পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন

অতি সমপ্রতি বাংলাদেশ সরকারের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী তার রুটিন কর্মসূচির অংশ হিসাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি উদ্যোগের প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসেন এবং একে আরও বেগবান করার জন্য সমবায় সংগঠন ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকাকে যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেন। দেশের সরকার প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিঃসন্দেহে অনেক নতুন বার্তা বহন করে যেমন প্রথমত: সমবায়কে পল্লী উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভাবে ব্যবহার করতে হবে; দ্বিতীয়ত:স্থানীয় সরকারকে পল্লীর সার্বিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে ; তৃতীয়ত: প্রস্তাবিত খাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ বিশেষত: উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ যাতে শত ভাগ ব্যয়িত হয় এর জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ,উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রশাসনসহ সকলকে দলমত নির্বিশেষে একযোগে কাজ করে যেতে হবে এবং সর্বোপরি রূপকল্প ২০২১ ভিশন বাস্তবায়নে অর্থাত্ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে স্বল্প বৈষম্যপূর্ণ এক মধ্য আয়ের জ্ঞান ভিত্তিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ আলোকিত বাংলাদেশ । এক হিসাবে দেখা যায় যে দেশের সম্পূর্ণ ভূমিহীনের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১১.৬ ভাগ এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৩-এর মতে জাতীয় ৩১.৫ ভাগ যার মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ৩৫.২ ভাগ আর শহরে ২১.৩ ভাগ অর্থাত্ শহরের তুলনায় গ্রামে দারিদ্র্যের হার বেশি । তার অর্থ ভাগ্যের অন্বেষায় মানুষ গ্রামে ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ খুঁজে যা শহরবাসীর জন্য খুব একটা আনন্দের বার্তা নয়। আবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোক সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৫ ভাগ। অর্থাত্ দেশে এখনও চার কোটি লোক দারিদ্র্য যাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জাতির একটি গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তাছাড়া আরও একটি তথ্যে দেখা যায় যে দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা যাদের বয়স ১৮-৩৫ বছর প্রায় ৩ কোটি এবং বছরে ২৩ লক্ষ শ্রমশক্তির শ্রম বাজারে অনুপ্রবেশ ঘটছে। অপরদিকে গ্রামাঞ্চলে নিয়োজিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শ্রমশক্তির সংখ্যা ৪.১৭ কোটি এবং এর মধ্যে কৃষিতে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা শতকরা মোট শ্রমিকের ১০.২৩ ভাগ। এই অবস্থায় পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে ভাবনাটা যত সহজে মনে হয় আসলে ততটা সহজ নয়। কারণ দেশে বর্তমানে শতকরা তিন শতাংশ হারে নগরায়ন হচ্ছে এবং প্রতি বছর এক শতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে বিধায় পল্লী উন্নয়নের অর্থও পাল্টাচ্ছে ক্রমাগতভাবে। সরকারি হিসাবে যে সকল উপজেলা সদর পৌরসভা কর্তৃক স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত যার সংখ্যা বর্তমানে ৩১৬টি। এ গুলোকে বাদ দিলে যে সকল অঞ্চল ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত যার সংখ্যা বর্তমানে ৪৫৪৩টি তাদেরকে পল্লী অঞ্চল বা গ্রাম বলা হয় যা বর্তমানে ৮৭,৩২০ টিতে রয়েছে। এই গ্রামগুলো বাস্তব (physical) উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান (livelihood)-এর উন্নয়ন ও পরিবেশগত উন্নয়ন পল্লী উন্নয়নের অংশবিশেষ। এই বিষয়টিকে নিয়ে অতীতে অনেক মতবাদ কাজ করেছে যেমন ব্যুরোক্রেটিক এপ্রোচ, গান্ধীয়ান এপ্রোচ, রাবীন্দ্রিক এপ্রোচ, খ্রিষ্টান মিশনারি এপ্রোচ ও কুমিল্লা এপ্রোচ। এরি মধ্যে কুমিল্লা এপ্রোচ এর চারটি উপাদান (components) যেমন থানা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টি.টি.ডি.সি), পল্লী পূর্ত কর্মসূচি, থানা সেচ কর্মসূচি (টি.আই.পি ) ও দ্বি-স্থর বিশিষ্ট সমবায় পদ্ধতি পাকিস্তান সরকার পল্লী উন্নয়ন কাজে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সরকারি ভাবে । পরবর্তী স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আরও নতুন নতুন উদ্যোগ মডেল আকারে আবির্ভূত হয়েছিল পল্লী উন্নয়নে যেমন এন.জি.ও মডেল, গ্রামীণ ব্যাংক মডেল, পি.কে.এস.এফ মডেল , রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উদ্ভাবনী মডেল ইত্যাদি। সময়ের আবর্তে দু-একটি মডেল ছাড়া প্রায় বেশির ভাগই স্থায়ীত্বের (sustainability) দিক থেকে তেমন কোন সফল হতে পারেনি। ফলে বিক্রেতা অনেক থাকলেও ক্রেতার সে রকম সমাগম চোখে পড়ে না এবং সংকট (crisis) সেখানেই। বাজার অর্থনীতির যুগে পল্লী উন্নয়ন এমন কোন বাজার সম্ভাবনা (market driven) বিষয় নয় যা অর্জন করলে কর্মসংস্থান (wage employ-ment) সহ আয় বৃদ্ধির এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপারে বিষয়টির গুরুত্ব এরি মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৩ লক্ষ ঋণগ্রহীতা, বিভিন্ন এনজিও-এর ৩.