রাজনীতি
‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি’
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫৩
শ্রদ্ধা-প্রদর্শনকে যখন শ্রদ্ধা-প্রদর্শনের ‘প্রদর্শনী ব্যবসায়’ পরিণত করা হয়, তখন তাতে এক ধরনের বিরক্তি-বিতৃষ্ণার উদ্ভব ও তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন উদয় না হয়ে পারে না। ঢাকার রাজপথে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্থাপিত অসংখ্য হোর্ডিংগুলোতে যেভাবে প্রচারকদের নাম ও ছবি বিজ্ঞাপিত হয়েছে তা শুধু অরুচিকরই নয়, তা প্রচারকদের বাণিজ্যিক বিবেচনার নিকৃষ্ট স্বার্থবোধকেই প্রকাশ করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে, দেশে এখন ‘শ্রদ্ধা-বাণিজ্য’ নামে একটি নতুন ব্যবসা চালু হয়েছে। অবশ্য সব হোর্ডিং ও পোস্টারের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য নয়। বেশ কিছু হোর্ডিং স্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে। এগুলো রাষ্ট্রীয় নির্দেশে স্থাপন করা হয়েছে। বহুলাংশে ফরমায়েশী হলেও সেগুলোতে রুচিহীনতার ছাপ খুব একটা নেই। আবার ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে অনেক হোর্ডিং ও পোস্টারেই রয়েছে রুচিসম্মত বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদনের আন্তরিক প্রকাশ। তবে অধিকাংশ হোর্ডিংয়েই প্রকাশ পেয়েছে ‘আমি ভক্তি জানালাম’ মর্মে আত্মপ্রচারের কুিসত এক চিত্র।
এ বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনের তোড়জোড় একটু বেশিই ছিল। সেটি বিশেষভাবে অনুভব করা গেছে এই দিবস উপলক্ষে ঢাকার রাস্তার অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় হোর্ডিং স্থাপিত হওয়ার কারণে। স্বীকার করতেই হবে যে এবার হোর্ডিং-এর সংখ্যা যাতে বেশি হয় তার ব্যবস্থাপনার কাজটি খুব দক্ষতার সাথে করা হয়েছে। কিন্তু হোর্ডিংয়ের সংখ্যা এবং আনুষ্ঠানিকতা বেশি হলেই আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদনের ছোঁয়া যে সে কারণে স্বতঃসিদ্ধভাবে বেশি হবে তেমন মনে করার কোনো কারণ নেই।
নিজ চোখে দেখা এক-দুটি হোডিং-এর বর্ণনা দেই। একটিতে, উপরের দুই কোণায় বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি। তার নিচে প্রায় ডবল সাইজে লালবাগের এমপি হাজী সেলিমের ছবি। তারও নিচে আরো বড় আকারের যে ছবিটি সেটি হলো শ্রদ্ধা-নিবেদক ও ‘বঙ্গবন্ধু-ভক্ত’ লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাজী কামালউদ্দীন কাবুলের ছবি। হোর্ডিংয়ে ছোট ছোট হরফে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শ্লোগান উত্কীর্ণ আছে। কিন্তু তার ৩/৪ গুণ বড় হরফে উত্কীর্ণ রয়েছে হাজী কামালউদ্দীন কাবুলের নাম। হোর্ডিংয়ের নির্মাতারা হয়তো ভেবেছেন, পূজিতের চেয়ে পূজারীর গুরুত্ব যদি বেশি নাই হয় তাহালে সে পূজায় ‘লাভ’ কি? অন্য আরেকটি হোর্ডিংয়ে উপরের দুই কোণায় শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর ছোট-খাটো দুটো ছবির নিচেই আরো বড় সাইজে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কামাল চৌধুরীর ও আরো কিছু বড় আকারে নগর নেতা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছবি। এক্ষেত্রেও একেবারে নিচে সবচেয়ে বড় আকারের ছবিটি হলো ১৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিমউদ্দিনের ছবি। তার নামটিও ২/৩ গুণ বড় হরফে সবচেয়ে উজ্জ্বল করে ছাপা।
বাংলা মোটর থেকে পল্টন পর্যন্ত পথে আনিসুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, হাজী মো. আনসার, রফিকুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, আলহাজ্ব আবুল বাশার, মো. শাহ আলম, হাজী মুবিনুল হক, এম. এ আজিজ, সালেহ আহমেদ, মো. আবুল বাসার, আলহাজ্ব হাবিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম... প্রমুখ অসংখ্য ‘আত্মপ্রচারকের’ হাসি-হাসি মুখের আকর্ষণীয় বড়-বড় ছবি ও বড় হরফে নামাঙ্কিত প্রচারকের ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের’ অসংখ্য হোর্ডিং চোখে পড়বে। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে একজনের ক্ষেত্রে দেখলাম যে, ছবিতে হাসি-হাসি মুখের বদলে ‘ডিজিটাল টাচ’ দিয়ে চোখে-মুখে এক ধরনের কান্না ভেজা ‘প্যাথোজের’ অভিব্যক্তি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ছবিতে চোখ পড়লেই যেন দর্শকের এ রকম মনে হয় যে,—আহারে, বঙ্গবন্ধুর জন্য কতো না দুঃখ এই ছেলেটার মনে! এ যেন ‘দুঃখের’ মুখোশ! ডিজিটাল মুখোশ আজ চতুর্দিকে!! শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রকাশ করাকে নিয়েও লাভ-লোকসানের হিসেব-নিকেশ, আত্মস্বার্থ-বিবেচনা, অভিনয় ও মুখোশ ধারণের যে কুিসত ‘কারবার’ আজকাল চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তা সমাজদেহ ও রাজনীতির গভীর রুগ্নতারই প্রকাশ।
গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতার সাথে যুক্ত একটি প্রসঙ্গে পরিণত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারাকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্য থেকেই পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। ক্ষমতার হাত বদল হয়ে তা স্থানান্তরিত হয়েছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর হাতে। তিনি গঠন করেছিলেন নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি। বিএনপির অস্তিত্বের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করা। জিয়াউর রহমান সে চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পরে বিএনপি সুপরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। কার মাজারটি অন্য জনেরটির চেয়ে বড় হবে, কার মৃত্যু দিবসে বেশি অনুষ্ঠান হবে, কার প্রয়াণ দিবসের কাঙ্গালী ভোজে বেশি গরু জবাই হবে ইত্যাদি বিষয়ে কোমর বেঁধে যে প্রতিযোগিতা তখন থেকে শুরু হয়েছিল তা এখনো দেশের বিদ্যমান দ্বি-দলীয় মেরুকরণ ভিত্তিক ‘গদি দখলের রাজনীতিতে’ একটি প্রধান উপাদান হয়ে আছে। ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতাকে পরিণত করা হয়েছে ‘মুজিব’ ও ‘জিয়ার’ প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপে।
এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী প্রধানত বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগ উত্তেজিত হয়ে তাদের সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। নীতি-আদর্শ নিয়ে দ্বন্দ্ব হলো এক ধরনের বিষয়। কিন্তু নিছক দু’জন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নিয়ে এপক্ষ-ওপক্ষ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়াটা একেবারেই অন্য ধরনের বিষয়। তা অনেকটা ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপে মেসি না নেইমার—কার ভক্ত বেশি তা নিয়ে প্রতিযোগিতার মতো একটি বিষয়। এ প্রতিযোগিতায় কোনো শেষ কথা নেই অথবা তার কোনো মাথা মুণ্ড নেই, কারণ তাতে যুক্তির তেমন কোনো স্থান নেই। তাতে আছে প্রধানত যুক্তিবর্জিত আবেগের, কিম্বা জুয়াড়ি বাজিকর ‘বুক মেকারদের’ স্বার্থের বিবেচনা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেরূপ প্রতিযোগিতায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। এটা হতে পেরেছে এ কারণে যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রীতি-নীতিতে আগাগোড়াই রয়েছে নেতা-ভজন ও নেতা-নির্ভরতার ধারা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বদলে বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিটিকেই দলীয় শক্তির প্রধান ভিত্তি ও রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে তারা সব সময় প্রাধান্য দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নামে শ্লোগানের জজবা হয়েছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রচার ও তাতে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি কখনই ন্যূনতম গুরুত্ব পায়নি। যখন বিএনপি ব্যক্তিগত ভক্তিবাদের সেই জায়গায় হাত দিয়ে চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হয়েছে, আওয়ামী লীগ তখন বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তির প্রতিযোগিতার উস্কানির ফাঁদে নিজেকে আটকে ফেলেছে।
এ ধরনের ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রিক শ্রদ্ধা-ভক্তির প্রতিযোগিতায় বঙ্গবন্ধুকে জিয়াউর রহমানের সাথে প্রতিযোগিতায় সামিল করানোটা অন-ঐতিহাসিক, অপ্রাসঙ্গিক ও আমার বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তির ক্ষেত্রে অবমানজনক কাজ হয়েছে। কারণ, দু’জনার অবদান সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। বঙ্গবন্ধুর অবদান ঐতিহাসিক ও যুগ-যুগের ক্যানভাসে বিবেচ্য। জিয়াউর রহমানের অবদান সমসাময়িক ঘটনাবলীর প্রসঙ্গতা সম্পন্ন।
এ পার্থক্যটি স্পষ্ট করার জন্য যা করা উচিত ছিল তা হলো, বঙ্গবন্ধুকে জিয়াউর রহমানের সাথে ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিযোগিতায় না নামিয়ে, বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ ও অমর কীর্তিগুলোকে অবলম্বন করে গণসমর্থনের ভিত্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দেয়া। এই মূল কাজকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। দেশের গোটা রাজনীতি এখন বহুলাংশে ঘুরপাক যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে’ দুই ব্যক্তিত্বের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার নাগর দোলায়। দেশবাসীকে সেই দোলার মাদকীয় দোলায় আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির ফল হয়েছে এরূপ যে, শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নীতি-আদর্শের বিবেচনা ও চেতনার তেমন কোনো স্থান আর থাকেনি। যে কোনো উপায়ে অপর পক্ষকে আনুষ্ঠানিকতার মাত্রায় টেক্কা দিতে পারলেই হলো। এ হলো, বাছ-বিচার হীন নির্লজ্জ প্রদর্শনবাদ। শ্রেফ ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের’ ব্যাপার। সে জন্য বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, বর্তমান বা ভবিষ্যত্ সুবিধা প্রাপ্তির স্বার্থ, স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার তাড়না, দলের অভ্যন্তরে উপদলীয় স্বার্থ বিবেচনা ইত্যাদিকে সুকৌশলে ‘কাজে’ লাগানো হয়েছে ও হচ্ছে। ফলস্বরূপ মাইকে বক্তৃতা প্রচার, কাঙ্গালী ভোজ, হোর্ডিংয়ের সংখ্যা ও আকার ইত্যাদি বাড়লেও, বাড়ছে না হূদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভক্তি। সেটি বৃদ্ধি করতে হলে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন ছিল তা হলো জনগণকে ইতিহাস জানতে দেয়া, ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ভাল-মন্দ অবদান নির্মোহ ও বাস্তবসম্মতভাবে অবগত করা, অন্যের মুখে শুনে বঙ্গবন্ধুকে জানার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজের মুখের কথা শুনে তাঁকে জানার সুযোগ করে দেয়া ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি প্রকাশ এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক কাজ হয়েছে। কিন্তু একথা ভাবতে আমার কাছে অবাক লাগে যে নব্বইয়ের পর এক দশকের বেশি সময়কাল আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর দেয়া সব বক্তৃতা, ভাষণ, সাক্ষাত্কার ইত্যাদির পূর্ণ সংকলন কেন আজও প্রকাশ হলো না? বঙ্গবন্ধুর কিছু কথায় কিছু বক্তৃতায় হয়তো স্পর্শকাতর এমন কিছু বক্তব্য রয়েছে যা আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর নয়। যেমন, তিনি বলেছিলেন ‘যেদিকে তাকাই, শুধু দেখি চাটার দল’। বলেছিলেন ‘স্বাধীন হওয়ার পর সব দেশ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি’। বলেছিলেন ‘কি রে গাজী, আমার কম্বলটা গেল কই?’ বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার এসব কথা আওয়ামী লীগের প্রতি সমালোচনামূলক হওয়ার কারণে সে সব কথা গোপন রেখে বঙ্গবন্ধুকে জনগণের কাছে পরিচিত করা যাবে না। আর, জনগণ দোষ-গুণসহ বঙ্গবন্ধুকে পূর্ণভাবে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে জানতে-চিনতে না পারলে তাদের মাঝে হূদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধাও কোনোদিন জাগ্রত হবে না।
কিংবা ধরা যাক ’৭২-এর ৪ নভেম্বর গণপরিষদের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু যে বলেছিলেন ‘... ভবিষ্যত্ বংশধরেরা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন হবে সার্থক, শহীদের রক্তদান হবে সার্থক।’ ’৭৩ সালে আলজিয়ার্সের জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি বক্তৃতায় বলেছিলেন ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক শ্রেণি ও শোষিত শ্রেণি। আমি শোষিত শ্রেণির পক্ষে।’ ’৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বক্তৃতায় বলেছিলেন ‘... যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, তাতে গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে।... আমি আপনাদের জমি নেব না।... জমি মালিকের থাকবে। কিন্তু তার ফসলের অংশ সবাই পাবে।... আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভের হাতে, অংশ যাবে গভর্নমেন্টের হাতে।’ বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতাগুলোতে মহামূল্যবান চিন্তা-ভাবনা ছড়িয়ে আছে। এগুলো সম্পর্কে না জানলে কি ভাবে বঙ্গবন্ধুকে জানা যাবে, চেনা যাবে? তাকে জানা ও চেনা না গেলে তাঁর প্রতি হূদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভক্তির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কি প্রকারে সম্ভব হবে? সে শ্রদ্ধা প্রদর্শন হবে কেবল ‘কমান্ড সিস্টেমের’ দ্বারা যান্ত্রিক ও ফরমায়েসী আনুষ্ঠানিকতা। কিংবা তা হবে নিছক বিষয় স্বার্থ তাড়িত শ্রদ্ধা-ব্যবসার রুচিহীন নোংরা প্রকাশ।
পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের আগে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি দেখানোর ‘প্রদর্শনী জোয়ারে’ কোনো কমতি ছিল কি? কিন্তু তার আসল মূল্য কতটুকু তা কি আমরা সে সময় টের পাইনি? শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ‘প্রদর্শনী জোয়ার’ দেখে এখনো যেন আমারা তাকে হূদয় নিংড়ানো প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন বলে ভ্রম না করি!
বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা ও আদর্শকে চিনতে-জানতে পারলে—তা থেকে শ্রদ্ধাবোধ উত্সরিত হবে, তার ফলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে বাংলাদেশকে সমাজতন্ত্রসহ রাষ্ট্রীয় চার নীতির ধারায় পরিচালনা করার দাবি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র ত্যাগ করে পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির, সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতার, সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপস করার দর্শন ও পথ গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধুর নীতি থেকে সরে এসে সে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতার প্রদর্শন বাড়িয়ে দিয়েছে। আদর্শকে দূরে ঠেলে দিয়ে যে শ্রদ্ধা নিবেদনের জাঁকজমক প্রদর্শনী তাকে এক ধরনের ছলনা ছাড়া অন্য কিছু বলে বিবেচনা করা যায় না। ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি’—অবস্থা যেন অনেকটা এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ছলনার অবসান প্রয়োজন। অন্যথায় জাতিকে ‘শ্রদ্ধা-বাণিজ্যের’ প্রতিযোগিতা ও তার যাবতীয় আনুষঙ্গিকতার ফাঁদে আটকা পড়ে ক্রমাগত হাবুডুবুই খেয়ে চলতে হবে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : selimcpb@yahoo.com