একজন হাইকমিশনারের উপলব্ধি
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:২৭
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার মান্যবর হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন সমপ্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলিয়াছেন, ‘হাউএভার দ্য ইলেকশন্স হ্যাড ব্রট রিলিফ বাই পুটিং অ্যান এনড টু দ্য ভায়োলেন্স’। তাহার এই বক্তব্যের মূল কথা হইল, গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন সহিংসতার অবসান ঘটাইয়া বাংলাদেশে স্বস্তি আনিয়া দিয়াছে। নির্বাচনের আগে যে সহিংস পরিস্থিতি ছিল, নির্বাচনের পর তাহা দূর হইয়াছে। দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে একাধারে সাত-আট মাস বাংলাদেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। মানুষের উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার কোন সীমা ছিল না। সে সময় হরতাল-অবরোধের নামে দিনে-দুপুরে নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছিল। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে বোমার আঘাতে আহত মানুষ কাতরাইতে থাকে। সেই সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বর্বর হামলাও ছিল নিয়মিত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটগুলি সেই সময়কার বীভত্সতার সাক্ষী হইয়া আছে আজও। এমন ভয়াবহ অবস্থা হইতে আমরা বাহির হইয়া আসিতে পারিয়াছি সেই তো নির্বাচনের পরই। সেই অর্থে গত দশম নির্বাচন মানুষের জীবনে যে স্বস্তি ও শান্তি আনিয়া দিয়াছে তাহা অনস্বীকার্য। মান্যবর কানাডীয় হাইকমিশনার বিলম্বে হইলেও তাহা যথার্থই উপলব্ধি করিয়াছেন।
উল্লেখ্য, দশম সাধারণ নির্বাচনকে কোন কোন মহল অবৈধ বলিলেও আজ পর্যন্ত কেহই এই নির্বাচনকে অসাংবিধানিক বলিয়া দাবি করিতে পারেন নাই। এমনকি যাহারা একমুখে বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলেন, তাহারাই আবার অন্যমুখে এই সরকারের সঙ্গে দ্রুত সংলাপের কথা বলেন। কিন্তু কী কারণে ও কোন্ পরিস্থিতিতে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নাই, তাহাও দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। নির্বাচনের পর আমরা দেখিলাম, প্রভাবশালী বিদেশি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি বাস্তবতাকে স্বীকার করিতে কালক্ষেপণ করিল না। তাহাদের নিকট হইতে একের পর এক সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস পাইতে শুরু করিল এই সরকার। তাহার পরও কিছু দেশের মন্তব্য ছিল মিশ্র। সেই মিশ্রতার ঘোরও এখন আস্তে আস্তে কাটিয়া যাইতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। ইহা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যদি যথাসমেয় এই নির্বাচন না হইত, তাহা হইলে বাংলাদেশে কী ঘটিত, তাহা ভাবিতেও আমাদের গা শিহরিত হয়। তাহা হইলে দেশে দেখা দিত সাংবিধানিক সংকট। সেই সংকট রাজনৈতিক সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করিত। তাহার জের ধরিয়া দেশে অশান্তি ও সহিংসতা যে আরও দীর্ঘস্থায়ী হইত তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পড়িত মুখ থুবড়াইয়া। সমাজ জীবনে দেখা দিতো বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা। ভাল-মন্দ যেভাবেই বিচার-বিশ্লেষণ করা হউক না কেন, অন্তত গত জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা নির্বাচন-পূর্ব এই অস্থিরতা হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছি।
প্রকৃতপক্ষে, ২০১৩ সালটি ছিল আমাদের জন্য সহিংসতার বত্সর। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী গেল বত্সরটিতে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে মৃত্যু হইয়াছে ৪৯৬ ব্যক্তির। সহিংসতার শিকার হইয়া পুলিশ মারা গিয়াছেন ১৫ জন। আর গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি গত জানুয়ারি মাসে এক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তাহাতে দেখা যা্য়, ছয় মাসের সহিংসতায় দেশের ক্ষতি হইয়াছে ৪৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এই দুইটি পরিসংখ্যানই বলিয়া দেয়, নির্বাচনের আগে আমরা কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। এখন প্রশ্ন হইল, বর্তমানের এই শান্তি ও স্থিতিশীলতা কতদিন স্থায়ী হইবে? আমাদের আশা, এজন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ ও রাজনীতিবিদগণ দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিবেন। গত কয়েক মাস পর্যন্ত আমরা যে শান্তি ও স্বস্তিতে রহিয়াছি ইহাকে অস্বীকার করিবার কোন উপায় নাই। বিদেশি বন্ধুগণ দেরিতে হইলেও তাহা এখন যথাযথ উপলব্ধি করিতেছেন। এমনকি কানাডার হাইকমিশানারও গতবারের নির্বাচন সংবিধানসম্মত ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার এই উপলদ্ধি তাত্পর্যপূর্ণ নিঃসন্দেহে।