অর্জিত সাফল্য ধরিয়া রাখিতে হইবে

বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) যখন শুরু হয়, তখন মাত্র ২ শতাংশ শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হইয়াছিল। মাত্র ২৮ বত্সরের ব্যবধানে তাহা ৮৬ শতাংশে উন্নীত হইয়াছে। শুধু যে কার্যক্রমভুক্ত শিশুর সংখ্যা বা হার বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহাই নহে, সাধিত হইয়াছে ব্যাপক গুণগত উত্কর্ষও। সেইসাথে সমপ্রসারিত হইয়াছে কার্যক্রমের পরিধিও। শুরুতে টার্গেট করা হইয়াছিল শিশুদের প্রাণঘাতী প্রধান ছয়টি ব্যাধিকে। সেইগুলি হইল—হাম, যক্ষ্মা, ধনুস্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও। পরে ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে রুবেলা, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি-এর টিকাও। জনসংখ্যার তুলনায় ব্যাপক অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত মারাত্মক দুর্বলতাসহ নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল, বিশাল ও বিশেষায়িত এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ যেই সাফল্য দেখাইয়াছে—তাহা বিশ্বব্যাপী যেমন প্রশংসিত হইয়াছে, তেমনি ইহা মডেলেও পরিণত হইয়াছে উন্নয়নশীল বহু দেশের জন্য। এই অর্জন একদিকে যেমন লক্ষ লক্ষ শিশুর প্রাণরক্ষায় নিয়ামক ভূমিকা রাখিয়াছে, অন্যদিকে তেমনি আমাদের সামর্থ্যের একটি শক্তিশালী বার্তাও তুলিয়া ধরিয়াছে বিশ্বপরিমণ্ডলে। সেই বার্তাটি হইল, আমরাও যে-কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে পারি। এই প্রেক্ষাপটে আগামী অক্টোবরেই ইপিআই-এর সাফল্যের ধারায় যুক্ত হইতে যাইতেছে আরও একটি নূতন মাত্রা। সেইটি হইল-নিউমোনিয়ার টিকা। সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১৪ সপ্তাহ বয়সী ৩৫ লক্ষ নবজাতক শিশুকে এই টিকা দেওয়া হইবে। একইসাথে শুরু হইতেছে ইনজেকটেবল আইপিভি ভ্যাকসিনের কার্যক্রমও। এই ভ্যাকসিন পোলিওর বিরুদ্ধে সবচাইতে কার্যকর বলিয়া স্বীকৃত। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় গৃহীত এই কার্যক্রমটিকে দেশের সর্ববৃহত্ ও ব্যয়বহুল টিকাদান কর্মসূচি হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, নিউমোনিয়া যে এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিশুঘাতক তাহাতে সন্দেহ নাই। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বত্সরে ২১ হাজার শিশুর প্রাণহরণ করে এই ব্যাধি। আক্রান্ত হয় আরও হাজার হাজার শিশু। অথচ ইহা প্রমাণিত যে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধযোগ্য। টিকা বা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাইয়া আনা সম্ভব। আমরা আশা করি, অতি প্রয়োজনীয় এই উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হইবে। অব্যাহত থাকিবে আমাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা। শিশুমৃত্যু রোধে বাংলাদেশের সাফল্য এতোটাই দৃশ্যমান যে, ইহার জন্য কোনো পরিসংখ্যান ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন পড়ে না। আর ইহাও অনস্বীকার্য যে, এই সাফল্যের চাবিকাঠি হইল টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন। গুটি বসন্ত কিংবা কলেরার মতো মহামারীকে যেইভাবে পরাস্ত করা হইয়াছে, একইভাবে কার্যকর প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা হইয়াছে শিশুঘাতক প্রধান প্রধান ব্যাধির বিরুদ্ধেও। তবে আত্মশ্লাঘায় ভুগিবার কোনো কারণ নাই। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, নবরূপে নূতন শক্তিতে বলীয়ান হইয়া ম্যালেরিয়ার মতো কোনো কোনো ঘাতক ব্যাধির প্রত্যাবর্তনও ঘটিতেছে। পাশাপাশি ইবোলার (ইভিডি) মতো অজ্ঞাতপরিচয় আগন্তুকদের আতঙ্ক তো আছেই। অতএব, শুধু সতর্ক থাকিলেই চলিবে না, সেইসাথে অর্জন করিতে হইবে আত্মনির্ভরতাও। প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন উত্পাদন হইতে শুরু করিয়া ঘরে-ঘরে তাহা পৌঁছাইয়া দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য। কারণ ইপিআই-এর ক্ষেত্রে আমাদের যে-অর্জন তাহা যে এখনও বহুলাংশে বৈদেশিক সহায়তানির্ভর, এই বাস্তবতাটি অবশ্যই মাথায় রাখিতে হইবে।