নবপর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষা ড. ফজলুল হক সৈকত
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫১
কলেজ শিক্ষার মান-উন্নয়ন এবং যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরির প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কর্ম-পরিসর ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে বর্তমানে এটি দেশের সর্ববৃহত্ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সারাদেশে প্রায় ২৩০০ কলেজের পাঠদান-প্রক্রিয়া ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ৫০০ কলেজে পড়ানো হচ্ছে অনার্স কোর্স। শিক্ষার্থী প্রায় ১৫ লাখ। কোনো রকম সরকারি অনুদান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই কেবল শিক্ষার্থীদের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে এর সকল কার্যক্রম। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
এতোদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত একটি উচ্চশিক্ষাবোর্ডের মোড়কে আবদ্ধ ছিল। সাধারণের কাছে এর পরিচয়ও দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ওই রকম। এখানে পাঠদান হতে পারে কিংবা শিক্ষক থাকতে পারে— এমন কথায় অনেকের বিশ্বাসও ছিল না। কিন্তু ওই অবমাননা ও দুর্নাম থেকে মুক্তি পেল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। গত ০৭ আগস্ট ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন-ক্যাম্পাস বিশেষ মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নবযাত্রার প্রথম পর্যায়ে পা রাখল। একাডেমিক কার্যক্রমে এখানে যুক্ত হলো নতুন ভুবন ও উদ্যম। কলেজের শিক্ষকদের থিসিসভিত্তিক মাস্টার্স কোর্স সম্পাদনের মধ্য দিয়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ শিক্ষকসমাজ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। পাশাপাশি যারা শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করতে চান, তাদেরও প্রশিক্ষিত ও সক্ষম ভবিষ্যতের মানুষ গড়ার কারিগর করে তোলা এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। এটি সম্পূর্ণভাবে মৌলিক গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি। এইসব গবেষণা জাতীয় উন্নয়নে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। সরকারিভাবে শিক্ষকদের কিছু প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা থাকলেও বিশেষায়িত এই শিক্ষক তৈরির কার্যক্রম দেশে এটাই প্রথম। কাজেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান কর্তৃপক্ষ জাতীয় উন্নয়নে এবং কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার জন্য সকল সচেতন মহল থেকে সাধুবাদ পাবার দাবি রাখে। যোগ্য নেতৃত্বে মিশন ও ভিশন বাস্তবায়নের পথে পা বাড়াল এই বিশ্ববিদ্যালয়। ভবিষ্যতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসটি গবেষণাভিত্তিক ক্যাম্পাসে রূপান্তর করা হবে।
গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ। একাডেমিক কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত, সক্রিয় ও প্রাণবন্ত রাখে গবেষণা ও প্রকাশনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছুদিন গবেষণাকর্ম স্থবির ছিল। প্রায় ৭ বছর পর আবার জার্নাল প্রকাশ শুরু হয়েছে। গত সিনেটের আগে প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব সায়েন্স’। অন্য তিনটি গবেষণা-পত্রিকা—‘জার্নাল অব আর্টস’, ‘জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স’, ‘জার্নাল অব বিজনেস’ও প্রকাশের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। সারাদেশের শিক্ষকদের ধারাবাহিকভাবে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসে প্রশিক্ষিত করে তোলা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন দায়িত্বের ব্যাপার। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষকদের লেকচারের অডিও-ভিডিও বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যেন কলেজের শিক্ষকগণ বাড়িতে বা কলেজে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন। দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে পড়া এমফিল পিএইচডি প্রোগ্রাম সমপ্রসারিত করা হচ্ছে। গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের জন্য অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নির্ভরতা কমাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগ্যতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। আরো নতুন অভিজ্ঞ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও বিবেচনাধীন রয়েছে। লাইব্রেরিকে আধুনিক ও আপ টু ডেট করার জন্য চলছে নানান কার্যক্রম।
একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনার জন্য ঢাকায় ধানমন্ডিতে দুটি ভবনসহ প্রায় এক বিঘা জমি ক্রয় করে নিজস্ব সিটি অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইউজিসি সংলগ্ন স্থানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে টুইন টাওয়ার। যেখানে ১টি টাওয়ারে দেশের ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি অফিস থাকবে। অন্যটি হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন। এই ভবনটি নির্মিত হলে এখানে বসবে জ্ঞানের মিলনমেলা। সারাবছর জুড়ে চলবে পাঠ-পর্যালোচনা, গবেষণা, সেমিনার প্রভৃতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাডেমিক কার্যক্রম। এখানে সংযুক্ত থাকতে পারে বিশ্বমানের স্বয়ংসম্পূর্ণ লাইব্রেরি ও জ্ঞানভাণ্ডার। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভুবনে প্রবাহিত হবে নতুন হাওয়া। দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদগণ তাদের অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণা আদান-প্রদানের সুযোগ পাবেন।
ইন-ক্যাম্পাস মাস্টার্স প্রোগ্রামটিতে আপাতত প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে ৫টি বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। বাংলা, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স, ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে সীমিত পরিসরে চলবে এই বিশেষায়িত একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম। এর সাফল্য ও সম্ভাবনা এবং সমস্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে সকল বিষয়ে চালু হবে গবেষণাভিত্তিক এই বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম।
সাহিত্যিক-শিক্ষক ও শিক্ষা-সংগঠক, শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিক্ষা’ নামক গ্রন্থে সমকালীন ভারতবর্ষের, বিশেষ করে, বাঙালির অনুসৃত শিক্ষা-কাঠামো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, শিক্ষা-পরিস্থিতি এবং শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মতামত প্রকাশ করেছেন। তার ‘শিক্ষার হেরফের’, ‘শিক্ষা-সংস্কার’, ‘শিক্ষাসমস্যা’, ‘জাতীয় বিদ্যালয়’, ‘আবরণ’— এই পাঁচটি অভিভাষণে ও নিবন্ধে সমকালীন শিক্ষার দুরবস্থার বাস্তব ছবি আমরা পাই। তার মতে, ‘কী কী বই পড়ানো হইবে’, তার চেয়ে ঢের বেশি দরকার ‘কোনভাবে এই শিক্ষাকার্য চলিবে’। ‘অর্ডার অনুযায়ী সাপ্লাই দেওয়া হয়’ জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে তেমন কিছুই শেখানো যায় না। শিক্ষা-কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে আমাদের পরিচিত সমাজ-কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত করা না গেলে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। আবার অর্জিত শিক্ষাকে যদি প্রায়োগিক জীবনে কাজে লাগানো না যায়, তাতেও শিক্ষা মূলত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষাকে আদর্শ ও রসসমৃদ্ধ হতে হবে। যাকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তার মনে যদি তা ঠিক মতো প্রবেশ না করে, তাহলে কমিটি-সভা-পাঠদান ও অধ্যাপকের সকল প্রচেষ্টা অচিরেই বিনষ্ট হবে। শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথের মতে বিদ্যালয় পরিপূর্ণভাবে আবাসিক হওয়া আবশ্যক। জাতীয় পাঠ্যক্রম কিংবা জাতীয় বিদ্যালয়ের উপযোগিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামতও সমকালে এবং উত্তরকালে বেশ প্রাসঙ্গিক। শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে মানুষ আত্মরক্ষার যে প্রচেষ্টা আয়ত্ব করে এবং শেষত যে জাতীয় ও ব্যক্তিক আত্ম-সম্মান অর্জন করে, তাতেই শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার মূল মনোযোগ স্থির থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেছেন। তার মতে, ‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে তাহা মানুষকে অভিভূত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে।’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্পনা ও পরিকল্পনায় তার শিক্ষা ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি কারিকুলাম লেখাপড়ার স্ট্যান্ডার্ড এবং একাডেমিক প্রোগ্রামের পদ্ধতি নিয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই মনীষী সুন্দর জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, প্রায় ১০০ বছর পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বকীয়তায় পদার্পণ করে সত্যিকারের একটি জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের নবযাত্রার প্রথম পর্যায়ে পা রাখল।
লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর