‘জন্ম যদি তব বঙ্গে...’
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৪, ২১:২০
বঙ্গবন্ধু যদি তাঁহার জীবনবৃত্ত পূর্ণ করিয়া স্বাভাবিকভাবেও মৃত্যুবরণ করিতেন তাহা হইলেও তিনি প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া থাকিতেন আমাদের জাতীয় জীবনে। কারণ মাত্র ৫৫ বত্সরের অতি সংক্ষিপ্ত জীবনে সুদীর্ঘকালের রাষ্ট্রবিহীন এই জাতিকে তিনি যাহা দিয়া গিয়াছেন তাহার গুরুত্ব ও তাত্পর্য কখনোই মলিন হইবার নহে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের এইদিনে প্রায় সপরিবারে নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কারণে যে এই মৃত্যুর সহিত ভিন্ন একটি মাত্রাও যুক্ত হইয়া গিয়াছে, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই নৃশংসতা নজিরবিহীন। তবু শুধু শোক নহে, ঘাতকদের প্রতি ধিক্কারও নহে, বরং সবকিছুকে ছাপাইয়া তাঁহার নির্বাক রক্তধারার মতো তিনি আরও নিবিড় ও গভীরভাবে একাত্ম হইয়া গিয়াছেন বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে। অতুলনীয় সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জীবদ্দশায়ই তিনি বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হইয়াছিলেন। ট্র্যাজিক ও বীরোচিত মৃত্যুতে সেই বন্ধন আরও সুদৃঢ় হইয়াছে। বঙ্গবন্ধু বহুবার বলিয়াছেন যে, বাংলার মানুষের নিকট হইতে যেই ভালোবাসা তিনি পাইয়াছেন—বুকের রক্ত দিয়া হইলেও সেই ভালোবাসার ঋণ শোধ করিয়া যাইবেন। তিনি তাহাই করিয়াছেন।
বঙ্গবন্ধু দেবতা কিংবা অতিমানব ছিলেন না। বরং সহজ-সরল-অনাড়ম্বর এই মানুষটিকে বাহ্যত আর দশজন বাঙালি হইতে আলাদা করার উপায় ছিল না—যদিও বাঙালির গড়পরতা উচ্চতাকে ছাপাইয়া উঠিয়াছিল তাঁহার চির উন্নত শির। পাশাপাশি ইহাও অনস্বীকার্য যে, কোমলে-কঠোরে গড়া আবহমান বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়াছিল তাঁহার মাধুর্যমণ্ডিত ব্যক্তিত্বে। রবীন্দ্রনাথের অনন্য সমর্পণ ও সৌন্দর্যবোধ, নজরুলের দ্রোহ, হাছন-লালনের অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিকতা এবং সুফি-দরবেশের অধ্যাত্মবোধের এমন বিরল সমাবেশ আর কোনো বাঙালির মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। মানুষ হিসাবে তাঁহার সীমাবদ্ধতা থাকিতেই পারে। সর্বক্ষেত্রে সফল নাও হইতে পারেন তিনি। কিন্তু তাহাতে তাঁহার অনন্যতা ও মহিমা কিছুমাত্র খর্ব হয় না। প্রশ্ন হইতে পারে যে কী সেই অনন্যতা? তাহার উত্তরে শুধু এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক হিসাবে একটি চিরন্তন পাসপোর্ট দিয়া গিয়াছেন—যাহা বাঙালির বিগত হাজার বত্সরের ইতিহাসে একটি অনন্য উপহার। একদা দুঃসহ দারিদ্র্যের ভারে ন্যুব্জ ও জনবহুল বাংলাদেশ নামক যেই রাষ্ট্রটি আজ সমাজ ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করিয়া চলিয়াছে এবং মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখিতেছে, তাহার মূলেও রহিয়াছে এই পাসপোর্ট। বলা বাহুল্য যে, ইহা একটি কাগুজে দলিল মাত্র নহে, বরং ইহাই আমাদের স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। সর্বোপরি, সকল অনুপ্রেরণা ও উদ্যমের উত্সও বটে।
জাতি হিসাবে আমরা এমনই দুর্ভাগা যে, যিনি আমাদের এই অনন্য গৌরবে অভিষিক্ত করিয়াছেন এবং উন্মোচিত করিয়া দিয়াছেন সম্ভাবনার অসীম দিগন্ত, তাঁহাকে প্রায় সপরিবারে হত্যা করিয়াও অনেকের বিবেকবোধ জাগ্রত হয় নাই। জাতির পিতা ও স্থপতি হিসাবে তাঁহাকে তাঁহার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া দূরে থাক, তাঁহার নাম পর্যন্ত মুছিয়া ফেলার চেষ্টা হইয়াছে। প্রদর্শন করা হইয়াছে চরম অবজ্ঞাও। পরিতাপের বিষয় হইল, এখনও সেই সংকীর্ণতার অবসান ঘটিবার কোনো আলামত দেখা যাইতেছে না। যেই জাতি বীরের মর্যাদা দিতে জানে না, সেইখানে যে বীরের জন্ম হয় না—তাহা কোনো নূতন কথা নহে। আত্মবিনাশী উন্মাদনা অনেক হইয়াছে। এইবার স্থির হইয়া বসিতে হইবে। মুখোমুখি হইতে হইবে নিজের। নিজেকেই প্রশ্ন করিতে হইবে— কী তোমার পরিচয়? ইহার উত্তরে সমগ্র মানচিত্র ছাপাইয়া যেই অবয়বটি উঠিয়া আসে সেই মানুষটিকে যথাযোগ্য শ্রদ্ধাপ্রদর্শনে কাহারও কোনো প্রকার সংকীর্ণতা থাকা উচিত নহে।
বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংবাদ শোনার পর সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁহার ডায়েরিতে লিখিয়াছিলেন যে, মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চাইতে শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হইবেন। তাঁহার এই মূল্যায়ন যে অযথার্থ ছিল না—বঙ্গবন্ধুর হত্যা-পরবর্তী গত ৩৮ বত্সরে যেমন তাহা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে, ভবিষ্যতেও ইহার অন্যথা ঘটিবার কোনো কারণ নাই। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ ও বাঙালি যতদিন থাকিবে, বঙ্গবন্ধুও ততদিন বাঁচিয়া থাকিবেন স্বমহিমায়।