হাসপাতালের সন্নিকটে পশুর হাট নহে

মানুষ হাসপাতালের শরণাপন্ন হয় জীবন বাঁচাইবার জন্য। কিন্তু পশুর হাটের কারণে যদি হাসপাতালে যাইতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হইতে হয় কিংবা নূতন কোন জীবাণু নিয়া হাসপাতালে গমন করিতে হয়, তাহা হইলে এই নৈরাজ্য মানিয়া নেওয়া যায় না। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, বরাবরের মতো এইবারও রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের আশেপাশে পশুরহাটের ইজারা দেওয়া হইয়াছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যে আট স্থানে কোরবানির পশুর হাট স্থাপনের অনুমতি দিয়াছে, তাহার অন্যতম হইল শেরে বাংলা নগরস্থ ন্যাশন্যাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্সেস ও হাসপাতালের সন্নিকটবর্তী ফাঁকা জায়গা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এইখানকার পশুর হাট সমপ্রসারিত হইয়া আগারগাঁওয়ের পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সা কার্যক্রম পর্যন্ত ব্যাহত করে। অনুরূপভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যে ১২টি স্থানে এইবার পশুর হাট বসানোর অনুমতি দিয়াছে, তাহার অন্যতম আরমানিটোলা খেলার মাঠ। এই হাট সমপ্রসারিত হইয়া নয়াবাজার ব্রিজে উঠার পথে মিটফোর্ড হাসপতালে যাতায়াতের পথে বাধার সৃষ্টি করে। এইভাবে দেখা যায়, ২০টির মধ্যে মাত্র ২টি পশুরহাটের কারণে বেশ কয়েকটি হাসপাতালের চিকিত্সাসেবা হুমকির মধ্যে পড়ে। এই দুইটি স্থানে পশুর হাটের কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহন হাসপাতালে ঠিকমত প্রবেশ করিতে পারে না। ফলে রোগীদের নানা দুর্ভোগ ও দুর্দশা বৃদ্ধি পায়। জানা যায়, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতালের আশেপাশে পশুরহাট না বসানোর জন্য স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিকট চিঠি দিয়া অনুরোধ জানাইয়াছেন। সেই অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের মন্ত্রী বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া দুই সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়াছেন। এমনকি এই ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরও চিঠি প্রেরণ করিয়াছে। তাহারপরও বিষয়টি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা আমলে নিতেছেন না বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। গত বত্সরেও একইভাবে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তাহাতে কোন কাজ হয় নাই বলিয়া জানা যায়। যেখানে দুই মন্ত্রী মহোদয়ের সদিচ্ছা ও নির্দেশ রহিয়াছে,আছে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সেখানে কে বা কাহারা কিভাবে কাজে বাধার সৃষ্টি করেন, তাহা একটি বড় প্রশ্নই বটে। যাহারা হাসপাতালের আশেপাশে পশুর হাটের অনুমোদন দেন এবং তাহাতে একাধিক হাসপাতালের সমস্যা দেখিয়াও না দেখার ভান করেন, তাহাদের বিবেক ও বুদ্ধি-বিবেচনা নিয়া সন্দেহ প্রকাশ না করিয়া পারা যায় না। অদূরে হাটের পারমিশন দেওয়ার পর ইহা কিভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত সমপ্রসারিত হয়, তাহাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা দরকার। পশুর হাটের প্রয়োজনীয়তাকে আমরা অস্বীকার করি না। পবিত্র ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ প্রতি বত্সর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য পশু কোরবানি করিয়া থাকেন। ইহা ধর্মীয় অনুশাসনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইহাতে কাহারও আপত্তি থাকিবার কথা নহে। কিন্তু হাসপাতালের আশেপাশে পশুর হাট বসানো হইলে তাহাতে কত প্রকার বিপদ ও বিড়ম্বনা দেখা দেয়, তাহা তো দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। বিষয়টি দুই সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে এবং অন্য কোন সুবিধাজনক ও বিকল্প স্থানে পশুর হাট দুইটি স্থানান্তরের ব্যবস্থা করিতে হইবে। একইসঙ্গে শুধু রাজধানী বলিয়া কথা নহে, দেশের অন্যান্য নগর, শহর বা গঞ্জে কোন হাসপতাল, ক্লিনিক বা স্থাস্থ্যকেন্দ্রের সম্মুখে বা আশেপাশে যাহাতে কোরবানির পশুর হাট না বসে, সেইজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ ও সতর্ক থাকিতে হইবে।