৫০ কোটি ঋণগ্রহীতা, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের ২০০ পার্টনার এনজিও-এর আওতায় ১.২১ কোটি ঋণগ্রহীতা, প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারপরও দেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক কোন কোর্স গুরুত্বসহকারে স্থান পায় না। কারণ বর্তমান শিক্ষাক্রম জ্ঞান ভিত্তিক (knowledge based) এর চেয়ে চাকরি ভিত্তিক (job based) বিধায় পল্লী উন্নয়ন সংক্রান্ত কোন ক্যাডারভিত্তিক পদ সরকারি কাঠামোতে একেবারেই অনুপস্থিত। আর বেসরকারি পর্যায়ে চাকরির পদ যেমন সীমিত তেমনই সম্মানজনক নয়। ফলে সরকারি/ বেসরকারি পর্যায়ের পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা চাকরির বাজারে বিক্রেতার ভূমিকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে তা আর হয়ে উঠছে না। তার কারণ বাজার অর্থনীতির প্রভাব এবং বাস্তব কেন্দ্রিক ধারণায় সহজে একটা কিছু প্রাপ্তির আশায় গ্রাম গবেষণায় আর কেহ সময় ব্যয় না করে যেখানে আর্থিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে অনায়াসে সেখানেই ভীড় করে। ফলে উন্নয়ন ভাবনাগুলো চিন্তা থেকে সরে পড়ে যা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাই বলুন-মন্ত্রণালয় আর বাস্তবায়ন সংস্থাই বলুন (বার্ড, আরডিএ, বিআরডিবি, সমবায় অধিদপ্তর, এলজিইডি, স্থানীয় সরকার) এক কাতারে উপবিষ্ট। এখন যারা ক্রেতা তারা দেখবে পণ্যের মান ও মূল্য এবং পল্লী উন্নয়ন সেক্টরে পণ্য হলো নতুন নতুন মডেল, কর্মসূচি যা গবেষণালব্ধ ফলাফলের সৃষ্টি যেগুলো ক্রেতাদের প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে কতটুকু আকৃষ্ট করে চলেছে তা নিয়ে প্রশাসকদের চিন্তা-ভাবনা নেই বললেই চলে। ধরা যাক স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত চার দশক পর কেবল মাত্র গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ মডেল ছাড়া আর তেমন কোন মডেল দেশে কিংবা বিদেশে ক্রেতা সৃষ্টিতে সাড়া ফেলতে পারেনি। বাজার অর্থনীতির বিবেচনায় ভাবনাটি যদি হয় ক্রেতার সন্তুষ্টি তা হলে পল্লী উন্নয়ন কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনের পণ্য বা সেবা এমন হতে হবে যা ব্যয় সাশ্রয়ী, পরিবেশ বান্ধব, উত্পাদনমুখী ও বাজার সহায়ক । এই বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত ,শ্রীলংকা পাকিস্তান, ইন্দোনেশীয়া ও ভিয়েতনামের মত বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সে ধরনের বাজারমুখী পণ্য বা সেবা তৈরিতে উন্নয়ন গবেষণায় মনোনিবেশ করতে হবে এবং এদেরকে দেশের শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সম্পৃক্ত করে গবেষক ছাত্র (যারা এম.এস এমফিল, পি.এইচ.ডি) গবেষণার ল্যাবরেটরী হিসাবে ব্যবহার করতে হবে এতে করে গবেষণা পণ্যের ক্রেতার সংখ্যা যেমন করে বাড়বে অন্যদিকে নতুন মডেল উদ্ভাবনেরও ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে যা পরিবর্তিতে প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। তবে এর জন্য বড় অংকের আর্থিক সাপোর্টের প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার বর্তমান বছরের (২০১৪-১৫) বাজেটে ২,৫০, ৫০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে যার মধ্যে কৃষি,স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতের অংশ শতকরা ১৪.৯৯ ভাগ। আবার মোট বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এর অংশ ৮০,৩১৫ কোটি টাকা যার মধ্যে কৃষি,পল্লী উন্নয়ন, পল্লী প্রতিষ্ঠান ,পানি সম্পদ খাতের অংশ শতকরা ২৫.৪ ভাগ। এই অর্থের একটা অংশ যদি উন্নয়ন গবেষণা বিনির্মাণে ব্যয়িত হয় তা হলে পল্লী উন্নয়নে বিক্রেতা ক্রেতার যে উভয় সংকটে তা অনেকাংশে দূর হবে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বিষয়টি সমমর্যাদায় স্থান পাবে যেমন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপারে পেয়েছে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে । ভারতে সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে National Institute of Rural Development (NIRD), National Institute of Bank Management (NIBM) প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান পল্লী উন্নয়ন গবেষণায় যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে যা অনুসরণীয় হতে পারে বার্ডের জন্য। এই দুটি প্রতিষ্ঠান সুরক্ষাই বিশ্ববিদ্যালয়-এর Affiliation ভুক্ত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষকদের বৃত্তি প্রদান করে এই দুটি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করার জন্য। বাংলাদেশেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষকদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে যারা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধনকৃত এবং এই সকল গবেষকদের বার্ড সহজে আকৃষ্ট করতে পারে এবং বার্ডের গবেষকবৃন্দ অনায়াশেই এই গবেষণা ছাত্রদের সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করতে পারে। এতে দেশে-বিদেশে গবেষণা পণ্য ছড়িয়ে যাবে এবং বাজার সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখবে। এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা কাম্য। লেখক :কৃষি অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা