের গুজরাত রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগে নরেন্দ্রনাথ মোদী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালেও আমেরিকায় যাওয়ার ভিসা পাননি। কিন্তু বাংলাদেশের ’৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী মানবতার শত্রুরা—বিশেষ করে ঘাতক দেলোয়ার হোসেন সাঈদী যখন খুশি তখন মার্কিন ভিসা নিয়ে সেদেশে গেছেন এবং ওয়াজ-নসিহতের নামে জামায়াতি প্রচারণা চালিয়ে প্রচুর ডলার পকেটে দেশে ফিরেছেন। কানাডায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিরোধের মুখে সাঈদীকে পালাতে হয়েছিল।
বাংলাদেশে ’৭১ এর নির্মম গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য দায়ী যে জামায়াত, তাকে মাত্র কয়েক বছর আগে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতেরা চিহ্নিত করেছিলেন একটি মডারেট মুসলিম ডেমোক্র্যাট পার্টি হিসেবে। ২০১১ সালে এই স্টিফেন র্যাপ সাহেবই বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং দেশটির বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার জন্য দাবি করেছিলেন ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হোক।
স্টিফেন র্যাপের পরিচয় তিনি যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ মার্কিন দূত। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কথাবার্তা ও কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, এই বিশেষ দূতের কাজটি হচ্ছে বাংলাদেশের একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী বিশেষ করে এই যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতকে রক্ষা করা। এবারেও তিনদিনের সফরে ঢাকায় এসে গত ৫ আগস্ট মঙ্গলবার ঢাকায় আমেরিকান সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “যুদ্ধাপরাধের দায় ব্যক্তির, দলের নয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্যক্তিবিশেষের সংশ্লিষ্টতা ছিলো, দলের নয়। সুতরাং ঢাকার ট্রাইব্যুনালে দলকে শাস্তি দেয়ার জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনায় আনা সমীচীন মনে করি না। রাজনৈতিক দলকে দোষী সাব্যস্ত করাটা যথাযথ হয় না।” বাংলাদেশ সরকারের জামায়াত-বিরোধী প্রচেষ্টা সম্পর্কেই এই উক্তি।
বাংলাদেশের মানুষকে একেবারে নিরেট বোকা অথবা নাবালক মনে না করলে ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় উড়ে এসে এ ধরনের কথা বলার ধৃষ্টতা কোনো মার্কিন দূত দেখাতেন না। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার কোনো সাংবাদিক র্যাপ সাহেবকে একথা বলেছেন কিনা আমি জানি না, বাংলাদেশে একাত্তর সালের যুদ্ধাপরাধে গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী প্রমুখ ব্যক্তিবিশেষ ছিলেন সক্রিয় এবং নির্দেশদাতা। কিন্তু অপরাধটি সংঘবদ্ধভাবে করেছে জামায়াত। এই অপরাধ করার জন্য রাজাকার, আল শামস, আল বদর ইত্যাদি নামে বহু ঘাতক উপদল তারা সৃষ্টি করেছিল। তাদের নৃশংসতা জার্মানীর নািস বর্বরতার সমতুল্য।
এখানেই জামা-য়াতের অপরাধের শেষ নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে এই দলটিকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন তাদের নেতারা কেউ পাকিস্তানে পলাতক থাকেন এবং অনেকেই দেশে আত্মগোপন করে অন্তর্ঘাতমূলক-ভাবে লিপ্ত হন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াত দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়নি, বরং সামরিক শাসকদের কৃপায় দেশে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিশেষ করে সেক্যুলার রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিরাকাটা, রগকাটা, গুপ্ত হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাসী রাজনীতির পথ গ্রহণ করে। জামায়াতের সহযোগী ছাত্র শিবির আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত একটি সন্ত্রাসী দল।
গত ৫ জানুয়ারির আগে বাংলাদেশে নির্বাচন বর্জনের নামে যে আন্দোলন হয়, তা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, ছিল ভয়াবহ সন্ত্রাস। হরতালের নামে নিরীহ মানুষ (শিশুসহ) পুড়িয়ে মারা ছিল এই সন্ত্রাসের বৈশিষ্ট্য। দেশের বনসম্পদ এই জামায়াত ধ্বংস করেছে। রেললাইন উপড়ে ফেলেছে। বিদ্যুত্ কেন্দ্র বন্ধ করেছে। একাত্তরের মতোই আরেকটি যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি করেছিল জামায়াত। এই দলটিকে শুধু নিষিদ্ধ করা নয়, এই দলের নতুন নেতাদেরও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কিছুমাত্র অন্যায় হতো না।
স্টিফেন র্যাপকে ঢাকার কোনো সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছেন কিনা জানি না, যুদ্ধাপরাধ যদি ব্যক্তিদের হয় এবং সেজন্য বেছে বেছে তাদেরই বিচার করতে হয়, তাহলে পাকিস্তানে, আফগানিস্তানে, ইরাকে বেছে বেছে সন্ত্রাসীদের ধরে বিচার ও দণ্ড না দিয়ে নির্বিচার ড্রোন হামলায় বর্বরোচিত-ভাবে নিরীহ নারী-শিশু হত্যা করা হচ্ছে কেন? সন্ত্রাসের জন্য আল-কায়েদা ও তালেবানদের সমষ্টিগতভাবে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো হচ্ছে কেন? ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পরই তো পাকিস্তানে ভয়াবহ ড্রোন হামলা বন্ধ করা উচিত ছিল। তাছাড়া ওসামা বিন লাদেনকে জীবিত গ্রেফতার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিনা বিচারে তাকে হত্যা করার হুকুমনামায় প্রেসিডেন্ট ওবামা সই দিলেন কিভাবে? মানবতার জন্য যদি আমেরিকার এতোই দরদ, তাহলে লাদেনসহ আল-কায়েদা নেতাদের একে একে হত্যা (মৃত্যুদণ্ড) করার বদলে ‘মানবতার খাতিরে’ ধরে এনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দানের সুপারিশ কেন করেননি তখন স্টিফেন র্যাপ সাহেবেরা?
সবচাইতে বড় কথা, যুদ্ধাপরাধের দায় যদি কেবল ব্যক্তির হয়, তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দায়তো কেবল হিটলার, মুসোলিনী, হিমলার, গোয়েরিং, তোজো প্রমুখ কয়েক ব্যক্তির। তাদের বিচার করে দণ্ড (তাও মৃত্যুদণ্ড নয়) দিলেই তো চলতো। হিটলার, হিমলার, গোয়েবলসের যুদ্ধাপরাধে তাদের দল নািস পার্টিকে সারা ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে কেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৬৯ বছর পরও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে? জার্মানীতে এখনো ‘হাইহিটলার’ বলা এবং নািস দলের কার্যকলাপ চালানো দণ্ডযোগ্য অপরাধ!
সবচাইতে মজার ব্যাপার এই যে, আমেরিকায় যেতে বিদেশিদের যে এন্ট্রি পারমিশনের আবেদনপত্রটির প্রশ্নাবলির জবাব লিখতে হয়, তার একটি প্রশ্ন হলো-‘আপনি কি কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নািস দল, তার কার্যকলাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অথবা নািসদের সমর্থক ছিলেন? যদি এই প্রশ্নটির জবাব হ্যা হয় তাহলে আপনি আমেরিকায় ঢোকার অনুমতি পাবেন না। এটাই যেদেশে যুদ্ধাপরাধের জন্য দলকে দায়ী করার আইন, সে দেশের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত বিশেষ দূত স্টিফেন র্যাপ এসেছেন, সেই একই আইন যাতে বাংলাদেশে চালু না হয় সেজন্য উপদেশ দিতে। কাণ্ডজ্ঞান থাকলে এটা একটা বৃহত্ শক্তির প্রতিনিধি করতে পারেন না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকার ভণ্ডামির সীমা নেই। গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতায় নিহত হয়েছে ১৪০০ নিরীহ নর-নারী, যুবা-বৃদ্ধ। সেজন্য প্রেসিডেন্ট ওবামার কোনো উদ্বেগ নেই। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একজন মাত্র ইসরায়েলি সৈন্য হামাস কর্তৃক অপহূত হওয়ায়। তিনি অপহূত সৈন্যকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেছিলেন, এই ইসরায়েলিকে মুক্তি দেয়া না হলে শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে দেড় হাজারের মতো নিরীহ মানুষের হত্যাকাণ্ড গুরুত্ব পায়নি; গুরুত্ব পেয়েছে একজন মাত্র ইসরায়েলি সৈন্যের অপহরণ। অবশ্য এই অপহূত সৈন্যটির প্রাণ রক্ষা পায়নি।
ঢাকাতেও গাজার বর্বর গণহত্যা সম্পর্কে র্যাপ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি অম্লান বদনে বলেছেন, তার সরকার যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অর্থাত্ এই গণহত্যার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকা হচ্ছে শান্তির লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসনের কাজ করে যাওয়ার উদাহরণ। আর ইরাকে একই “যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে” ওবামা প্রশাসন আবার ভয়াবহ বোমা হামলা শুরু করেছে।
যুদ্ধাপরাধের জন্য দল দায়ী নয়, ব্যক্তি দায়ী। যদি তাই হবে তাহলে ৬৯ বছর আগে যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ হয়েছে, সেই যুদ্ধের সময় সিঙ্গাপুরে, মালয়ে, বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) আটক ব্রিটিশ নারীদের ধর্ষণ করার জন্য কেবল জাপানের কিছু সৈন্যকে দায়ী না করে গোটা জাপানকে কেন দায়ী করা হচ্ছে এবং জাপান সরকারকে বলা হচ্ছে এই যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে এবং জীবিত ধর্ষিতাদের এবং মৃত ধর্ষিতাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে? জাপান সরকার সেজন্যে অবশ্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অন্যায়ভাবে আণবিক বোমা হামলা চালিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ নর-নারী ও শিশু হত্যার জন্য আমেরিকা আজ পর্যন্ত ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা দুঃখ প্রকাশ করেনি। অধিকৃত জাপানে মার্কিন সৈন্যেরা জাপানের নারীদের গর্ভে ১৪ লাখ জারজ সন্তান জন্ম দিয়েছে। তার জন্য আমেরিকা দুঃখ প্রকাশ করেনি, কাউকে ক্ষতিপূরণ দেয়নি। শক্তির গর্বে আমেরিকা আজ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, যেটা এক সময় হিটলারের জার্মানী, মুসোলিনীর ইতালি মনে করেছিল।
স্টিফেন র্যাপের মতো মার্কিন দূতদের বাংলাদেশের মানুষের সবিনয়ে বলে দেয়া উচিত, আসুন বসুন, পানতামাক সেবন করুন। তারপর দেশে ফিরে যান এবং ফিরে গিয়ে যেসব বুলি কপচাচ্ছেন তা নিজ দেশে কপচান। বিশ্ববিবেক এখন জাগ্রত। শক্তির দাপট বা ভাওতাবাজি দ্বারা তাকে বিভ্রান্ত করা যাবে না, ভয় দেখানোও যাবে না।
[ লন্ডন, ৯ আগস্ট, শনিবার, ২০১৪ ]