দুর্ঘটনা
নৌপথে সলিল সমাধি আর কত
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৪, ২১:০১
আর কত লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হবে হতভাগ্য যাত্রীর। এ প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া যাবে। যাবে না। কারণ প্রতিদিন নৌ-পথে বিআইডব্লিইটিএ এবং সরকারের নৌ-মন্ত্রণালয়ের নাকের ডগা দিয়ে ফিটনেস বিহীন লঞ্চ চলাচল করছে আর ঘটছে দুর্ঘটনা। ঈদের আগের দিন থেকে সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার পাশাপাশি ঘটে চলেছে নৌ-দুর্ঘটনা।
লঞ্চ মালিকেরা অধিক লাভের আশায় ভাঙ্গাচুরা লঞ্চগুলোকে কোন প্রকার ঝালাই করেই ঈদে যাত্রী বহনের জন্য নেমে পড়ে। আমাদের দেশের কয়েকটি ইলেকট্রিক এ নিয়ে সচিত্র সংবাদ ও প্রচার করেছে। কিন্তু বিআইডব্লিইটিএ এবং সরকারের নৌ-মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আর এর শিকার হচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা।
ঈদের পূর্বে একটি লঞ্চের তলা ফেটে যাওয়ায় ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের মাঝপথে মেহেন্দিগঞ্জের চরে নামিয়ে দিয়েছিল একটি লঞ্চ। বরিশালের একটি লঞ্চের সাথে আরেকটি লঞ্চের ধাক্কা খেয়ে সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এতো আহত হয় বেশ কয়েকজন যাত্রী।
লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে, সলিল সমাধি হয় অসহায় যাত্রীদের। সরকারের পক্ষ থেকে টাকা দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট আর প্রকাশ হয় না। দোষীরাও শাস্তি পায় না। সরকারের একটু সচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার পাশাপাশি ঘটে চলছে নৌ-দুর্ঘটনা, মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রতিটি নৌ-দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা জানান, প্রবল স্রোতের কারণে লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না, লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে ইত্যাদি ইত্যাদি কথা বলছে। মুন্সিগঞ্জের নৌ-দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা একই কথা বলছে।
প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে ফিটনেস বিহীন লঞ্চ চলাচল করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বিআইডব্লিইটিএ কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। আমাদের দেশে নৌ-দুর্ঘটনার কবলে পড়া লঞ্চ উদ্ধার করার মত উন্নতমানের উদ্ধারকারী জাহাজও নেই। রুস্তম ও হামজা নামক দুটো পুরানো উদ্ধারকারী জাহাজ এখন একমাত্র সম্বল। তাও আবার সময় মত উদ্ধার স্থানে যেতে বিলম্ব হয়।
আমাদের দেশে শুধুমাত্র ফিটনেস বিহীন লঞ্চ চলাচল করে তা কিন্তু নয়, লঞ্চে থাকে না প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম, কোন কোন লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী বয়া থাকার কথা বলা হয় তা থাকে স্বল্প পরিমাণে। বর্ষা মৌসুমে লঞ্চ ঝড়ের কবলে পড়লে লঞ্চের স্টাফ ও যাত্রীদের মধ্যে বয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, আমি ২০০৯ সালে পবিত্র ঈদ-উল আজহার আগের দিন কোকো-৪ লঞ্চে বাড়ি যাবার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়ি। লঞ্চটি সদরঘাট থেকে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাত্রা করে। বিআইডবি¬ইটিএ কর্তৃপক্ষ তখন কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাবার সময় লঞ্চের অবস্থা খারাপ দেখে অনেকে নেমে গিয়েছিল। আমি নামতে গিয়েও আর পারিনি। সেই দুর্ঘটনায় ৮৪ জন যাত্রী মারা গিয়েছিল। আমি আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে বেঁচে যাই। আমার আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হয়েছিল। যা কেউ পূরণ করেনি। আমি নিজে পূরণ করেছি। তবে আমি মানসিকভাবে যে ক্ষতির সম্মুখীন হই তা আজও পূরণ হয়নি। কেউ কখনো তা পূরণ করতে পারবে না। বেঁচে যাবার পর বিআইডবি¬ইটিএর পক্ষ থেকে আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পরে আর আমার ক্ষতিপূরণ কেউ করেনি। কারণ আমি একটি বিদেশি বায়িং অফিসে চাকরি করতাম। তারা আমার লঞ্চ দুর্ঘটনার কথা শুনে বলেছেন, আমি মানসিকভাবে এতো বিধ্বস্ত যে তাদের কোম্পানিতে আর কাজ করার যোগ্যতা নেই। তাই আমাকে চাকরি থেকে বিদায় করে দেয়। আজ আমি লঞ্চ দুর্ঘটনার কথা শুনলে আমার সেই পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে এবং আমি অস্থির হয়ে যাই।
সকল বাস ও লঞ্চ মালিক এবং ট্রেন কর্তৃপক্ষের কাছে অুনরোধ, শুধু আর্থিক দিক নিয়ে না ভেবে সাধারণ নিরপরাধ মানুষের কথা ভেবে মানবিক দিক বিবেচনা করে লাইসেন্সবিহীন বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করুন।
বাস ও নৌ-দুর্ঘটনা রোধে এগিয়ে আসুন। মনে রাখবেন অর্থের চেয়েও জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
লেখক :একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক